ধর্মের নামে এমন উগ্ৰবাদ বঙ্গদেশে কখনো ছিলো না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাসে দেখা গেছে ধর্মের ব্যাপারে বাঙালিরা সহনশীল। বাংলার হিন্দুধর্ম ভারতীয় হিন্দুধর্ম থেকে আচার-উৎসবে অনেকটাই ভিন্ন। বাঙালির বৌদ্ধধর্ম ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম থেকে অনেকাংশে আলাদা। আর বাংলার ইসলাম মধ্যপন্থী, গুরুমুখীআরব দেশের ইসলাম থেকে যথেষ্ট আলাদা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রো-ডলারের প্লাবনে ইসলামের সেই সহনশীলতা ধুয়ে-মুছে বঙ্গোপসাগরে নেমে গেছে। সেই সঙ্গে লুপ্ত হয়েছে মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই— এই চিরন্তন সত্য। এ দেশে মানুষের জন্যে ধর্ম নয়, ধর্মের জন্যে মানুষ। রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসার ফলে আমরা নিঃসন্দেহে কট্টরপন্থার অধীনতা গ্ৰহণ করেছি। স্বাধীনতার বহু লাভের মধ্যে এই আদর্শ বিসর্জন সবচেয়ে বড়ো লোকসান।
(যুগান্তর, ২০০৭)
২৯. শাদা-কালো
ভালো, নয়তো মন্দ–এক রকম ঢালাওভাবে আমরা অনেক সময় সব কিছুর মূল্যায়ন করি। কিন্তু পৃথিবীতে বেশির ভাগ জিনিশই হয় ভালো, নয় মন্দ নয়। বেশির ভাগ জিনিশেরই কিছুটা ভালো, কিছুটা মন্দ। কারো ভালোর পরিমাণ বেশি, কারো বা মন্দের। কারো উভয়ই প্ৰায় সমান। একেবারে নির্ভেজাল কুচকুচে কালো, অথবা একেবারে খাটি ঝকঝকে শাদা বলে কিছু নেই। বেশির ভাগটাই শাদা আর কালোর মাঝখানে— ধূসর, যা ঠিক শাদাও নয়, কালোও নয়। চাঁদও পুরো রুপোলি নয়, তারও কলঙ্ক আছে। আমরা তো পাপীতাপী–বেশির ভাগটাই আমাদের কালো, কিন্তু মহামানবদের দিকে একটু ভালো করে তাকালেও দেখতে পাবেন, তাদেরও সীমাবদ্ধতা ছিলো। তাদের চরিত্রেও ছিলো কালিমার দাগ। সেটা যারা দেখতে পায়। না, তারা সেই মহামানবদের ভক্ত নয়, অন্ধ ভক্ত।
বাঙালিদের চরিত্রের একটা প্ৰধান বৈশিষ্ট্য হলো এই অন্ধত্ব। তাঁরা সব ব্যাপারেই খুব জোরালো মনোভাব পোষণ করেন। যাকে ভালো বলেন, তাঁর সবকিছু ভালো। তার চোদো পুরুষ ভালো। যাকে খারাপ বলেন, তারও চোদ্দো পুরুষ খারাপ। কেবল তাই নয়, তারা যাকে খারাপ বলে মনে করেন, আপনারও তাকে খারাপ বলে মেনে নিতে হবে। যতোক্ষণ আপনি তা না-নিচ্ছেন, ততোক্ষণ তারা আপনার “ভ্রান্তধারণা” ভাঙানোর জন্যে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। একটা উদাহরণ দিতে পারি। অতীতে যাঁরা বাঙালিদের শাসন করেছেন এবং যাঁদের সামনে তাঁরা শতাব্দীর পর শতাব্দী মোশায়েবি করেছেন, সেই শাসকদের নিন্দায় তাঁরা এখন পঞ্চমুখ। এমনভাবে তাঁরা নিন্দা করবেন যে, অতীতের সব খারাপ জিনিশের, সব অমঙ্গলের জন্যেই তাঁরা দায়ী। কেবল তাই নয়, তাদের যে অসংখ্য দোষ ছাড়া কোনো গুণ ছিলো না, সে বিষয়ে বাঙালিরা একেবারে একমত হবেন। বস্তুত, তাদের মধ্যে উদারতার মনোভাব খুব দুর্বল।
আমাদের সাহিত্যেও এই মনোভাব জোরালোভাবে প্ৰকাশ পেয়েছে। শরৎচন্দ্রের এক নায়ক আছে, যে জমিদার-নন্দন। চেহারা কার্তিকের মতো। পাড়ায় একবার মাস্তানরা এসেছিলো, সে একাই লাঠি দিয়ে তাদের লোপাট করে তাড়িয়ে দিয়েছে। খুব ভালো ছাত্র সে। আবার সে কলেজের ফুটবল-দলের ক্যাপ্টেন। ক্রিকেট দলেরও ক্যাপ্টেন। গান গায় চমৎকার। এখানে শেষ হলেও হতো। কিন্তু শরৎচন্দ্রের কল্পনাশক্তি দুর্বল ছিলো না। তাঁর নায়ক সেতারও বাজায় ভালো। অর্থাৎ সে নায়ক বলে তার সবই উৎকৃষ্ট। সবটাই তার শাদা। অপর পক্ষে, আমাদের ভিলেনরা কেবল নায়কের প্রতিপক্ষ নয়। তারা ভয়ানক গুণ্ডা। চরিত্রহীন। বর্বর। এমন কি, তাদের চেহারাও কুৎসিত। এই যে মনোভাব, তা আধুনিক নয়, নিরপক্ষ নয়, একপেশে; কিন্তু এই মনোভাবই প্রাচীন কাল থেকে আমাদের সংস্কৃতিতে প্রবলভাবে চলে এসেছে। সে জন্যেই রাবণ কেবল রামের প্রতিপক্ষ নন, তিনি দশ মাথাওয়ালা রাক্ষস। রামের সব ভালো, রাবণের সব খারাপ।
বছর বারো আগে আমি শেখ মুজিবকে নিয়ে একটি ছোট্টো লেখা লিখেছিলাম। তাতে বলেছিলাম যে, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের জন্মদাতা। এবং নেতা হিশেবে তাঁর এমন ক্যারিজমা ছিলো যে, তিনি বাংলাদেশকে জন্ম দিয়ে তাকে ঠিকমতো লালনপালন করে বড়ো করেও তুলতে পারতেন। কিন্তু দুৰ্ভাগ্যক্রমে কিছু বাংলাদেশবিরোধী এবং বিদ্রোহী সেপাই-এর হাতে তিনি নিহত হন বলে সে কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। আমি সেই সঙ্গে এও লিখেছিলাম যে, শেখ মুজিব প্রশাসক হিশেবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি যতো বড়ো নেতা ছিলেন, ততো বড়ো প্রশাসক ছিলেন না। আলোচনার শেষে তাঁর দেহাবশেষ রেসকোর্সে নিয়ে আসা উচিত বলে আমি লিখেছিলাম, “আপনি কবে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে আসবেন, সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।”
আমার ধারণা, আমার সে লেখায় শেখ মুজিবের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধাই আমি প্রকাশ করেছিলাম, যদিও তাতে আদৌ কোনো চাটুকারিতা ছিলো না। বরং, আমার বিবেচনায়, তাতে ছিলো শেখ মুজিবের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। কিন্তু আমার সেই লেখা পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র–তার মানে সম্ভবত আমার ছাত্রের ছাত্রআমাকে একটা চিঠি লেখেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, আমার মতো দুমুখো চামচার কোনো প্রয়োজন নেই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলার ঘরে ঘরে লাখ লাখ মুজিবসেনা তৈরি হচ্ছে।
আমার ওপর এই ছাত্রের রাগের কারণ, আমি কেন শেখ মুজিবের সবটাই ভালো বলতে পারিনি। তিনি যেহেতু জাতির পিতা, সুতরাং তাঁর কোনো সীমাবদ্ধতা, তাঁর কোনো খুঁত থাকবে কী করে? তিনি হবেন, সকল কালিমা-মুক্ত। দেবতার মতো। এই মনোভাবকেই আমি বলি শাদা-কালোর মনোভাব।
