বাংলাদেশে শিক্ষার মাধ্যম এবং সরকারী ভাষা যেহেতু বাংলা, সে জন্যে নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটা প্রধান কারণ পাঠ্যপুস্তক এবং পরিভাষা। তা ছাড়া, পত্রপত্রিকার প্রয়োজনে এখন এন্তার লেখা হচ্ছে এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লেখা হচ্ছে। ফলে ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি না-হলেও, প্রকাশক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ধারণা আগে যা ইংরেজি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হতো, এখন তা লেখা হয়। বাংলা দিয়ে, যদিও বেশির ভাগ কষ্ট করে বুঝে নিতে হয়। কতোগুলো সুন্দর শব্দও তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো আঞ্চলিক শব্দও এখন লিখিত ভাষায় সর্বজন স্বীকৃত না-হোক, সর্বজনবোধ্য শব্দে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো শব্দের অর্থ বদলে যাচ্ছে। যেমন “জব্দ” শব্দটি। চিরকাল এর অর্থ ছিলো কাউকে বেকায়দায় ফেলা, নাজেহাল করা ইত্যাদি। কিন্তু এখন অনেক পত্রিকায় লক্ষ্য করছি এর অর্থ দাঁড়িয়েছে পুলিশ কর্তৃক কোনো কিছু আটক করা। ‘বিধায়’ বলে কোনো শব্দ স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত জানতাম না। কিন্তু এখন বিধায় একটি বহুলব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। মুখের ভাষাতেও শব্দটার ব্যবহার লক্ষ্য করেছি।
বাংলা ভাষার ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক বাড়লেও, বেশির ভাগ শিক্ষিত লোক ভুল বানানে, ভুল ব্যাকরণে কোনো মতে নিজের মনের কথা প্ৰকাশ করতে পারেন। শুদ্ধ বানানে এবং শুদ্ধ ব্যাকরণে একটি চিঠি লিখতে পারেন–এমন লোকের সংখ্যা দেশে শিক্ষার হারের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আগে গ্রাম থেকে এসে সবাই মোটামুটি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা শিখতেন। এখন কর্মকর্তা, সাংসদ, মন্ত্রী থেকে আরম্ভ করে শিক্ষকরা পর্যন্ত প্ৰামাণ্য ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষা মিশিয়ে এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলেন। এমন কি, বেতার-টেলিভিশনের মতো একটা মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়েও তারা শুদ্ধ উচ্চারণে প্ৰামাণ্য বাংলা বলতে পারেন না।
গত তিন দশকে মানুষের গড় আয়ু আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্যাল সালাইনের মতো স্পল্পমূল্যের কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বহু লোকের প্রাণ রক্ষায় সাহায্য করেছে। এমন কি, টিকা দান সম্পর্কে সচেতনতাও এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি থেকে জীবনযাত্রার মান এবং চিকিৎসা-সুযোগ বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। (এর সঙ্গে কোনো অলৌকিক শক্তির যোগাযোগ কল্পনা করার মানে নেই।) পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কেও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের আকার কতো বড়ো হবে–সে ব্যাপারে অনেক নারী এখন তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্ৰকাশ করতে আরম্ভ করেছেন। এও নিঃসন্দেহে উন্নতির সূচক।
অপর পক্ষে, সমাজের দিকে আর-একটু গভীরভাবে তাকালে খুশিতে আট-খানা হবার উপায় থাকে না। এক সময়ে শিক্ষক এবং অধ্যাপকরা ছিলেন সমাজের চোখে আদর্শ মানুষ। এখন সেই আদর্শ মানুষেরা তাদের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে অসৎ পথে টাকা করছেন। তাদের অনেকে ক্লাস নেন না। যারা ক্লাস নেন, তারা ক্লাসে নাপড়িয়ে টিউটরিয়াল হোমে পড়ান। একটা চাকরির দায়িত্ব পুরো পালন না-করেই আর-একটা উপরি চাকরি জুটিয়ে নেন। এমন কি, পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারেও সততা পালন করেন না।
শুধু শিক্ষক-অধ্যাপক নন, সাংবাদিক, আইনজীবী, পেশাদারদের মতো বুদ্ধিজীবী বলে যে-শ্রেণী একদিন সমাজে পরিচিত ছিলো, সমাজবিবেকের কণ্ঠস্বর ছিলেন যারা, তারাও এখন তাদের বোধ এবং মননশীলতার পণ্য দিয়ে বাণিজ্য করছেন। সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব পুরোপুরি ভুলে গেছেন তারা; অথবা ভুলে যাওয়ার ভান করছেন। কোনো নীতি অথবা আদর্শের প্রতি তাদের আনুগত্য নেইবেশ্যার মতো তাদের দ্বার সবার জন্যেই অবারিত। দরদস্তুর ঠিক থাকলেই হলো। যখন দেশে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মাত্র চার-পাঁচজন, তখন তোফাজ্জল হোসেনের মতো সাংবাদিক জেল খেটেছিলেন। তাঁর পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছিলো। এখন সম্পাদকের সংখ্যা নির্ণয় করার জন্যে ক্যাকুলেটর প্রয়োজন হয়, কিন্তু কোনো সম্পাদক কারারুদ্ধ হন না। খুব কম বুদ্ধিজীবীই সরকারী রক্তচক্ষুর শিকার হন। কারণ তারা আপোশ করার জন্যে তৈরি থাকেন সব সময়। তারা বন্দী স্ব-আরোপিত সেন্সর এবং প্রলোভনের কারাগারে।
৬০-এর দশকে বাঙালিয়ানা যখন তুঙ্গে পৌঁছেছিলো, তখন বুদ্ধিজীবীরা অনায়াসে ধর্মীয় গোড়ামির কঠোর সমালোচনা করতে পারতেন এবং করতেনও। সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলনে মানুষ রাস্তায় নামতো। আমীর হোসেন চৌধুরীর মতো মানুষ তাতে প্রাণও দিয়েছিলেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত হলেও, তখনো পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র ছিলো না। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে যে-বাংলাদেশের জন্ম, সেই বাংলাদেশ এখন কেবল মুসলমানপ্রধান দেশ নয়, কার্যত ইসলামী দেশ। অমুসলমানরা সেই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। হিটলারের আমলের ইহুদীদের মনে করিয়ে দেন তারা। সেই দেশের জন্মের বিরুদ্ধে যারা এক সময়ে অস্ত্ৰ ধারণ করেছিলো, সেই রাজাকারদের নেতারা এখন পতাকা উড়িয়ে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন। সেই রাজাকার-নেতারা এখন দেশের আইনের থেকেও ফতোয়াকে বড়ো বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। আইন-আদালত তুলে দিয়ে মসজিদ-রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানান। তার থেকেও দুঃখের বিষয়—সমগ্র বুদ্ধিজীবী সমাজ আমিনীদের সেই দৰ্পিত উক্তি বিনা প্রতিবাদে শুনে যান।
