রণিতা আর অমিতেশ নমস্কার জানিয়ে বসে পড়ে। রণিতা বলে, আমরা অনেক ছোট। তুমি করে বলুন।
রমেন একটু হাসেন শুধু। তারপর বলেন, অপরাধ ক্ষমা করবেন। কোমর থেকে নিচের দিকের পুরোটাই আথারাইটিসে পঙ্গু হয়ে আছে। বসতে পারি না, শুয়ে শুয়েই আমাকে কথা বলতে হবে।
বোঝা যায় যে কোনো বয়সের অনাত্মীয়দের আপনি করে বলাটা রমেন লাহার অভ্যাস। আপত্তি করলেও শুনবেন না। রণিতা আর অমিতেশ ব্যস্তভাবে বলে, না না, আপনাকে উঠে বসতে হবে না। শুয়ে শুয়ে কথা বলুন, আমরা কিছু মনে করব না।
একটি বয়স্ক কাজের মেয়ে বড় সাইজের সন্দেশ, রাজভোগ, কাজু বাদাম আর কফি দিয়ে যায়। খুব সম্ভব আগেই বলা ছিল।
দারুণ বনেদি শিষ্টাচার বাবা এবং ছেলের। বিনীতভাবে বলেন, খান।
কয়েকটা করে কাজু, একটা করে সন্দেশ আর কফির কাপ তুলে নেয় রণিতারা। রমেন বা সুবিমল আরও মিষ্টি-টিষ্টি নেবার জন্য জোর করেন না। তাঁরা জানেন পীড়াপীড়ি করাটা অশিষ্টতা।
রমেন রণিতাকে বলেন, আমার হাল তো দেখছেন। আজকাল বাইরের লোকজনের সঙ্গে দেখা করি না, আসলে শরীরটা সব গোলমাল করে দিয়েছে কিন্তু আপনার বাবা মানে ইন্দ্রনাথবাবু ছেলের মারফত অনুরোধ করেছেন আপনাকে খানিকটা সময় দিতে হবে। তাঁর হুকুম অমান্য করার সাধ্য আমার নেই।
অভিভূত রণিতা বলে, আপনাকে কী বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাব।
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন রমেন, কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন নেই।ইন্দ্রনাথবাবুঅতি সজ্জন, পণ্ডিত মানুষ। তাঁকে আমরা শ্রদ্ধা করি। যতদিন সুস্থ ছিলাম প্রায়ই মুনলাইট এ থিয়েটার দেখতে আসেতেন। নাটকের দুর্দান্ত সমঝদার। ছেলে যখন ওঁর কথা বলল আমি তক্ষুনি রাজি হয়ে গেলাম। একটু চুপ করে থেকে ফের শুরু করেন, সুবিমল বলছিল, আপনারা আমার কাছে নয়নতারা সম্পর্কে জানতে চান।
রণিতা বলে, আজ্ঞে হ্যাঁ।
সুবিমল দাঁড়িয়ে ছিলেন, বললেন, আপনারা বাবার সঙ্গে কথা বলুন। আমার জরুরি একটা কাজ আছে। বেরুতে হবে।
রমেন বলেন, ড্রাইভারদের কাউকে বলে দিও, কথা হয়ে গেলে ওঁরা যেখানে যেতে চান সেখানে যেন পৌঁছে দেয়।
এটাই হয়তো এ বাড়ির নিয়ম, তাই রণিতারা আপত্তি করে না। সুবিমল বলেন, জগমোহনকে বলে যাচ্ছি।
সুবিমল চলে গেলে রমেন রণিতাদের দিকে চোখ ফেরান, কী জানতে চান বলুন–
রণিতা ডকু-ফিচারটা সম্পর্কে সব জানিয়ে বলে, নয়নতারা যে একুশটা নাটকে অভিনয় করেছিলেন তার পনেরো ষোলটা তো আপনারা প্রোডিউস করেছেন?
শুধরে দিয়ে রমেন বলেন, সতেরোটা।
নয়নতারা কিভাবে স্টেজে এলেন, থিয়েটারে তাঁর পারফরমেন্স কেমন, কিরকম ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবন, এ সব সম্পর্কে আপনার যা যা মনে আছে বলুন। কিছু বাদ দেবেন না।
কিছুক্ষণ চুপ করে ভেবে নিলেন রমেন লাহা। তারপর শুরু করলেন। তাঁর বলার ভঙ্গিটি চমৎকার, কোনোরকম তাড়াহুড়ো নেই। ধীরে ধীরে নয়নতারার অন্য এক ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগল।
নয়নতারা তাঁর অভিনয় জীবন আরম্ভ করেছিলেন ফিল্ম দিয়ে। প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশটা ছবিতে নায়িকার রোল করার পর তাঁকে স্টেজে নিয়ে আসেন রমেন লাহা। নয়নতারার বিপুল জনপ্রিয়তা আর গ্ল্যামারকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি। সেদিক থেকে তাঁর পরিকল্পনা শতকরা একশ ভাগ সফল।
নয়নতারা স্টেজে যোগ দেবার আগে বেশ কয়েক বছর থিয়েটারের হাল খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে মুনলাইট এর অবস্থা কহতব্য নয়। পর পর নাটক মার খাচ্ছিল। টায়টোয় প্রোডাকশনের খরচটাও উঠত কিনা সন্দেহ। আসলে দর্শকরা নাটক সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। নয়নতারা স্টেজে আসার সঙ্গে সঙ্গে থিয়েটারে একটা চনমনে ভাব দেখা দিল। এর সুফল শুধু রমেনবাবুরাই নন, অন্য থিয়েটার কোম্পানিগুলোও পেল। ঝাঁকে ঝাঁকে দর্শক থিয়েটার পাড়ার দিকে আসতে লাগল। মুনলাইট-এর যে সতেরোটা নাটকে নয়নতারা অভিনয় করেছেন তার প্রত্যেকটা রেকর্ড ব্যবসা করেছে। পরে অবশ্য এপিক থিয়েটার অনেক বেশি টাকা দিয়ে তাঁকে ভাঙিয়ে নিয়ে যায়। ওদের চারটে নাটকও চুটিয়ে ব্যবসা করেছে।
ফিল্ম থেকে স্টেজে এসে গোড়ার দিকে একটু অসুবিধা হয়েছিল নয়নতারার। কেননা থিয়েটার অ্যাক্টিংটা একেবারে ভিন্ন ধরনের। ফিল্মে ভুলচুক হলে শুধরে নেওয়া যায় কিন্তু স্টেজে তার সুযোগ নেই। উন্মুখ দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে একবারেই যা করার করতে হবে। প্রথম তিনটে শো-এ সংলাপ ভুলে গিয়েছিলেন নয়নতারা, প্রম্পটার উইংসের পাশ থেকে খেই ধরিয়ে দেবার পর অবশ্য তাড়াহুড়ো করে সেগুলো বলেছেন কিন্তু অভিব্যক্তিতে গোলমাল হয়ে গিয়েছিল। তিনটে শো-এর পর আর কোনো ত্রুটি ছিল না। অসীম একাগ্রতায় স্টেজ অ্যাক্টিংটা চমৎকার রপ্ত করে নিয়েছিলেন নয়নতারা। অভিনয় বলতে তাঁর কাছে শুধু পরিচালকের নির্দেশমতো নিখুঁতভাবে হাত-পা নাড়া বা সংলাপ বলে যাওয়া নয়, তার সঙ্গে তিনি মেশাতেন আশ্চর্য এক ব্যক্তিত্ব আর সৃজনশীলতা যা শুধু একজন মহান শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।
কাজের প্রতি নয়নতারার নিষ্ঠা ছিল অভাবনীয়। যে চরিত্রেই তিনি অভিনয় করতেন, তাতে একেবারে মগ্ন হয়ে যেতেন। সেখানে এতটুকু ফাঁকি নেই। ফিল্ম প্রোডিউসারদের মতো বমেনবাবুও জানালেন, নয়নতারা ছিলেন অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড আর পাংচুয়াল। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সময় মিলিয়ে তিনি শো টাইমের আগে হল-এ আসতেন, নিজের সাজঘরে বসে মেক-আপ নিতেন। শো এর পর এক মিনিটও নষ্ট না করে বাড়ি ফিরে যেতেন। দশ বছরে সতেরোটা নাটক করেছেন কিন্তু নেহাত অসুস্থ হয়ে না পড়লে সময়ের এতটুকু হেরফের কখনও হয়নি।
