রণিতা জিজ্ঞেস করে, টাবু কে?
ওটা মৃণালের ডাকনাম। একটি বাঙালি মেয়ে ফিল্মকে কেরিয়ার হিসেবে নিয়েছে, শুনে কী ভাল যে লাগল! তার ওপর নয়নতারার ওপর ডকু-ফিচার করতে চাইছ। ইটস রিয়ালি থ্রিলিং। এখন বল কতটা কী করেছ। মেটিরিয়াল কিছু জোগাড় হয়েছে?
সব জানিয়ে রণিতা মণিময়ের মুখের দিকে তাকায়।
মণিময় বলেন, ফাইন। নয়নতারা যখন বেঁচে আছে, তাকে বাদ দিয়ে তার ওপর ভাল ছবি হতে পারে না। পুলিশের কাছে গিয়ে ভালই করেছ। ওরা চেষ্টা করলে ওর ঠিকানা হয়তো খুঁজে বার করতে পারবে। যতদিন না ঠিকানাটা পাওয়া যাচ্ছে অন্য ব্যাপারগুলো এগিয়ে রাখো।
কাজের লোকটি রণিতা আর অমিতেশের জন্য চা সন্দেশ এবং কেক নিয়ে আসে। মণিময়ের জন্য আনে শুধু আধ কাপ পাতলা লিকার।
খাও। খেতে খেতে কথা হোক। বলে নিজের কাপটি তুলে নিয়ে হালকা চুমুক দেন মণিময়। তারপর বলেন, নয়নতারার ছবিগুলো এর মধ্যে দেখে নাও। ওর নাটকের ভিডিও ক্যাসেট বা ফিল্ম যদি কেউ করে থাকে সে সবও দেখবে। ওগুলো থেকে কোন কোন অংশের ক্লিপিং তোমার ডকু-ফিচারে লাগাবে তার নোট করে রাখবে, নইলে পরে মনে থাকবে না।
কিন্তু—
বল।
ওঁর ছবি কোথায় পাব? আজকাল তো রেগুলারলি সিনেমা হলে ওগুলো দেখানো হয় না। মাঝে মাঝে দুচারটে নতুন করে রিলিজ করে। টিভিতে অবশ্য প্রায়ই দেখা যায়, তবে সব ছবি নয়।
একটু চিন্তা করে মণিময় বলেন, যে সব প্রোডাকশন কোম্পানি নয়নতারার ছবি করেছে তোমাকে তাদের কাছে যেতে হবে।
রণিতা জিজ্ঞেস করে, ওদের ঠিকানা কোথায় পাব?
আমার পুরনো ডায়েরিতে নয়নতারার কোন ছবি কবে রিলিজ করেছে, তার ডাইরেক্টর কে, কারা তার সঙ্গে অভিনয় করেছে, প্রোডিউসার কারা, তাদেব ঠিকানা, সব ডেট আর ইয়ার অনুযায়ী লেখা আছে। আমি একটা লিস্ট করে রাখব। নেক্সট উইকে এসে নিয়ে যেও।
আচ্ছা।
হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ায় মণিময় এবার বলে ওঠেন, তবে রণিতা জিজ্ঞাসু চোখে তাঁর দিকে তাকায়।
মণিময় বলেন, ওই সব প্রোডিউসারদের অনেকেই বেঁচে নেই, কেউ কেউ ছবির রাইটসুষ্ঠু প্রিন্ট বেচে কোম্পানি তুলে দিয়েছে।
রণিতা চিন্তিতভাবে বলে, তা হলে–
মণিময় বলেন, যাদের কাছে রাইট আছে তাদের সঙ্গে তোমাদের দেখা করতে হবে। যদি কিছু অসুবিধে হয় আমি ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু ওর নাটকের ভিডিও কারো কাছে আছে কিনা এক্ষুণি মনে পড়ছে না। আমার ডায়েরিতে যদি কোনো নোট থাকে, খুঁজে দেখতে হবে।
রণিতা জানায় নয়নতারার নাটকের ব্যাপারে তার বাবা অর্থাৎ ইন্দ্রনাথ তাকে সাহায্য করবেন।
মণিময় বলেন, তা হলে তো খুবই ভাল হয়। এর পাশাপাশি তোমাকে আরো কিছু জরুরি কাজ করতে হবে।
রণিতা বলে, কী?
নয়নতারার সঙ্গে কাজ করেছে এমন অনেক আর্টিস্ট, ডিরেক্টর এখনও বেঁচে আছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলবে। তাছাড়া ওর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলা দরকার। এঁদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে নয়নতারা মানুষ এবং শিল্পী হিসেবে কেমন। আর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে অভিনয় জীবনকে ভালভাবে মেশাতে না পারলে ডকু-ফিচারটা কিন্তু জমবে না। আমি তোমাকে যে লিস্টটা দেব তাতে নয়নতারার কো-অ্যাক্টর, কো-অ্যাকট্রেস আর ডিরেক্টরদের নাম ঠিকানা থাকবে। তুমি অবশ্যই তাদের সঙ্গে কনট্যাক্ট করবে।
কো-আর্টিস্ট আর ডিরেক্টরদের না হয় পাওয়া গেল কিন্তু ওঁর আত্মীয়স্বজনদের ঠিকানা কোথায় পাব?
অন্য আত্মীয়রা কোথায় থাকেন জানি না, তবে নয়নতারার শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা থাকতেন টালিগঞ্জে। আমার ধারণা এখনও ওঁরা ওখানেই আছেন। ওঁদের ঠিকানাটা বোধহয় দিতে পারব।
একটু চুপচাপ।
তারপর মণিময় জিজ্ঞেস করেন, বল, আমার কাছে আর কী সাহায্য চাও।
রণিতা হাসিমুখে, কিছুটা মজা করেই বলে, আপনি বলেছেন, যাঁরা নয়নতারাকে দেখেছেন বা ওঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন তাঁদের সঙ্গে ওঁর বিষয়ে যেন খুটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিই। এ কাজটা আপনাকে দিয়েই শুরু করতে চাই।
মণিময় হেসে ফেলেন, আমাকে দিয়েই? ঠিক আছে, আরম্ভ কর।
হঠাৎ মৃণালের হুঁশিয়ারি মনে পড়ে যায় রণিতার। স্ট্রোক হবার পর থেকে মণিময়ের বেশি কথা বলা বারণ। সে বলে, আপনাকে অনেকক্ষণ বকাচ্ছি। যদি ক্লান্তি লাগে আজ থাক, পরে একদিন বসা যাবে।
মণিময় জোরে জোরে দুহাত নেড়ে ক্লান্তির প্রসঙ্গটা উড়িয়ে দিয়ে বিপুল উৎসাহে বলেন, আমি ঠিক আছি, পারফেক্টলি অল রাইট। তোমাদের সঙ্গে নয়নতারার সম্বন্ধে কথা বলতে ভীষণ ভাল লাগছে।
প্রশ্নগুলো মনে মনে সাজিয়েই রেখেছিল রণিতা। সে বলে, খবরের কাগজ আর নানা ম্যাগাজিন থেকে জানতে পেরেছি, পাটিসানের পর নয়নতারা শশুর, শাশুড়ি, স্বামী, দুই দেওর আর এক ননদের সঙ্গে ইস্ট পাকিস্তান থেকে কলকাতায় চলে আসেন। তখন অবশ্য ওঁর নাম ছিল লক্ষ্মী রায়। দেশে কিছু প্রপার্টি ছিল, একটা পয়সাও আনতে পারেন নি। কলকাতায় প্রথমে উঠেছিলেন কালিঘাটে। অবস্থা খুবই খারাপ, দুবেলা খাওয়া জুটত না। কালিঘাটে ওঁদের প্রতিবেশী ছিলেন ফিল্মের একজন অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টর। লক্ষ্মী ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টরটি বোঝাল সিনেমায় নামলে ভাল পয়সা পাওয়া যাবে। লক্ষ্মীদের রক্ষণশীল ফ্যামিলিতে গোড়ার দিকে এ নিয়ে প্রচণ্ড আপত্তি ছিল। কিন্তু পভার্টি, হাঙ্গার এমনই ব্যাপার যার সামনে কোনো বাধা কোনো ওজরই টেকে না। লক্ষ্মী সিনেমায় নামলেন। তবে ওরকম পুরনো ধাঁচের নাম গ্ল্যামার ওয়ার্ডে অচল, ওটা পালটে রাখা হল নয়নতারা। যে ডিরেক্টর এই নামকরণটা করেছেন তিনি নাকি বলেছিলেন, একদিন দর্শকদের চোখের মণি হয়ে উঠবেন লক্ষ্মী। সেই জন্যে এই নাম দেওয়া হল। নয়নতারার প্রথম চারটে ছবি ফ্লপ। ফিফথটা অ্যাভারেজ হিট, সিলথটা সুপারহিট, এই ছবি থেকেই তিনি স্টার। এর বেশি ইনফরমেশন আর পাওয়া যায় নি। এবার আপনি বলুন–
