মণিময় বলেন, একেবারে প্রথম ছবি থেকেই নয়নতারার সঙ্গে আমার আলাপ। আজকের কথা নয়, সেই নাইনটিন ফিফটিতে একদিন স্টুডিওতে ওর শুটিং দেখতে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম। এমন বিউটি ইন্ডিয়ান স্ক্রিনে আগে আর দেখা গেছে কিনা সন্দেহ। তবে সেই সময় ওর সৌন্দর্যের মধ্যে একটা গ্রাম্য ভাব মেশানো ছিল। উচ্চারণে ছিল পূর্ব বাংলার টান। দু-তিনটে ছবির পর এই দোষটা কাটিয়ে নেয় নয়নতারা, তার চেহারায় আসে সফিস্টিকেশন। এরপর তিনি যা বলে যান তা এইরকম। উচ্চারণ যেমনই হোক, প্রথম ছবিতেই নয়নতারা বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি একজন দুর্ধর্ষ অভিনেত্রী। তাঁর চলা, চোখমুখের অভিব্যক্তি এক কথায় অভাবনীয়। মণিময়ের তখনই মনে হয়েছিল, মেয়েটি অনেক দূর যাবে। অন্য কাগজ কিছু করার আগে তিনি মর্নিং স্টার-এ নয়নতারার পুরো এক পাতা ইন্টারভিউ ছেপেছিলেন। লিখেছিলেন এই অভিনেত্রীটি ভারতীয় দর্শকদের মাতিয়ে দেবে। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল।
মণিময় একটানা কথা বলে কিছুটা হাঁফিয়ে পড়েছেন। আর তাঁকে দিয়ে বকানো ঠিক হবেনা। বিব্রতভাবে রণিতা বলে, আপনাকে অনেক কষ্ট দিলাম। যাবার আগে শুধু একটা প্রশ্নই করব। যদি উত্তর দিতে ইচ্ছে না হয়, দেবেন না।
মণিময় হাসেন, ঠিক আছে, কর।
রণিতা বলে, কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে নয়নতারা সম্পর্কে প্রচুর স্ক্যান্ডালও চোখে পড়ল।
মণিময় বলেন, অত বড় একজন অ্যাকট্রেস, তার ওপর প্যারাগন অফ বিউটি। ওর লাইফে স্ক্যাশ্যাল থাকবে না? ফিল্ম অ্যাকট্রেস মিশনারি নান নয়। স্ক্যাণ্ডালটা তার লাইফের সস–চাটনি। ওটা না থাকলে নয়নতারার এত চার্ম কি থাকত?
রণিতা বুঝতে পারছিল, মণিময় খুবই ঝকঝকে আধুনিক মানুষ, তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র শুচিবাই নেই। সুনাম দুর্নাম নীচতা মহত্ত্ব, সব মিলিয়ে নয়নতারার যে জীবন, পুরোপুরি সেটাই তিনি সেলুলয়েডে দেখতে চান। এদেশে নামকরা মানুষদের নিয়ে যখন কেউ বায়োগ্রাফি লেখে কিংবা ডকুমেন্টারি ছবি করে, সেখানে শুধু ভাল ভাল দিকগুলোই ফুটিয়ে তোলা হয়। অর্থাৎ মানুষকে স্রেফ দেবতা বানাও। কোনো জননেতা যদি রক্ষিতা পোষে কিংবা অবৈধ প্রেমে ডুবে যায় বা কোনো ধর্মগুরু যদি ক্ষণিকের দুর্বলতায় নারীসঙ্গ করে বসে, তা হলে চোখ বুঝে থাকে। ফলে জীবনীগ্রন্থ আর ডকুমেন্টারিগুলোতে থাকে শুধু চড়া, উজ্জ্বল রং। অন্ধকার না থাকলে আলোর কনট্রাস্ট যে ফোটে না, সেটা এই সব জীবনীলেখক আর ডকুমেন্টারি করিয়েদের মাথায় কিছুতেই ঢোকানো যাবে না। তাদের ধারণা, খারাপ দিকগুলো দেখালে বিখ্যাত মানুষদের ইমেজ নষ্ট হবে, তাঁরা ভাববেন, তাঁদের চরিত্রহনন করা হচ্ছে।
মণিময় বলেন, নয়নতারার জন্যে একজন হিরো বিষ খেয়ে মরেছে, দুজন পিস্তল নিয়ে লড়াই করেছে, এই ইনফরমেশনগুলো নিশ্চয়ই পেয়েছ!
রণিতা আস্তে মাথা নাড়ে–পেয়েছে।
এক সময় এই নিয়ে সারা দেশ জুড়ে তুমুল সেনসেশন ঘটে গেছে। সে যাক, শেষের দুই হিরো এখনও বেঁচে আছে। ওদের সঙ্গে দেখা করে দেখো কিছু বার করতে পার কিনা।
নিশ্চয়ই দেখা করব। আজ তা হলে আসি।
এস।
রণিতা আর অমিতেশ উঠে দাঁড়ায়।
.
০৭.
আরও দু সপ্তাহ পার হল।
কদিন আগে সম্পাদক পরাশর বসুর পরামর্শমতো বক্স নাম্বার দিয়ে দৈনিক দিনকাল-এ নয়নতারা সম্পর্কে একটা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে অভাবনীয় সাড়া পাওয়া গেছে। আড়াইশর মতো চিঠি পেয়েছে রণিতারা। পত্রদাতাদের দাবি, তারা খুব কাছ থেকে নয়নতারাকে দেখার সুযোগ পেয়েছে, কেউ কেউ ঘনিষ্ঠভাবে তাঁর সঙ্গে মেলামেশার কথাও বলেছে। কিন্তু তাদের চিঠি থেকে নতুন বা চমকপ্রদ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, সবগুলোই উচ্ছ্বাসের রঙিন ফেনায় ভর্তি।
এর মধ্যে প্রায় রোজই লালবাজারে রণজয়কে ফোন করেছে রণিতা কিন্তু এখনও ওঁরা নয়নতারার সন্ধান পাননি। চারদিকে লোক লাগানো রয়েছে, খোঁজ পেলেই জানিয়ে দেওয়া হবে।
যে প্রোডাকশন কোম্পানিগুলো নয়নতারাকে নিয়ে ছবি করেছে, গত দুসপ্তাহে তাদের অফিসে অফিসে অমিতেশকে সঙ্গে করে বোজ দুপুরে হানা দিয়েছে রণিতা। বেশির ভাগ কোম্পানি এখনও টিকে আছে, অবশ্য আগের রমরমা আর নেই। বেশ কটা উঠেও গেছে। চালু কোম্পানিগুলো ডকু-ফিচারের কথা শুনে খুব খুশি, জানিয়েছে রণিতাকে সবরকম সাহায্য করবে এবং যখনই সে নয়নতারার ছবি দেখতে চাইবে তখনই দেখানো হবে। বন্ধ হওয়া কোম্পানিগুলো তাদের ছবির নেগেটিভ আর প্রিন্ট যাঁদের কাছে বেচে দিয়েছে তাঁদেরও খুঁজে বার করেছে রণিতারা।নতুন স্বত্বাধিকারীরাও ওদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এর ভেতর দশ-বারোটা ছবি দেখে ক্লিপিং এর জন্য ডায়েরিতে কিছু কিছু নোটও নিয়েছে ওরা।
প্রোডিউসারদের সঙ্গে নয়নতারা সম্পর্কে প্রচুর আলোচনাও হয়েছে রণিতার। তাঁদের সবাই জানিয়েছে, কাজের ব্যাপারে নয়নতারা ছিলেন ভীষণ খুঁতখুঁতে, সিরিয়াস। কোনো দৃশ্যে নিজের অভিনয় পছন্দ না হলে বার বার সেটা করে যেতেন, ফলে বার বার শট নিতে হত। অভিনয়টা নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর তৃপ্তি নেই। ডিসিপ্লিনড় বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তা-ই। তা ছাড়া অত্যন্ত সময়ানুবর্তীও। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নয়নতারা কাজে লাগাতেন প্রায় কমপিউটারের দক্ষতায়। স্টুডিওতে দশটায় শিফট শুরু হলে ঠিক দশটাতেই চলে আসতেন। পাঁচ মিনিট আগেও না, পাঁচ মিনিট পরেও না। খুবই অমায়িক, মিশুক, সকলের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল এক কথায় চমৎকার। সবাই তাঁকে ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত। টাকাপয়সার ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ সচেতন, চুক্তি অনুযায়ী পাওনা মেটানো না হলে কাজ করতেন না।
