রমেনবাবু প্রায় পঞ্চাশ বছর থিয়েটারে ছিলেন, তাঁর হাড়ে-মজ্জায় নাটক। পুরনো আমলের তিনকড়ি দাসী, বিনোদিনী বা তারাসুন্দরীদের কথা বলতে পারবেন না, তবে তাঁর দেখা অভিনেত্রীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন নয়নতারা। এর মতো শিল্পী গত অর্ধ শতাব্দীতে আর দেখা যায়নি।
মুন লাইট-এ যোগ দেবার পরও ফিল্ম ছাড়েননি নয়নতারা। এই সময়টা তাঁর জীবনের পিক পিরিয়ড। একদিকে যেমন অজস্র টাকা, খ্যাতি আর । জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে তাঁকে ঘিরে তখন প্রচুর কুৎসা। তা গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের মক্ষীরানীদের নিয়ে এসব তো বটেই। তবে সত্যমিথ্যা জানেন না রমেনবাবু।
বোঝা যাচ্ছিল, মেয়ের বয়সী রণিতাকে নয়নতারার স্ক্যাশাল নিয়ে কিছু বলতে তাঁর রুচিতে বাধছিল। প্রসঙ্গটা তিনি দ্রুত থামিয়ে দেন।
রণিতা এ ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন করে না। বলে, আচ্ছা, এতগুলো নাটকে যে নয়নতারা অভিনয় করেছেন তার কোন ভিডিও বা ফিল্ম করে কি রাখা হয়েছে?
চোখ কুঁচকে মনে করতে চেষ্টা করেন রমেনবাবু। তারপর বলেন, কেষ্টপদ ঘোষাল বলে একজন নয়নতারার দুটো নাটকের ভিডিও করেছিল বছর দশেক আগে।
সে দুটো কি এখনও ঠিক আছে? নষ্ট হয়ে যায়নি?
ও প্রতি বছর ক্যাসেট পালটে পালটে প্রিজার্ভ করে যাচ্ছিল। লাস্ট ইয়ারে কি তার আগের ইয়ারে প্রোজেকসান করে এই ঘরে আমাকে দেখিয়েও গিয়েছিল। তবে সেগুলোর হাল এখন কী দাঁড়িয়েছে, বলতে পারব না।
কেষ্টপদবাবুর ঠিকানা পাওয়া যেতে পারে?
নিশ্চয়ই। ওর ফোনও আছে। বলে পড়ার টেবলের ওপর একটা লাল রঙের ডায়েরির দিকে আঙুল বাড়িয়ে দেন রমেনবাবু, একটু কষ্ট করে যদি ওটা আনেন–
অমিতেশ ডায়েরিটা নিয়ে আসে। সেটার পাতা উলটে উলটে একটা নম্বর বার করে অমিতেশকে বলেন, এটা ধরে দয়া করে ফোনটা আমাকে দিন।
একবার ডায়াল করেই কেষ্টপদকে পাওয়া গেল। রমেনবাবু তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলেন, ক্যাসেট দুটো ভালই আছে। রণিতাদের জিজ্ঞেস করলেন, কবে আপনারা দেখতে চান?
রণিতা বলে, কেষ্টপদবাবুর অসুবিধে না হলে আজই দেখতে পারি।
কখন দেখবেন?
উনি রাজি হলে আপনার এখান থেকে বেরিয়ে সোজা ওঁর কাছে চলে যাব।
কেষ্টপদকে সেই কথাই বলা হল। সেই সঙ্গে নাটক দেখার উদ্দেশ্য ও। কেষ্টপদ জানাল, রণিতাদের জন্য অপেক্ষা করবে। যতক্ষণ না তারা যাচ্ছে, বাড়ি থেকে বেরুবে না।
রমেনবাবু ফোন নামিয়ে রেখে বলেন, আমার কাছে আর কিছু জানার আছে?
এক্ষুনি মনে পড়ছে না। তবে একটা ব্যাপারে আমাদের আরেক দিন আসতে হবে।
যখন ইচ্ছা ফোন করে চলে আসবেন। কিন্তু যে ব্যাপারের কথা বললেন সেটা কী?
আমার ডকু-ফিচারের শুটিং যখন শুরু হবে তখন নয়নতারার স্টেজ কেরিয়ার সম্পর্কে আপনার একটা ইন্টারভিউ নেব। ওটা ছবিতে থাকবে।
রমেন লাহা মৃদু হাসেন। বলেন, আবার আমাকে কেন?
রণিতা বলে, আপনাকে বাদ দিয়ে নয়নতারার লাইফ ইনকমপ্লিট। আমার ছবিতে আপনাকে থাকতেই হবে।
রমেন আর কিছু বলেন না।
রণিতা এবার বলে, আট বছর নয়নতারা নিরুদ্দেশ হয়ে আছেন। ওঁকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে, আপনার ধারণা আছে?
রমেন লাহা অস্তে মাথা নাড়েন, না, একেবারেই না। আমি তো শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে আছি দুবছর। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ একরকম নেই বললেই হয়। নয়নতারার খবর কিভাবে পাব? একটু থেমে বলেন, ওঁর মতো আর্টিস্ট অভিনয় ছেড়ে দিলেন, এটা আমাদের মস্ত বড় ক্ষতি। তাঁর মুখে বিষাদের ছায়া পড়ে।
আরো কিছুক্ষণ পর কেষ্টপদ ঘোষালের ঠিকানা নিয়ে অমিতেশ আর রণিতা বিদায় নেয়।
.
সুবিমল আগেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ওঁদের ড্রাইভার জগমোহন বেলেঘাটার এক গলিতে কেষ্টপদ ঘোষালদের শ্যাওলা-ধরা, পুরনো, ভাঙাচোরা একতলা বাড়ির সামনে রণিতাদের নামিয়ে দিয়ে ফিরে যায়।
সামনের শান-ধাঁধানো রোয়াকে তাদের জন্য বসে ছিলেন কেষ্টপদ। গায়ের রং বেশ কালো। মাঝারি হাইটের তেউড়ে-যাওয়া, ক্ষয়টে চেহারা ভদ্রলোকের। বিখ্যাত থিয়েটার হল-এর মালিক এবং প্রোডিউসার রমেন লাহা ফোন করে রণিতাদের কথা বলেছেন, তাই যথেষ্ট খাতির করে একটা ঘরে এনে ওদের বসান। কেষ্টপদ।
কথায় কথায় জানা যায়, কেষ্টপদ ঘোষাল নাটক এবং ফিল্মের একজন স্টিল ফোটোগ্রাফার। নানা ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজে ফোটো বিক্রি করাটাই তাঁর জীবিকা। তবে কবছর ধরে নানা অনুষ্ঠনের ভিডিও ক্যাসেটও করছেন। এতে রোজগারটা অনেক বেড়েছে। কেষ্টপদ বেশ দূরদর্শী। তাঁর মনে হয়েছিল নয়নতারার নাট্যাভিনয়ের ক্যাসেট করে রাখা দরকার, ভবিষ্যতে এর চাহিদা হবে বিপুল, দামও পাওয়া যাবে প্রচুর। তবে নানা কারণে দুটোর বেশি ক্যাসেট করা যায়নি। আর সে দুটো সম্ভব হয়েছিল রমেন লাহার অনুগ্রহে। সেজন্য তিনি কোনো অনুরোধ করলে না বলতে পারেন না কেষ্টপদ।
এরপর দুই নাটকের ক্যাসেট দেখানো হয়। কী বিরাট ক্ষমতাময়ী অভিনেত্রী যে নয়নতারা সেটা ক্যাসেট দেখতে দেখতে টের পাচ্ছিল রণিতারা। স্ক্রিন পার্সোনালিটির মতো তাঁর স্টেজ পার্সোনালিটিও এক কথায় দুর্দান্ত।
নাটক দেখা শেষ হল বিকেল পাঁচটায়। এর ভেতর কোন কোন অংশ ডকু-ফিচারে কাজে লাগাবে, টুকে নিয়েছে রণিতা। সে বলে, আপনার ক্যাসেট থেকে দুচারটে ঘোট ক্লিপিং আমাদের ছবিতে ব্যবহার করতে চাই। আপনার আপত্তি নেই তো?
