অমিতেশ মজার গলায় বলে, বার্ড ওয়াটারদের মতো তাকিয়ে থাকার কথা বলছেন?
বিন্দুবাসিনী বলেন, নিশ্চয়ই।
রণিতা বলে, ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের ব্যাপারে ভাববেন না। আমরা ব্যবস্থা করে নেব।
বিন্দুবাসিনী রেগে যান, তা হলে তোমাদের আসার দরকার নেই।
রণিতা হকচকিয়ে যায়, মানে–
সারাদিন চুপচাপ বসে থাকি। কতকাল তামাদের বাড়িতে লোকজন আসে না। তোমরা আমার নাতি-নাতনির বয়সী। বলে কিনা খাওয়ার ব্যবস্থা করে নেবে। আন্তরিকতার দাম নেই তোমাদের কাছে? এমন হৃদয়হীন ছেলেমেয়ে আমি কখনও দেখিনি। ক্ষুব্ধ, অভিমানী মুখে বসে থাকেন বিন্দুবাসিনী।
হাতজোড় করে শশব্যস্তে রণিতা বলে, অন্যায় হয়ে গেছে, ক্ষমা করবেন। আমরা এখানেই খাব।
বিন্দুবাসিনী খুব সম্ভব বেশিক্ষণ রাগ বা অভিমান করে থাকতে পারেন না। হাসিমুখে বলেন, ঠিক আছে, ক্ষমা করা গেল। তোমরা এখানে বসে বসে ওই বাড়িটা দেখতে থাকো। আমি ওষুধ খেয়ে আসছি। বলে হাতল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলে যান।
এখানেও কয়েকটা খাটো গুজরাতি চেয়ার সাজানো রয়েছে। রণিতা আর অমিতেশ বসে পড়ে।
মিনিট পাঁচেক বাদে বিন্দুবাসিনী ফিরে আসেন। তাঁর কোলে বাইনোকুলারটা রয়েছে। এবার পালা করে করে তিনজনে দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে ওই বাড়িটা দেখতে থাকে। কিন্তু কাউকেই দেখা যায় না। বাড়িটা এমনই নিঝুম যে মানুষজন আছে কিনা সন্দেহ।
দুপুরে দোতলারই আরেক মাথায় ডাইনিং রুমে রণিতাদের নিয়ে যান বিন্দুবাসিনী। সেখানে তাঁর দেওর সুধীরেশ মল্লিকের সঙ্গে আলাপ হয়। বিন্দুবাসিনীর প্রায় সমবয়সী, ভারি চেহারার এই মানুষটির প্রায় গোটা মাথা জুড়ে টাক, এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত মাথার পেছন দিকটা ঘিরে ধবধবে সাদা কিছু চুল এখনও অবশ্য টিকে আছে। মোটা ভুরু, শান্ত চোখ, গোল মাংসল থুতনি। পরনে পাজামার ওপর ঢলঢলে ফতুয়া ধরনের পকেটওলা জামা। চোখে পুরু লেন্সের চশমা।
ভদ্রলোক যে অত্যন্ত স্বল্পভাষী সেটা বোঝা গেল, যখন বিন্দুবাসিনী রণিতাদের এ বাড়িতে আসার কারণটা সাতকাহন করে জানালেও তিনি শুধু নিরাসক্তভাবে বললেন, ও। তারপর প্লেটের ওপর ঝুঁকে অপরিসীম মনোযোগ খাওয়া শুরু করলেন।
তাঁর মুখে মাত্র এক অক্ষরের একটি শব্দ উচ্চারিত হওয়ায় বুঝিবা বিব্রত বোধ করছিলেন বিন্দুবাসিনী। সুধীরেশের ব্যবহারে পাছে রণিতারা কিছু মনে করে তাই নিজেই দেওর সম্পর্কে প্রচুর কথা বলতে লাগলেন। সুধীরেশের স্বভাবটাই ওরকম। ভীষণ চুপচাপ মানুষ। রিটায়ারমেন্টের পর সকালে ঘণ্টা দেড়েকের মর্নিং ওয়াক ছাড়া বাকি দিনটা বই নিয়েই তাঁর কেটে যায়। ওঁর অবশ্য পঞ্চাশ ষাটটা নানা জাতের পাখি আছে, তাদের নিয়েও খানিকটা সময় কাটে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব কথা যখন হচ্ছে তখন মাঝে মাঝে মুখ তুলে সামান্য হেসে, গলার ভেতর অস্পষ্ট আওয়াজ করে ফের খাওয়ায় মগ্ন হয়ে গেছেন সুধীরেশ। আওয়াজটা সন্তোষসূচক কিনা বোঝা যায়নি।
লাঞ্চের পর আবার রণিতারা তিনজন পশ্চিমের ব্যালকনিতে এসে বসেছে। কিন্তু চকিতের জন্য ও বাড়ির ঝুল বারান্দায় একটি কাজের মেয়ে ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি।
পাঁচটা বাজলে চা খেয়ে রণিতারা আজকের মত বিদায় নিতে যাবে, সেই সময় একটা কথা মনে পড়ে যায়। এভাবে তো ব্যালকনিতে অনিশ্চিতভাবে বসে থেকে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো মহিলাকে একমাস কি দু মাস পর দেখা গেল এবং নিঃসংশয় হওয়া গেল তিনি নয়নতারা নন। তখন এই এক দু মাস পুরোপুরি নষ্ট। তাই অন্যভাবেও চেষ্টা করতে হবে।
তাই, রণিতা জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, ও বাড়ির ফোন নাম্বার আপনি জানেন?
বিন্দুবাসিনী বলেন, না!
বাড়ির নম্বরটা বলতে পারবেন?
তা পারব। চোদ্দ নম্বর রবিনসন স্ট্রিট। নম্বর জানতে চাইছ কেন?
দেখি যদি ঠিকানা থেকে ফোনের কোনো হদিশ পাওয়া যায়।
দেখো। কাল কখন আসছ?
নটায়।
১১-১৫. রবিনসন স্ট্রিট
রবিনসন স্ট্রিটের চোদ্দ নম্বর বাড়ির ফোন নাম্বারটা কিভাবে জানা যায়, ঠিক করতে পারছিল না রণিতা। একবার ভেবেছিল লালবাজারে রণজয়কে ফোন করে। পুলিশের বিপুল ক্ষমতা, ইচ্ছা করলে কয়েক মিনিটের ভেতর ওটা বার করে ফেলবে। পরক্ষণে তার মনে হয়েছে, না, পুলিশকে আপাতত জানাবে না।
প্রথমে সে নিজের মতো করে চেষ্টা করবে। না পারলে তখন দেখা যাবে। তার এক পিসতুতো দাদা অবনীশ ক্যালকাটা টেলিফোনের বিরাট অফিসার। আজ সকালে চাটা খাবার পর তাকে ফোন করল রণিতা।
ওধার থেকে অবনীশের ঘুম-জড়ানো ভারি গলা ভেসে এল, কে? তিনি বেশ লেট-লতিফ ধরনের মানুষ। অনেক রাত করে ঘুমোন, তাই উঠতে উঠতে দেরি হয়ে যায়।
রণিতা বলে আমি ছোট খুকি মণিদা–ওরা ভাইবোনরা অবনীশকে মণিদা বলে ডাকে।
অবনীশের ঘুমের শেষ রেশটুকু মুহূর্তে ছুটে যায়। তিনি দারুণ মজার গলায় বলেন, মাউন্ট হিমালয়া কি আজ ইন্ডিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণে সরে গেল নাকি?
রণিতা বলে, মানে?
নইলে ছোট খুকি নিজের থেকে আমাদের ফোন করে? কী সৌভাগ্য! দাঁড়া দাঁড়া, তোর বৌদিকে ডাকি–
রণিতা কিছু বলার আগেই ফোনে অবনীশের গলা ভেসে আসতে থাকে, শ্যামলী শুনছ, এদিকে এস, কুইক এরপর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী কথা হয় সেটা আর বোঝা যায় না। একটু পর শ্যামলী বৌদির গলা শুনতে পায় রণিতা, বড় ডিরেক্টর হয়ে আমাদের কথা ভুলেই গেছ। কতদিন আমাদের এখানে ফোন কর নি, আস নি-বল তো?
