বিন্দুবাসিনী রণিতাদের বলেন, বসো। তাঁর টেবলে সুইচ লাগানো রয়েছে। তিনি সেটা টিপতেই একটা কাজের লোক ছুটে আসে। তাকে দিয়ে রণিতাদের জন্য কফি আর বিস্কুট আনিয়ে বলেন, খাও–
রণিতারা শুধু কফির কাপ তুলে নেয়।
বিন্দুবাসিনী এবার বলেন, চিঠিতে তোমাদের জানিয়েছি, এখন মুখেও বলছি, আমি যাঁকে দেখেছি তিনি হুবহু নয়নতারার মতো। একরকম চেহারার মানুষ কম হলেও মাঝে মাঝে দেখা যে যায় না তা নয়। আমার যদি ভুল হয়ে থাকে তোমাদের ছোটাছুটি কিন্তু সার হবে।
অমিতেশ বলে, এ নিয়ে সঙ্কোচ বোধ করবেন না। মহিলা নয়নতারা না হলে কী আর করা যাবে। আপনি নিজের থেকে সাহায্য করতে চেয়েছেন, সে জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ।
বিন্দুবাসিনী সামান্য হাসেন।
রণিতা জিজ্ঞেস করে, কবার ওঁকে দেখেছেন?
বিন্দুবাসিনী বলেন, মাস চারেক ওঁরা এখানে এসেছেন, তার ভেতর বার তিনেকের বেশি নয়। প্রতিবারই দূরবীন দিয়ে।
মহিলা বাইরে বেরোন না?
আমি অন্তত দেখিনি।
আর কেউ ওঁকে দেখেছে বলে জানেন?
বিন্দুবাসিনী অল্প হাসেন, এ পাড়ার লোকজনেরা প্রতিবেশীদের বাড়িতে কদাচিৎ যায়, আমাদের বাড়িতেও বড় একটা আসে না। অন্য কেউ মহিলাকে দেখে থাকলে আমি জানি না।
কলকাতার এই নিরিবিলি অভিজাত অঞ্চলে বিশাল বিশাল কম্পাউণ্ডের মাঝখানে একেকটা বাড়ি দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি, কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক নেই। বিন্দুবাসিনী যা বলেছেন সেটাই হয়তো ঠিক। এখানকার বাসিন্দাদের অন্যের সম্বন্ধে মধ্যবিত্তসুলভ কৌতূহল নেই, কেউ কারো সঙ্গে বিশেষ মেশেটেশে না। রণিত জিজ্ঞেস করে, ওই মহিলার বাড়িতে কাউকে যাতায়াত করতে দেখেছেন?
কেন বল তো?
তা হলে তাদের সঙ্গে দেখা করতাম।
বুঝেছি। দেখা করে জেনে নিতে ওই মহিলা সত্যিই নয়নতারা কিনা?
হ্যাঁ।
একটু চুপ করে থেকে বিন্দুবাসিনী বলেন, না, তেমন কেউ আমার চোখে পড়ে নি। অবশ্য ওদের গেটটা উলটো দিকে। আমাদের এখান থেকে ভাল দেখা যায় না। বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে যায় তাঁর, সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, আরে, তোমাদের তো মহিলার বাড়িটাই দেখানো হয়নি। চল–
বিন্দুবাসিনীদের দোতলার ব্যালকনিটা আধখানা বৃত্তের মতো দক্ষিণ দিক থেকে পশ্চিমে ঘুরে গেছে। বিন্দুবাসিনী হ্যাঁন্ডেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হুইল চেয়ারটা পশ্চিম দিকে নিয়ে আসেন। তাঁর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রণিতারাও চলে আসে।
ডান দিকে আঙুল বাড়িয়ে বিন্দুবাসিনী বলেন, ওই যে বাড়িটা–
রণিতারা লক্ষ করল, বাড়িটা দোতলা। ইওরোপে গ্রীষ্মকালীন অবসর কাটানোর জন্য যে ধরনের ভিলা দেখা যায়, অনেকটা সেইরকম। এ অঞ্চলের অন্য সব বাড়ির মতো ওই বাড়িটা ঘিরেও বিশাল বাগান। বাগানের এধারে প্রায় পনেরো ফুট উঁচু মজবুত কমপাউন্ড ওয়াল। তার ওপর আবার পাঁচ লাইন করে কাঁটাতার বসানো। পাঁচিল টপকে চট করে ভেতরে ঢোকা প্রায় অসম্ভব।
বাগানের গাছপালা এত ঘন যে বাড়ির ভেতরটা বিশেষ দেখা যায় না। বিন্দুবাসিনীদের মতো ওই বাড়িটারও দোতলার অর্ধেক জুড়ে টানা ব্যালকনি। সেটা এখন ফাঁকা। লোহার পাল্লার সামান্য একটু অংশ ছাড়া গেটটা প্রায় চোখেই পড়ে না, বাড়ির আড়ালে সেটা ঢাকা পড়ে গেছে।
রণিতার কেমন সংশয় হয়, যত উদ্দীপনাই থাক, বিন্দুবাসিনীর মত একজন বৃদ্ধার পক্ষে পঁচাত্তর বছরের জ্যোতিহীন চোখ দিয়ে গাছগাছালির বাধা পেরিয়ে পাঁচ শ ফুট দূরের এক মহিলাকে নয়নতারা বলে শনাক্ত করা সম্ভব কিনা। মনে মনে কিছুটা হতাশা বোধ করে সে।
বিন্দুবাসিনী বলেন, আমার একটা পরামর্শ আছে।
বলুন- রণিতা উৎসুক চোখে তাকায়।
ভদ্রমহিলা বোধহয় থট-রিডার, মুখ দেখে মনের কথা পড়তে পারেন। বললেন, প্রথমে তোমরা নিশ্চিত হয়ে নাও, মহিলাটি সত্যিই নয়নতারা কিনা।
কীভাবে?
সে জন্যে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। তোমাদের যুবা বয়সের চোখ, যথেষ্ট তেজ আছে। এখানে বসে বসে ওই বাড়িটার ওপর নজর রাখো। দরকার হলে বাইনোকুলারটা ব্যবহার করো। যদি তোমাদের মনে হয় মহিলা নয়নতারাই তখন ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। অবশ্য–
কী?
শুনেছি ও বাড়িতে নিজেদের ঘনিষ্ঠ লোকজন ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। তোমরা ভেতরে যাবার সুযোগ পাবে কি? অবশ্য সেটা পরের কথা।
আগে নয়নতারা সম্পর্কে সব সংশয় দূর করে নিতে হবে।
সে তো ঠিকই। কিন্তু–
কী?
একটু ভেবে রণিতা বলে, আপনি বলেছেন চার মাসে মাত্র তিনবার ওঁকে দেখেছেন। আমাদের কত দিন ওঁদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হবে?
এ দিকটা আগে বোধহয় চিন্তা করেন নি বিন্দুবাসিনী। ভুরু সামান্য কুঁচকে বলেন, এটা একটা সমস্যা বটে। কিন্তু কী আর করা, যতদিন না ওঁকে দেখতে পাচ্ছ তাকিয়ে থাকতেই হবে।
সেটা করতে হলে আপনার বাড়িতে তো রোজই আসতে হয়।
তা তো হয়ই। একটা বড় কাজ করতে চাইছ, তার জন্যে এটুকু পরিশ্রম করবে না? রোজ সকালে এখানে চলে আসবে। সন্ধে পর্যন্ত ওই বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকবে। লাঞ্চ, ব্রেক ফাস্ট, সব এখানে করবে। যখন যা সাহায্য দরকার, আমি করব।
রণিতারা বুঝতে পারছিল, এই বয়সে, পানসে কর্মহীন জীবন আর ভাল লাগছে না বিন্দুবাসিনীর। তাদের দেখে রীতিমত উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছেন। নয়নতারাকে খুঁজে বার করার মতো দারুণ রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় এক অভিযানে তিনি তাদের সঙ্গে থাকতে চান।
