বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞেস করেন, এখন তা হলে কী করবে? ফের ও বাড়ির গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াবে?
রণিতা বলে, লাভ কিছু হবে না। দারোয়ানটা কিছুতেই স্বীকার করবে না যে ভদ্রলোক বাড়ির ভেতর আছেন। আর আমি যতক্ষণ গেটের কাছে থাকব উনি বেরুবেন না। পিকেটিংয়ের ভয় দেখিয়ে এসেছি বটে, কিন্তু সারাদিন থাকলেও সত্যি সত্যিই তো আর রাত্তিরে রাস্তায় বসে থাকা যাবে না। একটু ভেবে বলে, একটা কাজ অবশ্য করা যায়।
কী?
একবার ও বাড়িতে ফোন করে দেখি–
অমিতেশ বলে, গুড আইডিয়া। আগেই করা উচিত ছিল–
রণিতা ডায়াল করে চোদ্দ নম্বরের লাইন ধরে ফেলে। হালো বলতেই ওদার থেকে একটি মহিলা আকাট পূর্ববঙ্গীয় সুরে বলে ওঠে, কারে চাইতে আছেন দিদিমণি?
গলাটা শুনে মনে হল বাড়ির কাজের লোক। রণিতা বলে, তোমার মেমসাহেবের সঙ্গে ।
ম্যামসাহেব বাড়িত্ নাই।
আছেন। ভাল করে দেখে এসে বল–
নাই। বিশ্বাস করেন দিদিমণি। মা কালীর কিরা (দিব্যি)।
ঠিক আছে, আমি আবার ফোন করব।
পরাণে য্যাত বার চায় ত্যাত বার কইরেন। অখন ফুন (ফোন) রাখি। পন্নাম (প্রণাম)।
না, কোনোভাবেই চোদ্দ নম্বর বাড়ির স্বত্বাধিকারিণীকে ধরা যাচ্ছে না। দারোয়ান থেকে কাজের মেয়ে পর্যন্ত সবাইকে শেখানো আছে, অচেনা কেউ ফোন করলেই তারা তোতাপাখির মতো একই বুলি আউডে যাবে, মেমসাহেব বাড়ি নেই। এভাবে কিছুতেই নয়নতারার কাছে, যদি চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের মহিলাটি সত্যিই নয়নতারা হন, আদৌ পোঁছনো যাবে না। তার জন্য অন্য পদ্ধতি ভেবে বার করতে হবে।
.
১৩.
নয়নতারাকে নিয়ে ডকু-ফিচারের পরিকল্পনা যেদিন নেওয়া হয় সেই শুরু থেকেই ইন্দ্রনাথ যথেষ্ট উৎসুক হয়ে আছেন। রোজ রাতেই খাবার টেবলে বসে খোঁজ নেন, রণিতার কাজ কতদূর এগুলো কিংবা মায়াকাননের অলীক পরীর মতো তাঁর যৌবনকালের সুপারস্টারটির সঙ্গে যোগাযোগ করা আদৌ সম্ভব হয়েছে কিনা।
।রণিতাও বিন্দুবাসিনীদের পশ্চিমের ব্যালকনিতে বসে সারাদিন কী করল, বাবাকে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিররণ দিয়ে যায়। টেবলের অন্য প্রান্তে সারা মুখে পৃথিবীর সবটুকু গাম্ভীর্য মাখিয়ে নিঃশব্দে খেয়ে যান সুধাময়ী। নয়নতারা সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
ইন্দ্রনাথ প্রায়ই বলেন, আমার কী মনে হয় জানিস ছোট খুকি—
রণিতা জিজ্ঞেস করে, কী?
নয়নতারা ওই চোদ্দ নম্বর বাড়িতেই আছে। ওখানে নজর রেখে যা।
তা তো রাখছিই কিন্তু একদিনও মহিলাটিকে দেখতে পাই নি। বিন্দুবাসিনী মাসিমাদের বাড়ির দিকে ওঁদের যে ব্যালকনি সেখানে একবারও উনি আসেন না। আমরা যে ওয়াচ করছি সেটা বোধ হয় উনি টের পেয়ে গেছেন।
তা হলে কী করা?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
একটু চুপচাপ।
তারপর ইন্দ্রনাথ বলেন, তোকে নজর রাখতে বলেছি ঠিকই কিন্তু অনন্ত কাল তো এভাবে তাকিয়ে থাকা যায় না। ডেসপারেট কিছু করা দরকার।
মনে মনে একটা দুঃসাহসী বেপরোয়া সিদ্ধান্তের কথা আবছাভাবে চিন্তা করেছে রণিতা কিন্তু সেটা তার কাছে এখনও খুব পরিষ্কার নয়। সে জিজ্ঞেস করে, কী করতে বল?
এখনও ভেবে উঠতে পারি নি। কিছু মাথায় এলে তোকে বলব।
মণিময় চ্যাটার্জি, রমেন লাহা, রণজয়, এমনকি ফোটোগ্রাফার কেষ্টপদও মাঝে মাঝে জানতে চেয়েছেন কতদুর কী হল। রণিতা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে, বলার মতো তেমন কিছু হয় নি। হওয়া মাত্র খবর দেওয়া হবে।
এর মধ্যে বক্স নাম্বারে একটা বেনামা চিঠি এল।
মহাশয় / মহাশয়া,
খবরের কাগজে আপনাদের বিজ্ঞপ্তিটি গত এক মাসে দু বার আমার চোখে পড়েছে। আপনারা একজন বিখ্যাত নটীকে নিয়ে একটি প্রামাণ্য তথ্যচিত্র তৈরি করতে যাচ্ছেন, এতে চিত্র ও মঞ্চপ্রেমিক হিসেবে আহ্লাদিত হবার কথা। কিন্তু আমার বিন্দুমাত্র আনন্দ বা আহাদ হয়নি। আমি বিজ্ঞপ্তিটি উপেক্ষাই করতে চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম নিরাসক্ত থাকব।
পরে ভেবে দেখেছি চুপচাপ বসে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। আমি আপনাদের কতটা তথ্য দিতে পারব জানি না। তবে এমন একটি খবর দিতে পারি যা কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।
অভিনয়ে যত নামডাকই থাক, আসলে নয়নতারা ঘোর মায়াবিনী, তাকে ডাকিনীও বলতে পারেন। সে আমার সুখশান্তি, ঘর সংসার, সব ছারখার করে দিয়েছে।
আপনারা লক্ষ করেছেন কিনা জানি না। আট বছর আগে নয়নতারা যখন নিরুদ্দেশ হয়, সেই সময় নর্থ বেঙ্গলের একজন চা-বাগানের মালিক সমরেশ ভৌমিকও নিখোঁজ হয়ে যায়। কাগজে খুব ছোট করে এই খবরটি ছাপা হয়েছিল। এই সমরেশ ভৌমিক আমার স্বামী।
আমরা থাকতাম জলপাইগুড়িতে। ওখানকার এক সিনেমা হলে নয়নতারার প্রথম ফিল্মটি দেখার পর থেকেই সমরেশ তার ফ্যান হয়ে যায়। ক্রমশ তার অনুরাগটা মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠে। গোড়ার দিকে সে নয়নতারাকে চিঠি লিখত, তাড়া তাড়া চিঠি। সেগুলো শুধু উচ্ছ্বাস আর স্তুতিতে বোঝাই। তার ছবি দেখে সমরেশ যে কতটা আলোড়িত কতটা মুগ্ধ, পাতার পর পাতা জুড়ে তারই বর্ণনা।
প্রথম প্রথম নয়নতারা জবাব দিত না। কিন্তু চাটুবাদের অপার মহিমা। বছরখানেক পর নয়নতারার উত্তর আসতে লাগল। চিঠিপত্রের আদান-প্রদান চলল বেশ কিছুদিন। তারপর নয়নতারা একদিন আমার স্বামীকে কলকাতায় যেতে লিখল, এমন একজন একনিষ্ঠ স্তাবকের সঙ্গে দেখা করার জন্য সে খুবই উৎসুক। সমরেশ কলকাতায় ছুটল। সেই শুরু। তারপর স্ত্রী-ছেলেমেয়ে-সংসার-চা বাগান, সব মাথায় উঠল। কাজের ছুতো করে মাসের বেশির ভাগ কলকাতায় কাটাত সে।
