নয়নতারার ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল? প্রায় সব প্রোডিউসারই জানিয়েছেন এ নিয়ে তাঁরা কখনও মাথা ঘামান নি, অতএব কোনো মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। দু-একজন বলেছেন, অনেক গোলমাল ছিল। মহিলাকে নিয়ে কত যে স্ক্যাশ্যাল বলে বোঝাতে পারব না। সেজন্য কাজের কিন্তু কোনো ক্ষতি হয়নি। ওঁকে দেখে টাকা লাগিয়েছি। ষোল আনার জায়গায় আঠারো আনা প্রফিট উঠে এসেছে। আমরা বিজনেস করি। আর্টিস্টরা কে কী করল, না করল তা নিয়ে টেনসন বাড়িয়ে আমাদের কী লাভ?
নয়নতারা যে পরিচালক এবং শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি, পরে তাঁদের কাছে যাবে রণিতা।
তবে মুনলাইট থিয়েটারে-এর মালিক রমেন লাহার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা হয়েছে। নয়নতারা যে সব নাটকে অভিনয় করেছেন তার বেশির ভাগেরই প্রযোজক তিনি। তাঁর যথেষ্ট বয়স হয়েছে, এখন আর হল-এ আসেন না, তাঁর ছেলে সুবিমল কবছর ধরে ব্যবসাপত্র দেখছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ইন্দ্রনাথ একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিয়েছেন। আজ সকালে রমেন লাহার নর্থ ক্যালকাটার বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাবে রণিতারা।
হেদুয়া আর স্কটিশ চার্চ কলেজ ডান ধরে রেখে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট ধরে শ্যামবাজারের দিকে আরো খানিকটা এগিয়ে বাঁয়ে একটা মাঝারি রাস্তায় ঢুকে প্রথম দুটো বাড়ি ছেড়ে তিন নম্বরটাই হল লাহা ক্যাসল। সামনে পেছনে ফুলের বাগান। মাঝখানে বিবাট বিরাট থামওলা গোলাপি রঙের প্রকাণ্ড বাড়িটার দিকে তাকালে নাইনটিনথ সেঞ্চুরির বনেদিআনার কথা মনে পড়ে যায়।
সে আমলের পুরনো বড়লোকেরা আর নেই, লুপ্তপ্রায় প্রজাতির মতো তারা নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। বিশাল প্যালেসের মতো তাদের বিরাট বিরাট বাড়িগুলো ভেঙেচুরে এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু রমেন লাহারা তার ব্যতিক্রম। নতুন রং-করা হয়েছে তাঁদের বাড়িটায়, কোথাও এতটুকু ফাটল বা চিড়ের দাগ নেই। সব নিখুঁত, পরিচ্ছন্ন, অটুট। লাহা ক্যাসেলের পেছনে যে নিয়মিত প্রচুর টাকা খরচ করা হয়, দেখামাত্র তা টের পাওয়া যায়। সামনের দিকে বাগানের গা ঘেঁষে নতুন মডেলের ঝকঝকে গোটা চারেক মোটর যেমন রয়েছে তেমনি আছে দুটো ঘোড়ায় টানা ফিটন। ঘোড়া অবশ্য গাড়ির সঙ্গে জোতা নেই, সাদা ধবধবে স্বাস্থ্যবান একজোড়া প্রাণী পাশে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে পা ঠুকছে। বোঝা গেল, লাহারা নতুনের সঙ্গে পুরনো চালও বজায় রাখার পক্ষপাতী।
নটা নাগাদ লাহা ক্যাসেলে পৌঁছে যায় রণিতা আর অমিতেশ। তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সুবিমল। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। টকটকে রং, মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি, বড় বড় চোখ, ভুরু দুটো যেন তুলিতে টানা। পাতলা নাকের নিচে বাহারে গোঁফ। এই সকাল বেলাতেই তিনি একেবারে ফিটফাট। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে নিয়েছেন। পরনে কারুকাজ-করা সাদা পাঞ্জাবি এবং জলচুড়িওলা কুঁচনো ধুতি, পায়ে হরিণের চামড়ার চটি, গা থেকে ভুর ভুর করে দামি সেন্টের গন্ধ উঠে আসছে। পুরনো বইয়ের পাতায় উনিশ শতকের বাবুদের যে ছবি থাকে তাদের একজন যেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতজোড় করে সুবিমল বললেন, আসুন–
তাঁর পেছন পেছন বিশাল অলিন্দ এবং অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে দোতলায় উঠে এল রণিতারা। চলতে চলতে ওদের চোখে পড়ছিল ঘরের দেওয়ালগুলো কম করে ষাট ইঞ্চি চওড়া। শ্বেতপাথরের ফ্লোর, বিশাল বিশাল ঝাড়বাতি, পার্সিয়ান কার্পেট, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সোফা, খাট, টেবল, চেয়ার, অয়েল পেন্টিং, ব্রোঞ্জ আর পাথরের দুষ্প্রাপ্য ভাস্কর্য ইত্যাদি দেখতে দেখতে রণিতার মনে হচ্ছিল সত্যিকারের বড়লোকির সঙ্গে বনেদি চাল মেশালে তার ফলটা কী দাঁড়ায় তা বুঝতে হলে লাহা ক্যাসল-এ একবার আসা উচিত। তাদের বাড়িতেও মেহগনির আসবাব, শ্যান্ডেলিয়ার টিয়ার আছে, কিন্তু এ বাড়ির তুলনায় সে সব কিছুই না। মনে হল, ঝাড়লণ্ঠন, রুপোর ফুলদানি, কার্পেট, স্কালপচার, আসবাব, গালিচা মিলিয়ে কম করে তিরিশ চল্লিশ লাখ টাকার জিনিস আছে লাহা ক্যাসল-এ।
কিছুক্ষণের মধ্যে পাঁচশ স্কোয়ার ফিটের মতো বিশাল একটা ঘরে পৌঁছে যায় রণিতারা। ঘরটা আলমারি, ওয়ার্ডরোব, বুক-র্যাক, লেখাপড়ার জন্য চেয়ার টেবল, ওয়াল-ক্লক, ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। সিলিং থেকে পুরনো আমলের চার ব্লেডওলা চারটে পাখা ঝুলছে। দুই দেওয়ালে দুটো এয়ার কুলার। ঘরের ঠিক মাঝখানে কারুকাজ করা মেহগনির খাট। খাটটা ঘিরে বেশ কটি সোফা আর একটা টিপয়ের ওপর গোটা চারেক রঙিন টেলিফোন। খানিকটা দূরে সুদৃশ্য স্ট্যান্ডে দামি কালার টিভি।
খাটের ওপর তিন ফুট উঁচু গদির ওপর যিনি শুয়ে আছেন তিনি যে রমেন লাহা সেটা বলে না দিলেও চলে। বয়সটা কম আর স্বাস্থ্যটা ভাল হলে অবিকল সুবিমলের জোড়া মনে হত। দেখেই বোঝা যায় রোগে যথেষ্ট কাবু হয়ে পড়েছেন। মুখ শীর্ণ, চামড়া কুঁচকে গেছে, চুলের বেশিটাই সাদা, তবু এই অবস্থাতেও পোশাকে আশাকে নাইনটিনথ সেঞ্চুরির পরিপাটি বাবুটি।
সুবিমল আলাপ করিয়ে দিতে রমেন লাহা হাতজোড় করে বললেন, বসুন মা, আপনিও বসুন বাবা–বলে সোফাগুলো দেখিয়ে দেন। তাঁর কাছে যে দর্শনার্থীরা আসে, ওগুলো যে তাদের জন্য বুঝতে অসুবিধা হয় না।
