চোদ্দ নম্বর বাড়ির মহিলাটি যে নয়নতারা, সে সম্পর্কে কারো আর সংশয় নেই।
রণিতা বলে, কাল সারারাত ভেবে আমি ঠিক করেছি, ও বাড়িতে ঢুকে পড়ব। নইলে কাজ কিছুতেই এগুচ্ছে না।
বিন্দুবাসিনী বলেন, ঢুকবে কী করে? ওদের দারোয়ান ভেতরে একটা মাছিও গলতে দেয় না।
রণিতা বলে, সে কথা আমার ভালই জানা আছে।
তা হলে?
বারো আর চোদ্দ নম্বর বাড়ির মাঝখানে বাউন্ডারি ওয়ালের ধার ঘেঁষে বিন্দুবাসিনীদের একটা ডালপালাও প্রকাণ্ড কালোজামের গাছ অনেকখানি জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কয়েকটা ডাল পাঁচিলের ওধারে চলে গেছে। সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে রণিতা বলে, ওই যে–
বুঝতে না পেরে বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞেস করেন, মানে?
ওই গাছটা সমস্যার সমাধান করে দেবে। বলে চোখ কুঁচকে হাসতে থাকে রণিতা।
বিন্দুবাসিনী কী বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে অমিতেশ, তুমি ওই গাছ বেয়ে ওপারে যেতে চাও নাকি?
একজাক্টলি। আস্তে আস্তে মাথা দোলায় রণিতা।
তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে। উদ্বিগ্ন মুখে অমিতেশ বলে, অত উঁচু থেকে পড়লে হাড়গোড় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
বিন্দুবাসিনী বলেন, না না, এভাবে রিস্ক নেওয়াটা উচিত হবে না।
রণিতা বলে, মাসিমা, আপনি জানেন না কিন্তু অমিত তো জানে, গ্র্যাজুয়েশনের পর আমি কয়েক মাস মাউন্টেনিয়ারিংয়ে ট্রেনিং নিয়েছিলাম। আমার কাছে নাইলনের মোটা দড়ি আর হুক আছে। গাছের ডালে আটকে উঠে পড়তে পারব। ওধারে নামতেও অসুবিধে হবে না। চিন্তার কিছু নেই।
একটু চুপচাপ।
তারপর অমিতেশ বলে, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
নো। জোরে মাথা নাড়ে রণিতা, আমি একলাই যাব।
চিন্তিতভাবে অমিতেশ বলে, কিন্তু–
তাকে থামিয়ে দিয়ে রণিতা বলে, আমি যা করতে যাচ্ছি সেটা পুরোপুরি ট্রেসপাসিং–অনধিকার প্রবেশ। ওরা পুলিশ ডাকলে মেয়ে বলে আমি পার পেয়েও যেতে পারি কিন্তু তুমি বিপদে পড়বে। একটু থেমে ফের বলে, ভেতরে গিয়ে আমি আগে অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করি। যদি দেখি সব কিছু ফেভারেবল তখন তোমাকে যেতে বলব।
প্রথমে অমিতেশরা রাজি হয় না। অনেক তর্কাতর্কির পর শেষ পর্যন্ত অবশ্য রণিতার কথাটা মেনে নেয়।
বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞেস করেন, কবে ও বাড়িতে যেতে চাও?
রণিতা বলে, আজই।
কখন যাবে?
দিনের বেলা কিছুতেই নয়। দেখে ফেললে এমন হইচই বাধিয়ে দেবে যে আমাদের সমস্ত প্ল্যানটাই ভেস্তে যাবে। ঢুকব কাল ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতে, কেউ জেগে ওঠার আগে। মাঝরাতে ও বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও ঢুকতে পারি, তাতে বাকি রাতটা মশার কামড় খেয়ে কাটাতে হবে।
পরিকল্পনাটা পছন্দ হয় বিন্দুবাসিনীর। বলেন, সেই ভাল।
অমিতেশ কিছু ভাবছিল। বলে, কিন্তু একটা প্রবলেম থেকে যাচ্ছে। অত ভোরে তুমি এখানে আসবে কী করে?
রণিতা বলে, সেটাও ভেবে রেখেছি। বিন্দুবাসিনী মাসিমা আজকের রাতটা এখানে যদি থাকতে দেন, তা হলে আর সমস্যা থাকে না। ভোরবেলা বর্ডার ক্রস করে আনিসে ওপারে চলে যেতে পারব। একটু রগড় করার জন্য গলার স্বরে ঢেউ খেলিয়ে হিন্দি শব্দটা উচ্চারণ করল সে।
বিন্দুবাসিনী তক্ষুনি বলে ওঠেন, নিশ্চয়ই থাকবে। আমি বলি কী আজ আর বাড়ি গিয়ে দরকার নেই। মা-বাবাকে ফোনে জানিয়ে দাও কাল ফিরবে।
রণিতা বলে, না, বাড়িতে একবার যেতে হবে। দড়ি, হুক, টেপ রেকর্ডার, এগুলো আনা দরকার।
টেপ রেকর্ডার কেন?
যদি নয়নতারা কথা বলতে রাজি হন তার একটা রেকর্ড তো রাখতে হবে।
তবে একটা ক্যামেরাও নিয়ে যেও।
স্টিল ফোটো দিয়ে কাজ হবে না। নয়নতারা রাজি হলে পরে মুভি ক্যামেরা নিয়ে যাব।
অমিতেশ বলে, এর মধ্যে আমার রোলটা কী?
রণিতা বলে, আপাতত পর্যবেক্ষকের। তুমি শুধু দেখে যাবে, তারপর আমার সিগনাল পেলে ঝাঁপিয়ে পড়বে, বুঝলে?
বুঝলাম।
রণিতা বিন্দুবাসিনীকে বলে, মাসিমা, অমিত আর আমি এখন যাচ্ছি। কয়েকটা কাজ আছে, সেগুলো সেরে সন্ধের পর আমি আসব। অমিত আসবে কাল সকালে। ও আর আপনি এই ব্যালকনিতে বসে ও বাড়িতে আমার অ্যাক্টিভিটি ওয়াচ করে যাবেন।
বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞেস করেন, আজ তা হলে ও বাড়ির ওপর নজর রাখা। হবে না?
রণিতা বলে, কী দরকার? কাল থেকেই তো অপারেশন শুরু হয়ে যাচ্ছে।
.
১৪.
এখনও ভোর হয়নি, গাছপালার মাথায় থোকা থোকা অন্ধকার জমে আছে, আলিপুরের এই এলাকাটা একেবারে নিঝুম। কোথাও এতটুকু সাড়া শব্দ নেই, সব ঘুমের আরকে ডুবে রয়েছে।
এই সময়ে রণিতা বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে সেই কালো জাম গাছটার তলায় এসে দাঁড়ায়। তার সঙ্গে ক্রাচে ভর দিয়ে এসেছেন বিন্দুবাসিনী। রণিতার হাতে লম্বা নাইলনের দড়ি, তার মাথায় আংটা লাগান। পিঠে বাঁধা রয়েছে একটা মোটা পলিথিনের ব্যাগ, তার ভেতর ম্যাকিনটশ, নোটবুক, পেন, টেপ রেকর্ডার ইত্যাদি টুকিটাকি জিনিস।
বিন্দুবাসিনীর ডান হাতে ক্ৰাচসুষ্ঠু একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। গাছের উঁচু দিকের একটা ডাল লক্ষ করে তিনি বোতাম টিপলেন। আলোকিত অংশটায় দড়ি ছুঁড়ে আংটা আটকে দিল রণিতা। তারপর দড়িটা ধরে গাছের গুঁড়িতে পায়ের চাপ দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে ওপরে উঠে চাপা গলায় বলল, টর্চ নিভিয়ে আপনি বাড়ি চলে যান।
বিন্দুবাসিনী বলেন, ওধারে নামতে পারবে তো?
