রণিতা জিজ্ঞেস করে, তোমাদের বাড়িতে লোকজন আসে?
দারোয়ান চুপ।
রণিতা এবার বলে, তাদেরও নিশ্চয়ই বলে দাও মেমসাহেব বাড়ি নেই।
দারোয়ান জবাব দেয় না।
রণিতা বলে, তোমার মেমসাহেব যখন ফিরবেন একটা খবর দিতে পারবে?
দারোয়ানের ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক হয়, জি–
বলবে, খুব শিগগিরই আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই বাড়ির সামনে বসে থাকব। দেখব তোমার মেমসাহেব কখন বেরোন আর কখন ফিরে আসেন।
রণিতার কথা শেষ হতে না হতেই ঝড়াং করে গেটের গায়ের ছোট চৌকো পাল্লাটা বন্ধ হয়ে যায়।
.
বিন্দুবাসিনী আর অমিতেশ পশ্চিমের ব্যালকনিতে উদগ্রীব বসে ছিল। রণিতা ফিরে আসতেই দুজন জানতে চাইল, কাজ কিছু হল?
দারোয়ানের সঙ্গে যা যা কথাবার্তা হয়েছে, তার লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে রণিতা বলে, ভেরি হার্ড নাট টু ক্র্যাক। তবে আমিও আল্টিমেটাম দিয়ে এসেছি।
কিসের আল্টিমেটাম?
দু-চারদিনের মধ্যে ওদের বাড়ির সামনে দিনরাত পিকেটিং শুরু করব।
বিন্দুবাসিনী আর অমিতেশ হেসে ফেলে।
অনেকটা বেলা হয়ে গিয়েছিল। সূর্য মাথার ওপর থেকে পশ্চিম আকাশের ঢালু পাড় বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেছে। এধারে ওধারে ছন্নছাড়া ভবঘুরে কিছু মেঘ এলোমেলো ভেসে বেড়াচ্ছে। চারপাশের গাছগাছালির মাথায় পাখি উড়ছিল। কোথায় ডালপালার আড়ালে বসে ঘুঘু ডাকছে একনাগাড়ে।
বিন্দুবাসিনী বললেন, চল, দুপুরের খাওয়াটা সেরে আসি।
লাঞ্চের পর আবার তিনজনে পশ্চিমের ব্যালকনিতে ফিরে আসে। আর তখনই অবনীশের কথা মনে পড়ে যায় রণিতার। আজ দুপুরে তিনি ওকে ফোন করতে বলেছিলেন।
রণিতা বলে, আমি একটা ফোন করব মাসিমা।
নিশ্চয়ই করবে। টেলিফোনটা আনিয়ে দিচ্ছি।
বিন্দুবাসিনী বেল বাজিয়ে কাজের লোককে ডাকতে যাবেন, রণিতা বলে, আমিই নিয়ে আসছি।
দক্ষিণ দিকে যেখানে সারাটা দিন বিন্দুবাসিনী বসে বসে কাটিয়ে দেন সেখানে একটা টেবলের ওপর টেলিফোনটা থাকে। ফোন আর বাইনোকুলার এই দুটো দিয়েই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর যেটুকু যোগাযোগ।
ফোনটা নিয়ে আসে রণিতা। দোতলার এই ব্যালকনিতে নানা জায়গায় প্লাগ পয়েন্ট রয়েছে। সেখানে প্লাগ লাগিয়ে একবার ডায়াল করেই অবনীশকে ধরে ফেলে সে।
অবনীশ বলেন, নাম্বারটা পেয়ে গেছি রে ছোট খুকি। ওটা প্রাইভেট নাম্বার, টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে ছাপা হয় না। টুকে নে–
অমিতেশের পকেটে সব সময় একটা ছোট নোট-বই আর ডট পেন থাকে। রণিতা অবনীশের কাছ থেকে ফোন নাম্বারটা জেনে নিয়ে অমিতেশকে বলে, লেখো–
অমিতেশ লিখে নেয়।
রণিতা এবার অবনীশকে বলে, কার নামে এই ফোনটা নেওয়া হয়েছে জানো?
অবনীশ বলেন, নিশ্চয়ই। মমতা রায় নামে এক ভদ্রমহিলার নামে।
রণিতা বেশ দমে যায়, ঠিক দেখেছ? অন্য কারো নামে নেই তো? সে নিশ্চিত ছিল নয়নতারা রায়ের নামটা শুনতে পাবে, ফলে রীতিমতো হতাশই হতে হয়।
অবনীশ বলেন, আরে বাবা, অত ভুল আমার হয় না, তিন চার বার আমি রেকর্ডটা খুঁটিয়ে দেখেছি। একটু থেমে জিজ্ঞেস করেন, তা হ্যাঁ রে, তুই কি অন্য কারো নাম এক্সপেক্ট করেছিলি?
নয়নতারার নামটা মুখ থেকে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, মুহূর্তে সামলে নেয় রণিতা। আপাতত ব্যাপারটা জানাজানি হোক, সেটা চায় না সে। দ্রুত বলে ওঠে, না না, ঠিক আছে। তুমি আমার জন্যে এত করলে। মেনি মেনি থ্যাংকস।
শুকনো থ্যাংকসে চিড়ে ভিজবে না, একদিন তোর বৌদি আর আমাকে ভাল রেস্তোরাঁয় ফার্স্ট ক্লাস একখান লাঞ্চ খাওয়াতে হবে।
নিশ্চয়ই খাওয়াব। কবে তোমাদের সময় হবে আগে জানিও। এখন ছাড়ছি মণিদা–
হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় ব্যস্তভাবে অবনীশ বলে ওঠেন, আরে আসল কথাটাই সকালে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম।
রণিতা বলে, কী কথা?
চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের ফোন নাম্বারটার জন্যে এত অস্থির হয়ে উঠেছিস কেন?
পরে শুনো।
মনে হচ্ছে ব্যাপারটা মিস্টিরিয়াস।
এখন কিছু জানতে চেও না মণিদা–অবনীশকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন নামিয়ে রাখে রণিতা।
বিন্দুবাসিনী আর অমিতেশ অসীম কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞেস করেন, কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
রণিতা বলে, আমার এক পিসতুতো দাদার সঙ্গে। ও ক্যালকাটা টেলিফোনসের বিরাট অফিসার।
কার ফোন নাম্বার নিলে? বিন্দুবাসিনী জানতে চাইলেন।
মজাদার একটু হেসে রণিতা বলে, মমতা রায়ের।
সে কে?
চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে যিনি থাকেন।
বিমূঢ়ের মতো বিন্দুবাসিনী বলেন, কিন্তু–
রণিতা বলে, ও বাড়িতে নয়নতারা থাকেন, এটাই বলবেন তো?
আস্তে মাথা নাড়েন বিন্দুবাসিনী।
রণিতা বলে, কিন্তু ফোনটা রয়েছে মমতা রায়ের নামে।
বিন্দুবাসিনী বলেন, সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
যে নামেই থাক, আমি কিন্তু মহিলাকে দেখে তাঁর সঙ্গে কথা না বলে ছাড়ছি না।
বিন্দুবাসিনী আর রণিতা যখন কথা বলছিল, সেই সময় অমিতেশ চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে চোদ্দ নম্বর বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে উত্তেজিত গলায় প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, দারোয়ানটা তোমাকে স্রেফ ধোঁকা দিয়েছে। ওই যে, ও বাড়ির ব্যালকনিতে একজন মিডল-এজেড ভদ্রলোককে দেখা যাচ্ছে
কোথায় কোথায়– অমিতেশের হাত থেকে বাইনোকুলারটা একরকম কেড়ে নিয়ে নিজের চোখে লাগায় রণিতা। বলে, রাইট, রাইট। এই তো। না না অমিত, মিডল-এজেড নয়, হি মাস্ট বি অ্যারাউন্ড সেভেনটি। সাদা চুল, সাদা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, সাদা হুইস্কার–এই যাঃ, ডান পাশের ঘরটায় ঢুকে যাচ্ছেন।
