রণিতা মজার চোখে বাবাকে লক্ষ করছিল। কৌশলে ইন্দ্রনাথ যে অমিতেশ সম্পর্কে সব জেনে নিচ্ছেন, সেটা বুঝতে তার অসুবিধা হয় নি। ইন্দ্রনাথের মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি খুশিই হয়েছেন। মেয়ে যে অপাত্রে হৃদয় সঁপে দেয় নি সে সম্বন্ধে তিনি নিশ্চিত।
কফি খাওয়া হয়ে গেলে ইন্দ্রনাথ বলেন, তুমি হয়তো শুনেছ, আমাদের ফ্যামিলি এবং আত্মীয়স্বজনেরা এখনও যথেষ্ট অর্থোডক্স। সে জন্যে তোমাদের কিছুদিন ধৈর্য ধরতে হবে।
মুখ নামিয়ে অমিতেশ বলে, রণি আমাকে সব বলেছে।
আশা করি, ধৈর্যর ফল ভালই হবে। আচ্ছা, আমি এবার উঠি। এনজয় ইওরসেলভস। বলতে বলতে উঠে পড়েন ইন্দ্রনাথ।
.
১০.
ছবি এবং নাটক দেখা, খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন ঘাঁটাঘাঁটি করে তথ্য সংগ্রহ, ফিল্ম ট্রেডের সঙ্গে যুক্ত নানা লোকের ইন্টারভিউ নেওয়া, সবই হয়ে গেছে কিন্তু যাঁকে ছাড়া ডকু-ফিচারটা হওয়া একেবারেই সম্ভব নয় সেই নয়নতারা এখনও নিখোঁজ।
দিল্লি থেকে রজনী মাঝখানে বার চারেক ফোন করেছিল। মাণ্ডি হাউস তাড়া দিচ্ছে, রণিতা যত তাড়াতাড়ি পারে একবার দিল্লি এসে যেন ডকুমেন্টারির কনট্রাক্টটা ফাইনাল করে যায়। কিন্তু সে ঠিক করেছে, নয়নতারাকে খুঁজে বার না করা পর্যন্ত কোথাও যাবে না। আরো কয়েক দিন দেখবে সে, তার মধ্যে সন্ধান না পেলে প্রোজেক্টটা বন্ধ করে দিতে হবে।
ক্রমশ যখন হতাশ হয়ে পড়ছে রণিতা, সেই সময় বক্স নাম্বারে অদ্ভুত এক চিঠি এল। পুরনো আলিপুর থেকে লিখেছেন জনৈকা বিন্দুবাসিনী দেবী।
মহাশয় বা মহাশয়া,
আমি একজন বৃদ্ধা, বয়স পঁচাত্তর। দীর্ঘকাল আমরা পুরাতন আলিপুরের বাসিন্দা। আমার স্বামী দশ বছর আগে স্বর্গীয় হইয়াছেন। আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। দুজনেই বিবাহিত এবং প্রবাসী। ছেলে থাকে আমেরিকায়, মেয়ে জামানিতে। আলিপুরের বাড়িতে আমার এক অবিবাহিত দেওর এবং আমি থাকি। দেওর আমারই সমবয়সী।
আমি চলৎশক্তিহীন মানুষ, কয়েক বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ডান পাটি হারাই। তার উপর বাতে এবং ব্লাড সুগারে পঙ্গু হইয়া আছি। সারাদিনই হুইল চেয়ারে বসিয়া কাটিয়া যায়। ক্কচিৎ ক্রাচও ব্যবহার করি। মাঝে মাঝে বই পড়ি, টিভি দেখি। আমার একটি দুরবীন আছে, বাহিরের পৃথিবীর সঙ্গে ওটার মাধ্যমে আমার যেটুকু যোগাযোগ। এই শক্তিশালী বাইনোকুলারটা চোখে লাগাইয়া গাছগাছালি দেখি, পাখি দেখি, রাস্তাঘাট বাড়িঘর মানুষের জীবনযাত্রা লক্ষ করি।
এবার কাজের কথায় আসা যাক। আপনারা খবরের কাগজে যে বিজ্ঞপ্তি দিয়াছেন সেই প্রসঙ্গে জানাই, সম্প্রতি কয়েক মাস হইল আমাদের পাশের বাড়িতে নূতন লোকজন আসিয়াছে। সেদিন দুরবীন দিয়া ওই বাড়ির ভিতরটা দেখিতে ছিলাম। এভাবে দেখাটা অন্যায় এবং কুরুচিকর কিন্তু যাহা করিয়াছি সম্পূর্ণ কৌতূহল বশেই, ইহার মধ্যে কোনোরকম দুরভিসন্ধি ছিল না। লক্ষ করিতে করিতে হঠাৎ একটি মহিলাকে দেখিয়া চমকিত হইলাম। একদা সিনেমায় এবং মঞ্চে যাঁর অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে এবং এখনও টিভি-তে যাঁর ছবি দেখিয়া আগের মতোই তৃপ্তি পাই সেই নয়নতারা দেবীর সঙ্গে তাঁহার যথেষ্ট মিল আছে। জানি না, আমাদের নূতন প্রতিবেশিনী নয়নতারাই কিনা।
এই খবরটি আপনাদের কতদূর কাজে লাগিবে, বুঝিতে পারিতেছি না। যদি দরকারি মনে করেন যে কোনোদিন সকাল নটা হইতে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে আসিতে পারেন। তখন বিস্তারিত কথা হইবে। আপনাদের কুশল কামনা করি।
নমস্কারান্তে,
বিন্দুবাসিনী দেবী
১২ রবিনসন স্ট্রিট
আলিপুর, কলিকাতা
বক্স নাম্বারের রোজকার চিঠি রোজ বিকেলে একটা প্যাকেটে পুরে রণিতাকে দেওয়া হয়। সে আর অমিতেশ সেগুলো নিয়ে দৈনিক দিনকাল-এর লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে।
আজ বিন্দুবাসিনী দেবীর চিঠিটা দুজনে বার তিনেক করে পড়ে। তারপর অমিতেশ বলে, সেই মহিলাটি যে নয়নতারা সেটা কিন্তু বিন্দুবাসিনী জোর দিয়ে লেখেন নি। বুড়ো মানুষ, ভুলও তো হতে পারে।
রণিতা বলে, নিশ্চয়ই পারে। তবু হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার চেয়ে চান্স একটা নেওয়াই যাক না।
ঠিক আছে। কবে যেতে চাও?
ঘড়ি দেখে রণিতা বলে, এখন চারটে পঁয়ত্রিশ। বিন্দুবাসিনী পাঁচটার ভেতর দেখা করতে লিখেছেন। আজ গিয়ে লাভ নেই। কাল সকালে নটায় যাব। তুমি রাসবিহারীর মোড় মেট্রো রেল স্টেশনের কাছে সাড়ে আটটায় ওয়েট কোরো। আমি ওখানে চলে আসব। অটো-টটো কিছু একটা ধরে ওল্ড আলিপুরে দশ পনেরো মিনিটের ভেতর পৌঁছে যাব। বিন্দুবাসিনীর বাড়িটা খুঁজে বার করতে ম্যাক্সিমাম আরো পনেরো মিনিট।
পরদিন অটো থেকে নেমে পনেরো নয়, পাঁচ মিনিটের ভেতর বারো নম্বর রবিনসন স্ট্রিট বার করে ফেলে রণিতারা। বিরাট কমপাউণ্ডওলা বাড়িটার গেটে যে বিহারী দারোয়ানটি অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল তার হাতে নিজেদের নাম লিখে একটা স্লিপ বিন্দুবাসিনী দেবীর কাছে পাঠিয়ে দেয় রণিতা। কিছুক্ষণের মধ্যে সে ফিরে এসে তাদের সঙ্গে করে দোতলার ব্যালকনিতে পৌঁছে দিয়ে চলে যায়।
চিঠিতে নিজের ডেসক্রিপশনটা মোটামুটি ঠিকই দিয়েছিলেন বিন্দুবাসিনী। হুইল চেয়ারে এই মুহূর্তে তিনি বসে আছেন। শীর্ণ রুগণ চেহারা, পরনে ধবধবে সাদা ফিজে-পাড় শাড়ি থাকলেও বোঝা যায় ডান পাটা নেই। চোখেপুরু লেন্সের চশমা, হাতে চওড়া সোনার চুড়ি, গলায় সরু হার। ডান পাশে একটা মাঝারি টেবলে খবরের কাগজ, কিছু বই, ট্রানজিস্টর, বাইনোকুলার, ম্যাগাজিন, কলম, ডট পেন, প্যাড, টেলিফোন ইত্যাদি। বোঝা যায় এসব নিয়েই তাঁর দিন কাটে। হুইল চেয়ারের বাঁ পাশে দড়ির তৈরি নিচু নিচু কটা গুজরাতি চেয়ার, ওগুলো দর্শনার্থীদের জন্য।
