একটু তাচ্ছিল্যের সহিত পড়িতে শুরু করিয়াছিল বলিয়াই বোধ হয় ধাক্কাটা জোরে লাগিল। সাধারণ ন্যাকা-ন্যাক ভাষায় লেখা নহে–প্রেমের গল্পও নহে। একটি মেয়ে গল্প লিখিতে ভালোবাসিত। বিবাহ হইয়া পতিগৃহে অজস্র সাংসারিক কাজের ভিড়ে তাহার লেখিকা-সত্তা গেল চাপা পড়িয়া। একদিন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় মেয়েটি অবসর পাইয়া টিনের তোরঙ্গ খুলিয়া তাহার লেখার খাতা বাহির করিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে ভিজা বাতাসের সহিত তাহার কুমারী জীবনের স্মৃতি যেন হু হু করিয়া ঢুকিয়া পড়িল ঘরের ভিতর। এই গল্প। ভাষার উপর লেখিকার দখলের কথা সহজেই বোঝা যায়। অপু অবাক হইল। গল্প পড়িয়া মামুলি ধরনের কী প্রশংসা করিবে তাহা ঠিক ছিল, এখন গল্পটা সত্য সত্যই ভালো হইয়া পড়ান্য সে কিছু বলিতে পারিল না।
খাইতে বসিয়া অপু বলিল–সত্যিই খুব ভালো লেখা আপনার। এতটা ভালো, মিথ্যে বলবো না, আমি আশা করতে পারি নি।
হৈমন্তী বলিল–আমাকে আর আপনি বলছেন কেন, তুমি বলুন।
–তোমার গল্প সত্যিই ভালো লাগল হৈমন্তী। এত সাধাবণ প্লট নিয়ে এত চমৎকার কবে তা ফুটিয়ে তোলা–না, তোমার মধ্যে শিল্পীমান লুকিয়ে আছে।
হৈমন্তীর বাবা হাসিয়া বলিলেন-অত প্রশংসা করবেন না অপূর্ববাবু, মাথা বিগড়ে যাবে ওর। তবে হ্যাঁ, এ মেয়েটি আমার সত্যিই–পড়াশুনোতেও বড়ো ভালো ছিল। বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হতো। বড়ো অসুখে পড়েছিল বলে বছরখানেক পড়া বন্ধ আছে।
খাওয়া হইলে হৈমন্তী অপুর জন্য মশলা আনিল। মশলা লইতে লইতে অপু জিজ্ঞাসা করিল–আচ্ছা, সেদিন তুমি আমার খাটের ওপরে বেলফুল ফেলে এসেছিলে, না? তুমি যাবার পর দেখি পড়ে আছে। আমার অবশ্য ভালেই হয়েছিল, সারা সন্ধে গন্ধ শুঁকে শুঁকে বেশ কবিত্ব করা গেল।
মাথা নিচু করিয়া হৈমন্তী বলিল–ফেলে আসি নি, আপনার জন্যেই নিয়ে গিয়েছিলাম, রেখে এসেছি। আপনার লেখা পড়ে মনে হয়েছিল ফুল পেলে আপনি খুশি হবেন।
-আমার জন্য নিয়ে গিয়েছ। তো আমাকেই দিলে না কেন?
উত্তরে হৈমন্তী কিছু বলিল না, কিছুক্ষণ চুপ করিয়া পরে মাথা তুলিয়া অপুর দিকে তাকাইয়া একটু সলজ্জ হাসি হাসিল।
-কই বললে না তো দাওনি কেন?
–দিয়েই তো এসেছিলাম। আপনি বুঝতে পারেন নি, সে কি আমার দোষ?
বাড়ি ফিরিতে ফিরিতে কাজল বলিল–বেশ লোক এরা, না বাবা! উত্তর না পাইয়া অভিযোগের সুরে বলিল–হুঁ। বাবা, তুমি সেই থেকে শুনছো না কিছু!
অপু চমক ভাঙিয়া বলিল–অ্যাঁ, ও হ্যাঁ তা ভালো লোক। বেশ ভালো লোক–নাও, এখন তাড়াতাড়ি পা চালাও, বাড়ি গিয়ে তোমার ইংরাজি বানানগুলো—
হৈমন্তী প্রায়ই অপুর বাসায় আসে। অপু সম্প্রতি খ্যাতি পাইতেছে–কিন্তু এই মেয়েটি তাঁহাকে সত্য করিয়া চিনিয়াছে। পুস্তক সমালোচকদেব দায়সারা ভাসা ভাসা আলোচনা নহে, হৈমন্তী তার অন্তরে প্রবেশ করিয়া তার চোখ দিয়া বিচার করিয়াছে। অপুর লেখক এবং ব্যক্তিসত্তাকে এমন করিয়া আর কেহ আদর করে নাই–এক লীলা ছাড়া। হৈমন্তী তাহাকে বুঝিতে পারিয়াছে, চিনিতে পারিয়াছে। অপুর মনে ধীরে ধীরে কেমন একটা বুভুক্ষা জাগিয়া উঠিল। ভালোবাসা পাইবার ক্ষুধা। তার মনে হইল, সারাজীবন এইভাবে ভাসিয়া বেড়ানো সম্ভব নহে, জীবনের মূল মাটির মধ্যে চালাইয়া নিজেকে মৃত্তিকার উপরে প্রতিষ্ঠিত করিবার দিন আসিয়াছে। যতবার সে স্থায়ী হইবাব চেষ্টা করিয়াছে, দুর্ভাগ্যের ঝড়ে তাকে ভাসাইয়া লইয়াছে দূরে। এখন গৃহের শাস্তি পাইতে ইচ্ছা করে। তবে সে স্থাণু হইয়া পড়িতে চায় না, গৃহকে সে পায়ের বেড়ি না ভাবিয়া জীবনানন্দের একটি দিক হিসাবে পাইতে চায়।
একদিন বিকালে হৈমন্তী আসিল। সঙ্গে তাহার ভাই। অপু হাসিয়া বলিল–আরে, এসো, এসো। ভালোই হলো। বিকেলটা মোটে কাটছিল না, এখন বেশ গল্প করা যাবে তোমার সঙ্গে।
–তা তো করবেন। কিন্তু আজ আমার একটা গল্প শুনতে হবে আপনাকে। দেখছেন তো, একদিন প্রশ্ৰয় দিয়ে কী কাণ্ড করেছেন!
–বারে, সে কী কথা! নিশ্চয় শুনব গল্প। তোমার গল্প আমার সত্যিই ভালো লাগে হৈমন্তী, সেদিন তোমায় মিথ্যে বলিনি। মামুলি প্রশংসাও করিনি। সত্যিই তোমার মধ্যে অদ্ভুত গুণ আছে। কোত্থেকে পেলে বলে তো?
-বাড়িয়ে বলা আপনার অভ্যোস। আমার লেখা এমন কিছু নয়—
জোর তর্ক শুরু হইয়া গেল। অপু প্রমাণ করিবেই হৈমন্তী ভালো লিখিয়া থাকে। আধঘণ্টা বাগযুদ্ধের পর হৈমন্তী হার মানিল। অপু বলিল–চলো, উঠোনে মাদুর পেতে বসি, ভেতরে বড্ড গরম।
চারজনে উঠানে বসিল। কাজলের সহিত হৈমন্তীর আশ্চর্য সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছে। প্রথম প্রথম কাজল তাহাকে তত পছন্দ করিতে পারে নাই। কিন্তু পরে কী ভাবে যেন কাজলের মতের পরিবর্তন ঘটিয়াছে, এখন সে সর্বদা হৈমন্তীর কাছে কাছে ঘোরে। হৈমন্তী প্ৰথম দিন দেখিয়াই ভালোবাসিয়াছিল। কাজলের উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, মুখের গড়ন, সবটাই যেন অপুর ধাঁচে গড়া। দেখিলে আদর না করিয়া থাকা যায় না।
সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিল। কাজল হৈমন্তীর কোলের কাছে ঘোষিয়া বসিয়াছে। প্ৰতাপ (হৈমন্তীর ভাই) হাঁটুর উপরে থুতনি রাখিয়া কী যেন ভাবিতেছে। উঠানের সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে ঝিঁঝির শব্দ। সমস্ত দিনের তাপের পর এখন চারিদিকে কেমন শান্ত স্তব্ধতা।
