রণিতা একটু হাসে।
অমলকুমার বলেন, আই অ্যাম নট আ পিউরিটান। আমার কোনো শুচিবাই নেই। নয়নতারা ছিল সেক্স বম্ব। এমন ভোলাপচুয়াস উইম্যান আমার জীবনে আর কখনও দেখিনি। এর জন্যে মানুষ সর্বস্ব বাজি ধরতে পারে। আমিও ধরেছিলাম। কিন্তু আমার একজন রাইভাল ছিল–অ্যানাদার ম্যাটিনি আইডল চিরঞ্জীব। সেই সময়ের কাগজপত্র যদি নাড়াচাড়া কর দেখতে পাবে নয়নতারার জন্য আমরা ডুয়েল লড়েছিলাম। আমি সিরিয়াসলি উডেড হয়েছি। নয়নতারার মতো একটি নারীর জন্যে প্রাণ দিয়েও সুখ। এক হিরোইনকে নিয়ে দুই হিয়োর পিস্তল-যুদ্ধ হয়েছে। তার ফলে সারা দেশ জুড়ে কী ধরনের সেনসেসন হতে পারে, নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছ।
রণিতা মাথা হেলিয়ে বলে, তা পারছি। তারপর কী হল?
ঠোঁট টিপে, চোখ আধাআধি বুজে, মুখে ফিচেল হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে অমলকুমার বলেন, অশ্বডিম্ব, কিছুই হল না। পুলিশ ভয় দেখালে নয়নতারার আশা ছেড়ে দিয়ে চিরঞ্জীব আর আমি যদি নিজেদের মধ্যে আপস করে না নিই, কেসটা কোর্ট পর্যন্ত গড়াবে। দুজনেরই জেল-টেল হয়ে যেতে পারে। সুনাম তো যথেষ্টই নষ্ট হয়েছে, ভবিষ্যৎ ও নষ্ট হয়ে যাবে। জেলফেরত দাগী লোকেদের সোসাইটিতে জায়গা নেই। সুড় সুড় করে দুজনে যে যার ফ্যামিলির খাঁচায় ঢুকে পড়লাম। মাঝখান থেকে নয়নতারার সঙ্গে ছবি করা বন্ধ হয়ে গেল। সে অন্য হিরোর সঙ্গে কাজ করতে লাগল।
এরপর নয়নতারার সঙ্গে আর দেখা হয় নি?
হয়েছে কয়েক বার। কিন্তু সে কথা বলে নি।
একটু চুপচাপ।
তারপর রণিতা জিজ্ঞেস করে, আপনি যা বললেন তা কি আমার ডকু ফিচারে রাখতে পারি?
অমলকুমার বলেন, সবটা। একটা কমা, সেমিকোলনও বাদ দেবে না। আজকের জেনারেশন জানুক এক সময় আমার মধ্যেও বারুদ ছিল।
মণিময়ের কাছ থেকে ঠিকানা জোগাড় করে এর মধ্যে রণিতা আর অমিতেশ টালিগঞ্জে কুঘাটের কাছে নয়নতারার শ্বশুরবাড়িতেও গিয়েছিল কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
একটি লোক– পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স, থলথলে ভারি চেহারা, নাকের নিচে চৌকো গোঁফ, চোয়াড়ে মুখ, চোখে চতুর চাউনি–দরজা খুলে জিজ্ঞেস করেছিল, কাকে চান?
মণিময় জানিয়ে দিয়েছিলেন, নয়নতারার শ্বশুর এবং স্বামী বেঁচে নেই। তাঁর এক দেওর, নাম অবিনাশ, এখন বাড়ির কর্তা। রণিতারা যেন তার সঙ্গে দেখা করে, তবে লোকটা খুব সুবিধার নয়।
রণিতা বলে, অবিনাশবাবুর সঙ্গে দেখা করব।
আমিই অবিনাশ। কী দরকার?
ফেমাস অ্যাকট্রেস নয়নতারা দেবী তো আপনাদের আত্মীয়। ওঁর সম্বন্ধে আপনার কাছে কিছু প্রশ্ন আছে।
অবিনাশের জোড়া লোমশ ভুরু কুঁকড়ে যায়। কর্কশ গলায় সে বলে, ওই বেশ্যার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আপনারা যেতে পারেন। বলে দড়াম করে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়।
এমন অভদ্র, ইতর লোক আগে আর কখনও দেখেনি রণিতারা। ছবির জন্য মেটিরিয়াল জোগাড় করতে এসে ভালই অভিজ্ঞতা হল।
দাঁতে দাঁত চেপে অমিতেশ শুধু বলে, স্কাউন্ড্রেল।
.
০৯.
ডকু-ফিচারের কাজ কতটা এগুচ্ছে, সারা দিনে কার কার সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে, তার খুঁটিনাটি বিবরণ রোজ রাতে খাবার টেবলে বসে রণিতাকে দিতে হয়। সব শোনার পর নানারকম পরামর্শ দেন ইন্দ্রনাথ। আজ খাওয়ার পর দোতলায় উঠে সোজা রণিতার সঙ্গে তার ঘরে চলে এলেন তিনি। বলেন, তোর সঙ্গে একটা দরকারি কথা আছে।
রণিতা জিজ্ঞেস করে, কী কথা বাবা?
সেই ছেলেটিকে কবে আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবি?
ইন্দ্রনাথ যে অমিতেশের কথা বলছেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না রণিতার। তার মতো ঝকঝকে, স্মার্ট মেয়েও বেশ একটু লজ্জা পায়, তার মুখে পলকের জন্য রক্তাভা ফুটে ওঠে। মুখ নামিয়ে নিচু গলায় বলে, তুমি যেদিন বলবে।
একটু চিন্তা করে ইন্দ্রনাথ বলেন, ধর, পরশু দিন।
আচ্ছা।
একটু চুপচাপ।
তারপর রণিতা জিজ্ঞেস করে, অমিতেশকে বাড়িতে নিয়ে আসব?
ইন্দ্রনাথ চকিত হয়ে ওঠেন, না না, বাড়িতে না। তোর মা আছে এখানে, মুশকিল হয়ে যাবে।
তবে?
কোনো ভাল রেস্তোরাঁয়। ধর, আমি ছেলেটিকে চা খেতে ইনভাইট করছি।
বাবার মুখের দিকে তাকায় রণিতা। মজার গলায় বলে, তুমি খুব মডার্ন হয়ে গেছ বাবা।
মানে?
নইলে কেউ রেস্তোরাঁয় ইনভাইট করে!
ইন্দ্রনাথ সামান্য হেসে বলেন, বাড়িতে আনার উপায় নেই। তোর কাকা কি পিসিদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। হাজার রকমের কৌতূহলের। জবাব দিতে হবে। পার্কে কি ভিক্টোরিয়ার বাগানে নিয়েও ছেলেছোকরাদের মতো বসতে পারি না। তাই–
বুঝেছি–রণিতাও হেসে ফেলে। পরক্ষণে তাকে বেশ চিঙ্গিত দেখায়। বলে, আচ্ছা বাবা
কী রে?
তুমি বলেছিলে আমাদের রিলেটিভদের সব জানিয়ে অমিতেশের সঙ্গে কথা বলবে–
হাঁ, বলেছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, অমিতেশের সঙ্গে আগেই কথাটা বলি। একটা কাজ এগিয়ে রাখি।
পরশু কোন রেস্তোরাঁয় ওকে যেতে বলব?
তোরাই ঠিক করে আমাকে বলিস। আমি চলে যাব। বিকেলের দিকে হলে ভাল হয়।
ঠিক আছে।
একটু চুপচাপ।
তারপর রণিতা বলে, একটা কথা জিজ্ঞেস করব বাবা?
ইন্দ্রনাথ বলেন, কর না–
তুমি বোধ হয় দেখে নিতে চাইছ আমার সিলেকসান ঠিক হয়েছে কিনা–
ইন্দ্রনাথ উত্তর দেন না, শুধু একটু হাসেন।
.
এক দিন পর সেন্ট্রাল ক্যালকাটার একটা ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন রেস্তোরাঁর এক কোণে অমিতেশের সঙ্গে ইন্দ্রনাথের আলাপ করিয়ে দেবার জন্য একটা টেবল বুক করে রেখেছিল রণিতা। পাঁচটায় ইন্দ্রনাথের আসার কথা। তার অন্তত মিনিট পনের আগে এসে অমিতেশ আর সে বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। রণিতা খুব ভাল করেই জানে ইন্দ্রনাথ খুবই সময়ানুবর্তী মানুষ, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে তাঁর দৈনন্দিন রুটিন ঠিক করা থাকে, সময়ের এতটুকু এদিক ওদিক হলে তিনি বিরক্ত হন।
