কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায় চলে এলেন ইন্দ্রনাথ। তাঁর সঙ্গে অমিতেশের আলাপ করিয়ে দিতে অমিতেশ ঝুঁকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।
ছেলেটা যে দুর্বিনীত নয়, বরং যথেষ্ট বিনয়ী, এক নজর দেখেই ইন্দ্রনাথের মনে হল। আজকালকার ছোকরারা পরিচয় করিয়ে দিলে হ্যালো বলে, বড় জোর হাতজোড় করে নমস্কার করে। অমিতেশ তাদের মতো নয়। প্রণামটা ইন্দ্রনাথকে খুশি করেছে। সঙ্গে সঙ্গে একটু খটকাও লাগে। তাঁর মেয়ে খুবই ধুরন্ধর, হয়তো সে-ই অমিতেশকে আগে থেকে প্রণামের ব্যাপারটা জানিয়ে রেখেছে। কোনটা তাঁর পছন্দ, কোনটা অপছন্দ, রণিতা তা ভালই জানে। ইন্দ্রনাথ একটা চেয়ারে বসে তাঁর দুপাশে অমিতেশ আর রণিতাকে বসালেন। বললেন, কী খাবি বল?
রণিতা বলে, তুমি খাওয়াবে মানে! তুমি তো আমাদের গেস্ট। আমরা তোমাকে খাওয়াব–
হেসে হেসে হাত নাড়তে নাড়তে ইন্দ্রনাথ বলেন, ঠিক আছে।
ফ্রায়েড প্রন তো তোমার খুব পছন্দ। অডার দিই?
দে।
স্টুয়ার্ডকে ডেকে ইন্দ্রনাথের জন্য প্রণ আর নিজেদের জন্য চিকেন কাটলেট আর কফির অর্ডার দেয় রণিতা।
খাবার আসার আগেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অমিতেশ এবং তার মা এবং বোন সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে নেন ইন্দ্রনাথ। তাঁর মনে হয় পরিবারটি ভাল, শিক্ষিত এবং কালচারড। ওখানে গেলে রণিতার কোনোরকম অসুবিধা হবে না, বরং সে যেভাবে নিজের কেরিয়ার গড়ে তুলতে চায় তার পুরোপুরি সুযোগ পেয়ে যাবে। তবু নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আর ছোট খুকির ব্যাপারটা আমি জানি। ছোট খুকি আমার কাছে কিছু গোপন করে নি।
অমিতেশের মুখে লালচে একটু আভা ফুটে ওঠে। লাজুক হেসে সে ইন্দ্রনাথের দিকে তাকায়।
ইন্দ্রনাথ বলেন, ছোট খুকি যে ফিল্মটাকেই কেরিয়ার করতে চায়, সেটা কি তোমার মা জানেন?
অমিতেশ বলে, হ্যাঁ, জানে।
এ এমন একটা কাজ যাতে অনেক সময় বাইরে বাইরে থাকতে হয়। বাড়ি থেকে বেরুনো বা ফিরে আসার ঠিক থাকে না। তা ছাড়া আউটডোরে শুটিং থাকলে দশ পনের দিন কি তারও বেশি বাড়িতে আসাই হল না। এ সব কি তোমার মা আর আত্মীয়স্বজনরা মেনে নেবেন?
অমিতেশ জানায়, রণিতা মাঝে মাঝেই তাদের বাড়ি যায়। তার কাজকর্মের পদ্ধতি মায়ের অজানা নয়। মা একেবারেই পুরনো ধ্যানধারণাকে প্রশ্রয় দেন না। তিনি আধুনিক, সংস্কারমুক্ত, ঝকঝকে মানুষ। মেয়েরা নানা ব্যাপারে পুরুষদের সমকক্ষ হয়ে উঠছে, তাদের পাশাপাশি এমন সব দুঃসাহস এবং পরিশ্রমের কাজ করছে যা কুড়ি পঁচিশ বছর আগে ভাবাও যেত না। এদের সম্বন্ধে মায়ের খুব শ্রদ্ধা। মেয়েরা ঘরের কোণে ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকবে, এটা তিনি একেবারেই চান না। তারা কারো স্ত্রী, কারো মা, কারো পুত্রবধূ তো হবেই, সেই সঙ্গে নিজেদের আলাদা আলাদা আইডেনটিটি গড়ে তুলুক, সোসাইটিতে তাদের নিজস্ব পরিচিতি হোক–এর ওপর মা খুব জোর দেন।
অমিতেশ বলে, রণিতা যখনই আমাদের বাড়ি যায়, মা ওকে কাছে বসিয়ে ও কী করছে, ফিউচার পরিকল্পনা কী, সব জিজ্ঞেস করে। ফিল্মের ব্যাপারে মায়ের ভীষণ উৎসাহ। মা মনে করে এর চেয়ে পাওয়ারফুল মিডিয়াম এখন আর কিছু নেই। সেলুলয়েডে অনেক বড় বড় কাজ করা যায় যা কিনা সোসাইটিকে আগাগোড়া নাড়িয়ে দিতে পারে।
ঠিকই বলেছেন।
মায়ের যেরকম ইন্টারেস্ট, শুরীরটা ভাল থাকলে হয়ত রণিতার সঙ্গে ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়ত।
ইন্দ্রনাথ হাসেন। খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কফিতে চুমুক দিয়ে বলেন, এবার তোমার কথা বল–
একটু থতমত খেয়ে যায় অমিতেশ। বলে, আমার কী কথা?
তুমি কি জানালিজমেই স্টিক করবে?
হ্যাঁ, প্রিন্ট মিডিয়া আমি ছাড়তে চাই না।
অভিও-ভিসুয়াল মিডিয়ার সঙ্গে তোমরা পেরে উঠবে?
নিশ্চয়ই পারব। টেলিভিসন অনস্লট শুরু হয়ে গেছে, নতুন নতুন চ্যানেল ওপেন করা হচ্ছে, তার জন্য একটা খবরের কাগজও কি বন্ধ হয়েছে? উলটে সারা দেশে নতুন নতুন কাগজ বেরুচ্ছে। অডিও-ভিসুয়াল মিডিয়ার দাপট যতই হোক না, প্রিন্ট মিডিয়াকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। মানুষের পড়ার হ্যাবিট চিরকালই থাকবে।
কেরিয়ার হিসেবে জার্নালিজম কি খুব লুক্রেটিভ?
আমার তো সেই রকমই ধারণা।
একজন আই এ এস, আই পি এস-এর মতো?
যদি আর্থিক দিক থেকে বলেন তা হলে বলব তার চেয়েও বেশি লুক্রেটিভ এবং গ্ল্যামারাস।
যেমন?
একজন ভাল জার্নালিস্ট বিশ পঁচিশ ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত স্যালারি পেতে পারে। ইংলিশ ডেইলিগুলো রিজিওন্যাল লাংগুয়েজ ডেইলির চেয়ে অনেক বেশি পে করতে পারে, কেননা সারা দেশ জুড়ে ওগুলোর মার্কেট। কোনো কোনোটার তো বিদেশেও প্রচুর ডিম্যান্ড রয়েছে। আপনি শুনলে অবাক হবেন, রিসেন্টলি আমার এক বন্ধু দিল্লির একটা কাগজে চল্লিশ হাজার টাকা মান্থলি স্যালারির অফার পেয়েছে।
খবরের কাগজ যে এতটা এগিয়েছে, ইন্দ্রনাথের ধারণা ছিল না। সত্যিই তিনি অবাক হয়ে যান।
অমিতেশ বলে, তা ছাড়া কোনো জানালিস্ট সেনসেসানাল বা সিরিয়াস কিছু লিখলে রাতারাতি তার নাম ছড়িয়ে যায়। একজন আই এ এস বা আই পি এস সারা জীবন চেষ্টা করলেও সেরকম ফেমাস হতে পারবে না। একে আপনি লুক্রেটিভ বা গ্ল্যামারাস বলবেন না?
আস্তে মাথা নাড়েন ইন্দ্রনাথ।
অমিতেশ থামে নি, আই এ এস, আই পি এস-এর মতো ছেলেমেয়েরা আজকাল জানালিজমে আসছে। একটু খোঁজ করলে জানতে পারবেন কোনো ফাস্ট ক্লাস ডেইলিতে ফার্স্ট ক্লাস না থাকলে আজকাল কাজ পাওয়া যায় না।
