কেষ্টপদ বলে, না না। রমেনবাবু আপনাদের পাঠিয়েছেন। যতগুলো ইচ্ছা নিতে পারেন।
রণিতা বলে, এর জন্যে আমরা কিছু টাকা দেব। আপনি কিরকম আশা করেন?
কেষ্টপদ একমুখ হাসে। বলে, আবার টাকা কেন? তা আপনাদের যখন ইচ্ছে যা ভাল মনে করেন দেবেন।
কতটা কী দেওয়া যায়, আমরা একটু ভাবি। তারপর পেমেন্টের ব্যবস্থা করব।
.
০৮.
আরো দশ দিন পরও অবস্থার কোনোরম হেরফের নেই। পুলিশ এখনও অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু নয়নতারাকে পাওয়া যায়নি। তবে রণজয় আগের মতোই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁকে খুঁজে বার করবেনই।
দিনকাল-এর বক্স নাম্বারে দ্বিতীয় নোটিশটাও এর ভেতর বেরিয়ে গেছে। ফলে চিঠির বান ডেকেছে। রোজ পঞ্চাশ ষাটটা করে চিঠি আসছে। তবে প্রয়োজনীয় তথ্য তার কোনোটাতেই নেই। অবশ্য একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের স্ত্রী আর একজন বড় কনট্রাক্টর-কাম-প্রামোটারের স্ত্রী দুটো চমকপ্রদ চিঠি লিখেছেন। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের স্ত্রী মল্লিকা আগরওয়ালের বক্তব্য, নয়নতারার একটা হিপনোটিক পাওয়ার আছে, সেকালের মোহিনীদের মতো সে ছলাকলা তুকতাক জানে। সে এমনই বশীকরণ করেছিল যে মল্লিকার স্বামী কিষেণলাল আগরওয়াল একেবারে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, তাকে পাবার জন্য তিনি যাবতীয় প্রোপার্টি আর কোম্পানির শেয়ার তার নামে লিখে দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। ইন্ডাস্ট্রি সার্কেলে এই নিয়ে প্রচণ্ড হই-চই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের কাছে মুখ দেখানো যাচ্ছিল না। নিরুপায় মল্লিকা তখন পুলিশ কমিশনার, হোম সেক্রেটারি আর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা বুঝিয়ে সুঝিয়ে, কখনও ভয় দেখিয়ে উদ্ভ্রান্ত কিষেণলালের মোহ কাটিয়ে দেন। আগরওয়াল বংশ একটা বড় রকমের কেলেঙ্কারি থেকে রক্ষা পায়। তাঁদের বিষয় সম্পত্তিও হাতছাড়া হয় না। এরপর থেকে মল্লিকা তাঁর স্বামীকে চোখে চোখে রাখছেন, এক পলকের জন্য হাতের মুঠো থেকে বেরুতে দেন না।
কনট্রাক্টর-কাম-পোমোটারের স্ত্রী রাজেশ্বরী তরফদার জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী উমাপতি তরফদারও নয়নতারার জন্য ঘাড় গুঁজে পড়েছিলেন। তিনি কিন্তু পুলিশ কমিশনার বা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ছোটাছুটি করেন নি, কোমরে আঁচল জড়িয়ে সোজা নয়নতারার বাড়িতে চড়াও হয়েছিলেন, আক্ষরিক অর্থেই নাকি জুতা পেটা করে তাঁর বিষ ঝেড়ে দিয়েছিলেন। স্বামীকেও রেয়াত করেন নি, নিজেদের পাড়ায় তুমুল চেঁচামেচি করে লোকজন জড়ো করে ফেলেছিলেন। তারপর উমাপতির কুকীর্তি সাতকাহন করে তাদের জানিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর উমাপতি এক মাস বাড়ির বার হতে পারেন নি। রাজেশ্বরীর আগুনখাকির মত চেহারা দেখে নয়নতারা আর উমাপতি নাকি একেবারে মিইয়ে গিয়েছিলেন।
এর মধ্যে সাতজন পরিচালকের সঙ্গে দেখা করেছে রণিতা আর অমিতেশ। তাঁদের কাছ থেকেও বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। থিয়েটারের রমেন লাহা বা সিনেমার প্রোডিউসাররা যা বলেছেন হুবহু তাই জানিয়েছেন ওঁরা।
ফিল্মের যে দুই হিরো একদা নয়নতারার জন্যে ডুয়েল লড়েছিলেন তাঁরা হলেন চিরঞ্জীব এবং অমলকুমার। দুজনেই একসময় ছিলেন ম্যাটিনি আইডল। ওঁদের সঙ্গেও দেখা করেছে রণিতারা।
চিরঞ্জীব আর অমলকুমার, দুজনেরই বয়স সত্তরের কাছাকাছি। দুটো ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের পর চিরঞ্জীব অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন। স্ত্রী মারা গেছেন ক বছর আগে। এখন দুই ছেলে, দুই পুত্রবধু, নাতি-নাতনি আর পুরনো সোনালি দিনের স্মৃতি নিয়ে তাঁর সম্পূর্ণ অবসরের জীবন। বই পড়ে, টিভি দেখে, নাতি নাতনিদের সঙ্গে খুনসুটি করে সময় কেটে যায়।
অমলকুমার অবশ্য অভিনয় ছাড়েন নি। ছোট্ট ফ্যামিলি তাঁদের। তিনি আর স্ত্রী। একমাত্র ছেলে কানাডার ন্যাশনালিটি নিয়েছে, এদেশে ফেরার আর সম্ভাবনা নেই। সওরেও পুরোপুরি সুস্থ আছেন, মজবুত স্বাস্থ্য, একটা দাঁতও পড়েনি। চুল অবশ্য সাদা হয়ে গেছে। টাকা-পয়সার অভাব নেই কিন্তু সময় তো কাটাতে হবে, তাই অভিনয়টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বয়সে সিনেমার নায়ক হওয়া যায় না। নায়কের কাকা, বাবা ইত্যাদি রোল নিয়েই তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
চিরঞ্জীবের সঙ্গে দেখা করে রণিতারা নয়নতারার প্রসঙ্গ তুলতে তিনি তাঁর এক কালের নায়িকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কিন্তু অমলকুমারের সঙ্গে সেই পিস্তলের লড়াই সম্পর্কে জানতে চাইলে একেবারে হকচকিয়ে যান। বিব্রতভাবে বলেন, পাস্ট ইজ পাস্ট। প্লিজ ও ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করো না। ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে শেষ জীবনে শান্তিতে আছি। সবাই আমাকে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে। পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর আগে কী হয়েছিল, কী করেছিলাম, সে সব এতদিন বাদে খুঁচিয়ে বার করে পারিবারিক শান্তি নষ্ট করে কী লাভ?
কাজেই আর কোনো প্রশ্ন করেনি রণিতা।
অমলকুমারের জীবনদর্শন একেবারে উলটো। তাঁর কাছে গিয়ে নয়নতারার কথা তুলতে প্রায় লাফিয়ে ওঠেন। বলেন, মিডিয়া শুধু নায়ক নায়িকাদের নিয়ে মাতামাতি করে। আমরা ক্যারেক্টার আর্টিস্টরা তাদের চোখে ফালতু। লোকে আমাকে প্রায় ভুলেই গেছে কিন্তু আমিও একদিন হিরো ছিলাম রে বাবা-মাকে বলে ম্যাটিনি আইডল। এই সুযোগে একটা জব্বর পাবলিসিটি পেয়ে যাব, না কী বল?
