কথাটাঠিকই বলেছে শ্যামলী। বছরখানেকের ভেতর ওদের বাড়িযাওয়া তো বটেই, ফোনও করা হয় নি। বিব্রতভাবে রণিতা বলে, স্যরি বৌদি, খুব অন্যায় হয়ে গেছে। এবার থেকে দেখবে উইকে একবার করে তোমাদের ওখানে যাচ্ছি।
প্রমিস?
প্রমিস।
এরপর বাড়ির সবাই কে কেমন আছে, শ্যামলীর শাশুড়ি অর্থাৎ রণিতার আপন বড় পিসিমার বাতের কষ্টটা বেড়েছে কিনা, ওদের দুই ছেলে সানি আর বনির পড়াশোনা কেমন চলছে, ইত্যাদি নানা খবর নিয়ে রণিতা বলে, মণিদাকে আবার ফোনটা দাও
অবনীশ বলেন, হ্যাঁ, বল—
রণিতা বলে, একটা ব্যাপারে আমাকে হেল্প করতে হবে মণিদা–
আই সি। য়ু আর টকিং শপ নাউ। ভেবেছিলাম আমাদের জন্যে প্রাণ কেঁদে উঠেছে তাই ছোট খুকি এই সাতসকালে ফোন করেছে। এখন দেখা যাচ্ছে–
ইয়ার্কি কোরো না মণিদা—
অবনীশ বলেন, আচ্ছা আচ্ছা, বল কী করতে হবে?
রণিতা বলে, আমি একটা বাড়ির ঠিকানা জানি কিন্তু ফোন নাম্বার জানি না। ফোন নাম্বারটা আমার ভীষণ দরকার। ঠিকানা বললে তোমরা কি ওটা বার করে দিতে পারবে?
কলকাতার ফোন তো?
তা না হলে তোমাকে বলব কেন?
অবনীশ বলেন, কোনো অসুবিধে হবে না। কবে চাই?
রণিতা বলে, অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল–
আজ দুপুরে, ধর একটা নাগাদ আমার অফিসে একটা ফোন করতে পারবি?
নিশ্চয়ই পারব।
দেখি তখন নাম্বারটা দিতে পারি কিনা। ঠিকানাটা বল।
লিখে নাও–
ঠিকানা জানিয়ে টেলিফোন নামিয়ে রাখে রণিতা। তারপর সোজা বাথরুমে চলে যায়। নটায় বিন্দুবাসিনীর কাছে পৌঁছুতে হবে। দিন তিনেক সে আর অমিতেশ ও বাড়িতে যাচ্ছে কিন্তু চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে বার দুই একটি কাজের মেয়েকে ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি।
অবনীশের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর স্নান টান সেরে বেরিয়ে পড়ে রণিতা কিন্তু মেট্রো রেলের কালিঘাট স্টেশনের কাছে এসে অমিতেশের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল তাকে। রোজ এখানে যে আগে আসে সে অনোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একসঙ্গে বিন্দুবাসিনীদের বাড়ি চলে যায়।
চল্লিশ মিনিট দাঁড়াবার পর রণিতা যখন অধৈর্য হয়ে উঠেছে সেই সময় অমিতেশ এল। রণিতা মুখ খোলার আগেই সে বলে ওঠে, মায়ের সকাল থেকে শরীরটা খারাপ। ডাক্তারের কাছে গেলাম, তাই দেরি হয়ে গেল।
বিরক্তিটা মুহূর্তে কেটে যায়, চোখেমুখে উদ্বেগ ফুটে ওঠে রণিতার, হঠাৎ শরীর খারাপ হল?
হঠাৎ আর কোথায়? তুমি তো জানোই, মায়ের ইস্কিমিয়ার একটা ট্রাবল আছে। মাঝে মাঝে বুকের ব্যথাটা বেড়ে ওঠে। কদিন ওষুধ খেলে আর ডাক্তারের কথামতো চললে কমে যায়।
আজ না এলেই পারতে।
তুমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, তাই আসতে হল।
আমাকে একটা ফোন করলে না কেন?
করেছিলাম, তখন তুমি বেরিয়ে এসেছ।
রণিতা বলে, ঠিক আছে, তুমি বাড়ি চলে যাও। আমি আজ একাই বিন্দুবাসিনী মাসিমার বাড়ি যাব। বিন্দুবাসিনীকে তারা মাসিমা বলতে শুরু করেছে।
অমিতেশ বলে, একটা ইঞ্জেকসান দেবার পর মা এখন স্টেডি আছেন। কোনো ভয় নেই। তাছাড়া ছোট মাসিমাকে খবর দিয়ে আনিয়েছি, তিনিই মাকে দেখাশোনা করবেন। চল–
বানো নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে এসে দেখা গেল বিন্দুবাসিনী পশ্চিমের ব্যালকনিতে চোখে দূরবীন লাগিয়ে বসে আছেন। অন্য দিন তিনি দক্ষিণ দিকে বসে থাকেন, রণিতারা এলে ব্রেকফাস্ট করে ওদের নিয়ে পশ্চিম দিকে চলে যান।
চোখ থেকে বাইনোকুলার নামিয়ে বিন্দুবাসিনী বলেন, কী ব্যাপার, তোমরা তো ব্রিটিশ পাংচুয়ালিটি মেনে চল। আজ এত দেরি হল যে?
কারণটা জানিয়ে দেয় অমিতেশ।
বিন্দুবাসিনী বলেন, ও, আচ্ছা। এখানেও কলিং বেলের ব্যবস্থা আছে। সুইচ টিপে তিনি তিনজনের ব্রেকফাস্ট আনিয়ে নেন। কর্নফ্লেকসে দুধ ঢালতে ঢালতে বলেন, আজ ও বাড়িতে একটা লোককে দেখলাম। এতদিন কাজের মেয়ে, দারোয়ান আর বার কয়েক ওই মহিলাকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখি নি। এই লোকটি নতুন।
রণিতা উৎসকু সুরে জিজ্ঞেস করে, কখন দেখেছেন?
ধরো নটা দশ টশে। তোমাদের জন্যে নটা পর্যন্ত ওধারে অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর এখানে এসে বসবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ও বাড়ির ও ধারের ব্যালকনিতে ভদ্রলোককে দেখলাম। একটু থেমে বলেন, বেশ বয়েস হয়েছে, ছেষট্টি সাতষট্টির মতো। তবে স্বাস্থ্য খুব ভাল। এর বেশি এতদূর থেকে আর কিছু বোঝা যায় নি।
এই ভদ্রলোককে ধরতে পারলে মহিলা সম্পর্কে হয়তো কিন্তু জানা যেতে পারে।
তা হয়তো পারে কিন্তু ওঁকে ধরবে কী করে?
একটু ভেবে রণিতা বলে, একটা কাজ করলে কেমন হয়?
কী? বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞাসু চোখে তাকান।
ভাবছি এখনই একটা চান্স নেব।
কিসের চান্স?
ওঁদের বাড়িতে ঢোকার। ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল তো হল। নইলে মহিলাটির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় কিনা, একবার চেষ্টা করে দেখব।
বিন্দুবাসিনী দ্বিধান্বিতভাবে বলেন, দেখ। কিন্তু–
তার দ্বিধার কারণটা আন্দাজ করতে পারছিল রণিতা। এর আগেই বিন্দুবাসিনী জানিয়ে দিয়েছিলেন, চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিটে বাইরের লোকজনের প্রবেশ নিষিদ্ধ, ওখানে গিয়ে সুবিধা হবে না। রণিতা বলে, ওরা ঢুকতে না দিলে কী আর করা যাবে। মিনিমাম এটুকু কনসোলেসান থাকবে যে আমরা চেষ্টা করেছিলাম।
বিন্দুবাসিনী এবার আর বাধা দেন না। বলেন, দেখ তা হলে–
রণিতা উঠে পড়ে। অমিতেশও উঠতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, আমি একাই যাব। একটা মেয়েকে দেখলে ওরা দরজা খুলে দিতে পারে কিন্তু দল বেঁধে গেলে সে আশা নেই। তুমি আর মাসিমা এখানে বসে বাড়িটা ওয়াচ করতে থাকো। আমি ঘুরে আসছি।
