রণিতার কথায় সায় দেন বিন্দুবাসিনী, সেই ভাল।
রণিতা চলে যায়।
.
১২.
চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটের গেটের পাল্লাটা আগাগোড়া দু ইঞ্চি পুরু ইস্পাত দিয়ে তৈরি। খাড়াই বারো তেরো ফুট, চওড়ায় কম করে দশ ফুট তো হবেই।
বাড়ির সামনে ঝকঝকে রাস্তা, তার ওধারে ছোট একটা পার্ক। সেখানে প্রচুর গাছপালার ফাঁকে বাচ্চাদের জন্য দোলনা, নাগরদোলা, স্লিপ ইত্যাদি।
এখন দশটার মতো বাজে। কিন্তু রাস্তায় লোজন অক্সই চোখে পড়ছে। তবে ঝাঁকে ঝাঁকে মারুতি, অ্যাম্বাসাডর কি কনটেসা বা বিদেশি ইমপোর্টেড কার প্রায় নিঃশব্দে মসৃণ গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ পাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে পদাতিক খুব কমই আছে, মাটিতে তারা কেউ পা ফেলতে চায় না।
নিরেট ইস্পাতের বিশাল গেটটার সামনে এসে প্রথমটা হতাশাই বোধ করে রণিতা। এই জবরদস্ত ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢোকা কি তার পক্ষে আদৌ সম্ভব হবে।
গেটটা এত উঁচু যে রাস্তার দিক থেকে ভেতরের প্রায় কিছুই চোখে পড়ে । দারোয়ান টারোয়ান কেউ আশেপাশে আছে কিনা কে জানে।
পিছিয়ে রাস্তার ওধারে পার্কের কাছে গিয়ে বাড়ির ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল রণিতা। দূরে আসার জন্য গেটের মাথা টপকে দৃষ্টি ভেতর পর্যন্ত গেল বটে, তবে দোতলার খানিকটা অংশ আর বড় বড় গাছের ঝাঁকড়া ডালপালা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না।
ফের রণিতা গেটের কাছে ফিরে এল। ইস্পাতের পাল্লায় যখন সে ধাক্কা মারতে যাবে, সেই সময় পাশের কমপাউন্ড ওয়ালে চোখ গেল তার। সেখানে দেওয়াল কেটে লেটার বক্স, আর তার গায়ে একটা কলিং বেল। রণিতা এক মুহূর্ত দেরি না করে বেল টিপল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই।
পর পর আরো কয়েক বার বেল বাজালো রণিতা। ভেতরে যে টুং টাং আওয়াজ হচ্ছে এখান থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কিন্তু গেট খোলার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই, এমন কি কারো গলা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
হঠাৎ রণিতার মনে হল, বেল বাজালেও ইচ্ছা করেই খুব সম্ভব সাড়া দেওয়া হয় না। দর্শনপ্রার্থী তখন হয়তো ক্লান্ত হয়ে চলে যায় কিন্তু এ বাড়ির লোকেরা রণিতাকে চেনে না। সে যেমন একবোখা তেমনি জেদি, কিছু একটা মাথায় চাপলে তার শেষ না দেখে ছাড়ে না।
কাজেই অনবরত বেল বাজাতে লাগল রণিতা। দেখা যাক, কতক্ষণ ওরা সাড়া না দিয়ে পারে।
মিনিট দশেক পর ঘটাং করে ধাতব শব্দ হল। দেখা গেল ইস্পাতের গেটটার গায়ে ঘোট একটা পাল্লা খুলে গেছে আর সেই ফোকরে দেখা দিয়েছে একটি মোঙ্গলিয় মুখ। লোকটা নেপালি ভূটানি বা সিকিমি হতে পারে। আধবোজা ছোট ছোট চেরা চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিসকো চাহিয়ে?
রণিতা বলে, গেটটা তো আগে খোল।
হুকুম নেহি হ্যায়। ভাবলেশহীন গলায় জানিয়ে দেয় দারোয়ান।
একটু চিন্তা করে রণিতা জিজ্ঞেস করে, বাড়িতে কে আছে?
কোঈ নেহি।
বোঝা যাচ্ছে, বাড়িতে কেউ নেই, গেট খোলা বারণ– এ সব দারোয়ানকে শেখানো আছে। রণিতা বলে, কিন্তু একটু আগে তোমাদের দোতলায় একজনকে যে দেখলাম মিথ্যেটা উচ্চারণ করতে তার গলার স্বর মুহূর্তের জন্যও কাঁপে না। লোকটার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য সে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে।
দারোয়ান পলকের জন্য থতিয়ে যায়। তারপর বলে, আপ ভুল দেকা। মেমসাব–
রণিতা বুঝতে পারে, বাড়ির ভেতর কেউ থাকলে দারোয়ান কিছুতেই কবুল করবে না। এ নিয়ে আর টানাহ্যাঁচড়া করে লাভ নেই। সে জিজ্ঞেস করে, সকালে তোমাদের বাড়িতে তো এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। তিনিও কি নেই?
দারোয়ান চমকে ওঠে। তার চোখেমুখে চকিতের জন্য দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ে। মিলিয়ে যায়। দ্রুত শ্বাস টেনে সে বলে, নেহি, কোঈ নেহি আয়া হ্যায়।
লোকটা ভালমানুষের মতো মুখ করে ডাহা মিথ্যে বলছে। যে প্রতিজ্ঞা করেছে সত্যি বলবে না তার পেট থেকে আসল কথাটা বার করা মুশকিল। রণিতা এবার একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়, তোমাদের এই বাড়ির মালিক কে?
এমন একটা প্রশ্ন বোধহয় আশা করে নি দারোয়ানটা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে বলে, মালিক নেহি, মালকিন। মেরা মেমসাব–
নাম কী তোমার মেমসাহেবের?
মালুম নেহি—
কখন ফিরবেন?
মালুম নেহি –
রণিতা জিজ্ঞেস করে, কখন এলে মেমসাহেবের সঙ্গে দেখা হতে পারে?
দারোয়ান বলে, মালুম নেহি।
যদি সকালে আসি, উনি থাকবেন?
মালুম নেহি।
দুপুরে, বিকেলে, সন্ধ্যায়–রণিতা যখনকার কথাই বলে সেই একই উত্তর। লোকটাব ভেতর মালুম নেহির একটা ক্যাসেট পুরে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যেন চালু করে রাখা হয়েছে। কিছু জিজ্ঞেস করলেই ওটা শোনা যাবে।
রণিতা ভেতরে ভেতরে খেপে যাচ্ছিল, তবে মনোভাবটা বাইরে ফুটে বেরুতে দেয় না। এমন তো নয় যে সে আর আসবে না। বার বার এসে দারোয়ানটাকে তোয়াজ করলে হয়তো একদিন না একদিন এ বাড়ির গেট খুলে যাবে। কিন্তু প্রথম ক্লিই চটিয়ে দিলে সে আশা আর নেই।
রণিতা বলে, তার মানে যখনই আসি না কেন, তোমার মেমসাহেবের সঙ্গে দেখা হবে না, এই তো?
যত নরম করেই বলার চেষ্টা করুক না, রণিতার গলা থেকে খানিকটা আঁঝ বেরিয়ে আসে। কিন্তু সেটা গায়ে মাখে না দারোয়ানটা, নিরাসক্ত মুখে বলে, জি–
রণিতা বলে, তোমাকে বুঝি এসব বলার জন্যে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে?
দারোয়ান কিছু বলে না, শুধু আধবোজা ঘুমন্ত চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে তাকিয়ে থাকে।
