ব্যবসায়ীরা চিরকালই টাকা করার ধান্ধায় ছিলেন। মানুষকে ঠকিয়ে বাড়তি মুনাফা করাই তাদের কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে সৎ ব্যবসায়ীও আগে ছিলেন। লাভ করলেও, অন্তত লোভে তারা বিবেক বিসর্জন দিতেন না। অপর পক্ষে, এখনকার ব্যবসায়ী ব্যস্ত ভেজাল মেশাতে। সিন্ডিকেট করে জিনিশের দাম বেঁধে দিতে। কিভাবে কম কষ্টে রাতরাতি বড়ো লোক হওয়া যায়, ঠিকাদার থেকে আরম্ভ করে দোকানদার পর্যন্ত সবারই সেই একই স্ট্র্যাটিজি। এক কথায়, মানুষ টাকার জন্যে এখন কেবল সততা নয়, মনুষ্যত্ব এবং বিবেক ধুয়ে-মুছে ফেলে দিয়ে পাগলের মতো ছুটছে। টাকা দিয়ে এখন সবাইকেই কেনা যায়। কেবল এক-একজনের একএকটা দাম। কারো একটু বেশি, কারো কিছু কম।
সামাজিক দিক দিয়ে আমাদের লাভ বেশি হয়েছে, নাকি লোকসান, তা অবশ্য বিতর্কের বিষয়। শিক্ষার হার লক্ষযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে–এটা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন। সেই সঙ্গে আর-একটা অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন হলো স্ত্রীশিক্ষার বিকাশ। যে দেশে পঞ্চাশ বছর আগেও বেশির ভাগ পরিবারে স্ত্রীশিক্ষাকে মনে করা হতো অগ্রহণযোগ্য এবং লোকাচারিবিরোধী, সেই দেশে স্ত্রীশিক্ষার এই বিকাশকে অসাধারণ অগ্রগতি না-বলে উপায় নেই। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে মেয়েরা এখন ছেলেদের চেয়ে ভালো ফলাফল করছে। কিন্তু এই অগ্রগতি সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান নিচে নেমে গেছে বলেই অনেকে ধারণা করেন। এটা আদৌ ইতিবাচক নয়।
স্ত্রীশিক্ষা বিকাশের ফলে মহিলারা এখন নানা পেশার ছোটো-বড়ো নানা পুদে কাজ করছেন। আগে যেখানে কয়েকটা মাত্র পেশা খোলা ছিলো মেয়েদের জন্যে, এখন সেখান প্ৰায় সব পেশাতেই তাদের দেখতে পাওয়া যায়। এবং তারা এসব কাজে যোগ্যতারও পরিচয় দিয়েছেন। দুর্নীতিও তাদের মধ্যে পুরুষদের চেয়ে কম বলে মনে হয়। স্বাধীন উপার্জন করার ক্ষমতা লাভ করায় সমাজ এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কণ্ঠ জোরালো হয়েছে। ইউনিয়ন থেকে সংসদ পর্যন্ত সব স্তরের রাজনীতিতে তাদের নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। যে-পুরুষ সমাজ এক সময়ে “স্ত্রীবুদ্ধি’ বলে মেয়েদের মননশীলতাকেই প্রশ্ন করতেন, এখন সেই পুরুষকুল নারীনেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতা যেমনই হোক, দেশে পর পর দুজন মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ফলে সামগ্রিকভাবে নারীনেতৃত্বের প্রতি পুরুষদের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। যে-নারীকে পুরুষরা এক কালে মেয়েমানুষ বলে হেয় জ্ঞান করতেন, সেই নারীদেরই এখন তারা ম্যাডাম ম্যাডাম’ করে তাদের অনুগ্রহ লাভের জন্যে ব্যতিব্যস্ত হয়েছেন। একে বিশেষ ইতিবাচক পরিবর্তন বলে বিবেচনা করতে হবে।
সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রেও উন্নতির অনেক লক্ষণ দেখা দিয়েছে। সাহিত্য, সঙ্গীত, থিয়েটার, সিনেমা— প্রতিটি ক্ষেত্রে। স্বাধীনতা উন্নতির যে-পথ খুলে দেয়–সেই পথ ধরেই এসব বিকাশ ঘটেছে। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত ঢাকায় মঞ্চ ছিলো না। নাটকের অভিনয় ছিলো ব্যতিক্রমী ব্যাপার। এখন ঢাকায় অনেকগুলো থিয়েটার গোষ্ঠী হয়েছে। তার চেয়েও বড়ো কথা–ঢাকায় রীতিমতো উচ্চমানের অভিনয় হচ্ছে। অভিনয়ের প্রয়োজনে ভালো নাটকও লেখা হচ্ছে। এমন কি, টেলিভিশনের কল্যাণেও অনেক নাটক লেখা হচ্ছে। থিয়েটারের দিক দিয়ে ঢাকা কলকাতাকে ছাড়িয়ে না-গেলেও টেলিভিশন নাটকের দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত সিনেমা-শিল্প ছিলো নিতান্ত শিশুতোষ। বিশেষ করে পশ্চিবঙ্গে যেখানে সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালক বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র তৈরি করছিলেন, সেখানে বাংলাদেশের সিনেমা রূপকথার জগতে বিরাজ করছিলো। কিন্তু এখন সিনেমার বিকাশ অনেকটাই ঘটেছে। তারেক মাসুদ, হুমায়ূন আহমেদ, তানভীর মোকাম্মেল প্রমুখ ভালো ছবি নির্মাণ করতে এগিয়ে এসেছেন। শ্যামল ছায়া, চন্দ্ৰকথা, মাটির ময়না এবং লালসালুর মতো ছবি এখন তৈরি হচ্ছে। মুখ ও মুখোশ থেকে বাংলাদেশের সিনেমা অনেক দূর এগিয়ে এসেছে।
সঙ্গীতেও অনেক উন্নতি হয়েছে। এর সঙ্গে সামাজিক উন্নতিরও যোগ রয়েছে। এক সময়ে মুসলিম সমাজে গান-বাজনার চর্চা বলতে গেলে নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু এখন নিতান্ত মৌলবাদী ছাড়া সবাই গানকে মেনে নিয়েছেন। সুযোগ-সুবিধে এবং ভালো শিল্পীর সংখ্যাও অনেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে সঙ্গীতের মানও উন্নত হয়েছে। এর একটা প্রমাণ এই যে, বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, পল্লীগীতি, এমন কি, আধুনিক গান এখন পশ্চিমবাংলায়ও সমাদৃত হচ্ছে। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে বাংলাদেশ অবশ্য এখনো পিছিয়ে আছে। তার কারণ, এই ক্ষেত্রে অতো কম সময়ের মধ্যে উন্নতি করা কঠিন। প্রসঙ্গত নাচের কথাও বলা যায়। যেমুসলিম সমাজে গানই ছিলো ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ, সে সমাজে মেয়েদের নাচের কথা ভাবাও যেতো না। এখন শহরের শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরা নাচতে পারে–এ কথা শুনলে বিস্ময়ে হতবাক হওয়ার কারণ থাকে না।
পাকিস্তানী আমল থেকেই সাহিত্যের উন্নতি শুরু হয়েছিলো। কিন্তু তখন প্রকাশের সুযোগ এবং শিক্ষার হার এখনকার তুলনায় অনেক কম থাকায় সে বিকাশ হয়েছিলো সীমিত পরিমাণে। এখন প্ৰযুক্তির উন্নতির ফলে প্রকাশনা-শিল্পে বলতে গেলে বিপ্লব ঘটে গেছে। কেবল বই নয়, পত্রপত্রিকার সংখ্যা খুবই বৃদ্ধি পেয়েছে। এতো ছোটো একটা দেশে এতোগুলো দৈনিক পত্রিকা–প্ৰায় কল্পনাই করা যায় না। এসব পত্রপত্রিকার প্রয়োজনে নাম-করা কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার না-হলেও, কতো যে কলাম লেখক তৈরি হয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। এ ধরনের বেশির ভাগ খবরের কাগুজে লেখা না-লিখলেও ক্ষতি হতো না। কিন্তু পত্রিকার ভরাট করার জন্যে লিখতে হয়। এসব কলাম লেখকদের। এই প্ৰায় সংখ্যাহীন রচনার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই দুচারটা ভালো লেখাও প্রকাশিত হচ্ছে।
