প্রথম প্রথম আমি এ ব্যাপারটা ধরতে পারিনি। সমরেশ নয়নতারার ফ্যান, মাঝে মাঝে সে তাকে চিঠি লেখে, এটুকুই শুধু জানা ছিল। তলায় তলায় নদী যে পাড় ভাঙার কাজটা গোপনে অনেক দূর এগিয়ে রেখেছে, সেটা জানা যায় নি। যখন জানতে পারলাম, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তখন আর বিশেষ কিছু করার ছিল না। তবু স্বামীকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। তার মন সংসারের দিকে যাতে ফেরে তার জন্য কী করেছি, কিন্তু বৃথাই। আফ্রিকায় এক ধরনের ভারি সুন্দর ফুল আছে, পোকা মাকড় পাখি প্রজাপতি যাই তার ওপর এসে বসুক না, সঙ্গে সঙ্গে গিলে ফেলে। আমার স্বামীর অবস্থা হল তাই। নয়নতারা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছিল। কুহকিনীর মোহ কাটাবার শক্তি তার ছিল না।
এদিকে চা-বাগানের হাল খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নিজেরা দেখাশোনা না করলে যা হয়, কর্মচারীরা লুটেপুটে শেষ করে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বাগানটা বিক্রিই করে দিতে হল।
তারপর একদিন নয়নতারার সঙ্গে যে আমার স্বামী নিরুদ্দেশ হল সে কথা আগেই জানিয়েছি।
তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার অবস্থাটা একবার চিন্তা করুন। ব্রণ দেখলে মাছির ঝাঁক যেমন এসে ঘেঁকে ধরে তেমনি চারপাশের লোকজন, এমন কি আত্মীয়স্বজনরা পর্যন্ত চটচটে কেচ্ছার গন্ধ পেয়ে ছুটে এল। তাদের মুখে যথেষ্ট সহানুভূতি কিন্তু চোখে মিচকে চতুর হাসিটা গোপন রইল না। এতে তাদের বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই, তবু তারা ভীষণ খুশি। মানুষের চরিত্রই বোধ হয় এই।
হাওয়ায় তখন এত কুৎসা উড়ছে, চারদিকে এত ফিসফাস আর গুঞ্জন যে মাসখানেক একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। তারপরই অবশ্য মনকে শক্ত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। যে মানুষ স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করে না, সন্তানদের প্রতি কর্তব্য পালন করে না, তার সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক নয়। অনেকে বাধা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমি কারো কথা না শুনে সোজা আদালতে চলে গেলাম এবং ছমাসের ভেতর একতরফা ডিভোর্সও পেলাম।
বর্তমানে উত্তরবঙ্গেই একটা স্কুলে আমি অ্যাসিস্টান্ট হেড মিস্ট্রেস। বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, ছোট ছেলের এবার এম.এ ফাইনাল ইয়ার। গ্র্যাজুয়েট হবার পর একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আসছে বছর আমার রিটায়ারমেন্ট।
আপনারা যে তথ্যচিত্রটিতে হাত দিয়েছেন তাতে তথ্যর ওপর নিশ্চয়ই জোর দেবেন। দেখবেন, নয়নতারার জীবনী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কোনো রকম ভাবালুতাকে যেন প্রশ্রয় দেওয়া না হয়। তার উজ্জ্বল দিকের পাশাপাশি এই নোংরা দিকটাও তুলে ধরবেন আশা করি। আমার একান্ত অনুরোধ সত্যের প্রতি আপনারা অবিচল থাকুন।
আপনারা নয়নতারার সন্ধান পেয়েছেন কিনা জানি না। তবে যদি আমার প্রাক্তন স্বামী সমরেশ ভৌমিককে খুঁজে বার করতে পারেন, নয়নতারার হদিস পেতে অসুবিধা হবে না। দুজনের একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
সমরেশের চেহারার একটু বর্ণনা এখানে দিচ্ছি। খুবই সুপুরুষ সে। নিরুদ্দেশ হবার আগে তার সব চুল পাকে নি, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি ছিল, ছিল চওড়া জুলপি আর শৌখিন গোঁফ। গায়ের রং ফর্সা, হাইট ছফিটের মত।
স্বাক্ষরহীন চিঠিটি এখানেই শেষ।
বিন্দুবাসিনীর বাড়ি থেকে পাঁচটা নাগাদ বেরিয়ে বক্স নাম্বারের চিঠির জন্য মাঝে মাঝেই দিনকাল অফিসে চলে আসে রণিতা আর অমিতেশ। আজও এসেছিল।
লাইব্রেরিতে বসে দুজনে বেনামা চিঠিটা বার তিনেক করে পড়ল। তারপর অমিতেশ বলে, দারুণ ইন্টারেস্টিং লেটার। নয়নতারাকে ঘিরে কত টাইপের যে মানুষ জমা হয়েছিল, ভাবা যায় না।
রণিতা বলে, আমি অন্য একটা কথা ভাবছি।
কী?
বিন্দুবাসিনী মাসিমা যে ভদ্রলোককে চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের ব্যালকনিতে দেখেছিলেন, আমরাও তাঁকে এক ঝলক সেদিন দেখেছি। তাঁর চেহারাটা মনে পড়ছে?
হ্যাঁ, পড়ছে—
ভাল করে ভেবে বল।
কিছুক্ষণ চোখ দুটো আধবোজা করে থাকে অমিতেশ। তারপর বলে, বয়েস হলেও বেশ হ্যাঁণ্ডসাম।
রণিতা বলে, ওরকম সাদামাটা ডেসক্রিপশানে হবে না, ডিটেলে বল।
অমিতেশ চোখ দুটো আগের মতো অর্ধেক বুজে রেখেই বলে, লম্বায় অ্যাবাউট সিক্স ফিট, কমপ্লেকসান ফেয়ার–
গুড। বলে যাও—
সাদা চুল, লম্বাটে মুখ, চওড়া হুইস্কার, ফ্রেঞ্চকাটি দাড়ি–
ফাইন।
দাড়ি, জুলপি চুলের মতোই ধবধবে।
গ্রেট। এবার চিঠিতে যে সমরেশ ভৌমিকের ডেসক্রিপশান আছে তাঁর সঙ্গে ওই ভদ্রলোকের সিমিলারিটি আছে কিনা, মনে মনে মিলিয়ে নাও।
প্রায় লাফিয়ে ওঠে অমিতেশ, একজাক্টলি। ওই ভদ্রলোকই সমরেশ ভৌমিক। এ ব্যাপারে আমার কোনোরকম সন্দেহ নেই।
রণিতা বলে, নেই তো?
নো, নো। নট অ্যাট অল।
তা হলে আমরা ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে গেছি বল। এই ভদ্রলোক সমরেশ ভৌমিক হলে দ্যাট লেডি মাস্ট বি নয়নতারা।
একটু চুপচাপ।
তারপর অমিতেশ জিজ্ঞেস করে, এবার কী করতে চাও?
রণিতা বলে, চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে যেভাবেই হোক ঢুকে পড়তে হবে।
সেটা তো আগেও বলেছিলে। কিন্তু কোন কৌশলে? মোডাস অপারেন্ডিটা কী?
সেটা এখনও ভেবে উঠতে পারিনি। আজ সারারাত চিন্তা করে কিছু একটা বার করতে হবে। তুমিও ভেবো। কাল বিন্দুবাসিনী মাসিমার বাড়িতে এই নিয়ে আলোচনার পর কাজে নেমে পড়ব। ওকে?
ওকে মেমসাহেব।
পরদিন কাঁটায় কাঁটায় নটায় বিন্দুবাসিনীদের বাড়ির পশ্চিমের ব্যালকনিতে হাজির হয়ে যায় অমিতেশ আর রণিতা। বিন্দুবাসিনী তাদের জন্য অন্য দিনের মতোই অপেক্ষা করছিলেন। কালকের সেই চিঠিটা রণিতা তাঁকে দিতে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললেন, উত্তেজনায় তাঁর চোখ চকচক করতে লাগল। বললেন, বয়েস হলেও মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় নি।
