হঠাৎ একমুহূর্তের জন্য অপুর কেন যেন ফিজির সমুদ্রবেলার কথা মনে পড়িল। এই সময় স্কুল হইতে বাড়ি ফিরিয়া পাউরুটি ও সামুদ্রিক মাছের ঝোল দিয়া জলযোগ করিয়া সে বেলাভূমিতে আসিয়া বসিত। সমুদ্রের ওপরেই একটি ছোট শহরে সে মাস্টারি করিত। কোনদিনই তার তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা হইত না। সে পা ছাড়াইয়া বসিয়া থাকিত। সামনে অবিশ্রাস্ত গর্জন করিতেছে সমুদ্র। মাঝে মাঝে ঢেউগুলি তাহার কাছ বরাবর আসিয়া পড়িতেছে, চলিয়া যাইবার সময় ফেলিয়া যাইতেছে একটি টানা লম্বা সাদা রেখা আর কয়েকটি ঝিনুক। অপুর অদ্ভুত অনুভূতি হইত-একটা অপার রহস্যের অনুভূতি। সমুদ্রের প্রকাণ্ডত্বের সহিত নিজেকে একাত্ম করিবার মহৎ অনুভূতি। অথচ এই এখন সে মালতীনগরে বসিয়াও তো বেশ আনন্দ পাইতেছে। অত বিশাল দৃশ্যের সম্মুখীন যে হইয়াছে—তাহার এই ক্ষুদ্র স্থানে আরদ্ধ থাকিয়াও কি আনন্দ পাওয়া সম্ভব?
অপু মনে মনে নিজের আনন্দের কারণটা অনুভব করিল। উন্মত্তের মতো উল্কাবেগে পৃথিবীর এ প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরিয়া মরিলেই সার্থকতা লাভ হয় না। জীবনের আনন্দ রহিয়াছে অনুভূতির গাঢ়ত্বের ভিতর, জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করিবার ভিতর। ফিজির সমুদ্রতীরে বসিয়া সে যেমন হইতে পারে–মালতীনগরেও হইতে পারে।
স্তব্ধতা ভাঙিয়া অপু বলিল–তুমি গান গাইতে পারো হৈমন্তী?
একটু চুপ করিয়া থাকিয়া হৈমন্তী বলিল–পারি।
—একখানা গাও না, শুনি।
সামান্য পরেই হৈমন্তী গাহিল—’দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া, ভুলালো রে ভুলালো মোর প্ৰাণ।’
অপু সামনের দিকে ঝুঁকিয়া শুনিতেছিল। হৈমন্তীর গলা ভালো। বিশেষ করিয়া গানেব কথা এবং উদাস সুব অপুর হৃদয় স্পর্শ করিল। পরিবেশের সঙ্গে গানটা যেন কেমন করিয়া মিলিয়া গেল।
‘ঘরেও নহে পারেও নহে
যে জন আছে মাঝখানে
সেই বসেছে ঘাটের কিনারায়-’
গান শেষ হইয়া গেল। অন্ধকার নামিয়াছে। বেশ বাতাস। অপু ওপরে তাকাইল–সব নক্ষত্র এখনও দেখা যাইতেছে না বটে, কিন্তু বৃহস্পতি গ্ৰহ ঝকঝক করিতেছে। অপু বলিল–বৃহস্পতি চেনো? ওই দেখ। ওই যেটা ও-বাড়ির কার্নিসের ডানদিকে জ্বল জ্বল করছ–দেখছো?
–হ্যাঁ।
—ভাবো দেখি, ওটা পৃথিবীর চেয়ে কত বড়। অন্ধকারের বুকে দীর্ঘপথে সূর্যকে পরিক্রমা করছে সৃষ্টির উষাকাল থেকে। ও রকম কত গ্রহ, কত নীহারিকা ধূমকেতু মহাশূন্যের। অকল্পনীয় ব্যাপ্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীবনটা বড়ো অদ্ভুত, বড়ো সুন্দর, না? তুমি অনুভব করো?
–করি। সেজন্যই তো আপনার লেখা আমার ভালো লাগে।
একটা দমকা বাতাস আসিল। সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে লাগিল দোলা। অনেক শূকনো পাতা খড়খাড় শব্দ করিয়া উঠানের উপর দিয়া সরিয়া গেল। কাজল বলিল–সেই যে বাবা তুমি বলেছিলে, এদের দেবে সেই জিনিস–
অপু হাসিয়া বলিল–ওই দ্যাখো, একদম ভুলে বসে আছি। কলকাতা থেকে অরেঞ্জ ক্রীম দেওয়া বিস্কুট এনেছি। তাই কাজলকে বলেছিলাম, তোমরা এলে দেবার কথা। ভাগ্যিস তুই মনে করিয়ে দিলি খোকা–
অপু উঠিয়া ঘরে বিস্কুট আনিতে গেল।
হৈমন্তীদের বাড়িতে অপু প্রায়ই যাতায়াত করে আজকাল। হৈমন্তীর বাবা-মা তাহাকে পাইলে সত্যই খুশি হন। সে গিয়া গল্পগুজব করিয়া জলখাবার খাইয়া বাড়ি ফেরে। কাজলও সঙ্গে যায়। মাঝে মাঝে গানের আসর বসে, হৈমন্তী আগে হইতে নিমন্ত্ৰণ করিয়া যায়। সাংস্কৃতিক আরহাওয়া অপু পছন্দ করে, ফলে এ বাড়ির সহিত তাহার ঘনিষ্ঠতা গড়িয়া উঠিতে বেশি দেরি হয় নাই।
অপু অনেক ভাবিয়া দেখিয়াছে, এক সারাজীবন কাটানো তাহার পক্ষে সম্ভবপর নহে। অপর্ণর কথা ভাবিয়াই সে অন্তর হইতে সায় পাইতেছিল না। কিন্তু পরে চিন্তা করিয়া দেখিল, অপর্ণার স্মৃতি তাহার মনের যে গোপন কন্দরে স্থায়ী রঙে আঁকা হইয়া গিয়াছে—সেখানে আর কাহারও স্থান নাই। কিন্তু হৈমন্তীকে সে অস্বীকার করিতে পারিবে না। সে যদি বলে-আমি হৈমন্তীকে ভালবাসি না, তবে তাহা মিথ্যা কথা বলিবে।
অপর্ণার স্মৃতিকে শ্রদ্ধার আলোয় বাঁচাইয়া রাখিয়াই সে বর্তমান সত্যকে মর্যাদা দিবে। একমাত্র ভয় ছিল কাজলকে লইয়া। কিন্তু কাজল ও হৈমন্তী পরস্পরকে নিকটবন্ধনে বাঁধিয়াছে। সেদিক দিয়া চিন্তার আর কারণ নাই।
একদিন অপু কথাটা হৈমন্তীর বাবার কাছে পাড়িল। ভদ্রলোক আপত্তি করিলেন না। অপু সজ্জন, সুপুরুষ, বাজারে নামডাক হইয়াছে। সম্প্রতি বই লিখিয়া ভালো উপার্জন করিতেছে। এমন পাত্রের সহিত বিবাহ না দিবার কোনো কারণ নাই। তিনি নিজেও বুদ্ধিমান এবং সাহিত্যরসিক। অপুর ব্যক্তিত্ব এবং রচনা-ক্ষমতা তাহাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। তিনি মত দিলেন।
দিনস্থির করিবার জন্য ভিতর বাড়ি হইতে পঞ্জিকা আনানো হইল।
০৪. বিবাহের পর মাস তিনেক কাটিয়াছে
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
বিবাহের পর মাস তিনেক কাটিয়াছে। বৃষ্টি তেমন হইতেছে না। আকাশের রঙ কটা, তামার মতো। গরমে দেশসুদ্ধ লোক হাঁপাইয়া উঠিয়াছে। মাটিতে বড়ো বড়ো ফাটল, বৃষ্টির জন্য আকাশের দিকে মুখব্যাদান করিয়া রহিয়াছে। গরমে কাকদের স্বরভঙ্গ হইয়াছে, ডাকিলে তীব্র কা-কা শব্দের বদলে একটা ফ্যাসফ্যাস শব্দ বাহির হইতেছে মাত্র। লোকে প্রতি দণ্ডে একবার আকাশের দিকে তাকাইয়া মেঘ আসিল কিনা দেখিতেছে।
