প্রশাসনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি বেড়েছে দু ভাবে। প্রথমত, অফিসের বড়ো সাহেব থেকে আরম্ভ করে একেবারে অধস্তন কর্মচারী পর্যন্ত কেউই এখন উপরি পাওনা / অনুগ্রহ লাভ / রাজনৈতিক ফয়দা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। মিশরে ঘুসের একটা সৰ্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি আছে। সব কাজের জন্যে সেখানে এক-একটা নির্দিষ্ট ঘুসের অঙ্ক ঠিক করা আছে। সরকারী মাশুলের সঙ্গে সেটাও দিতে হয়। দিনের শেষে অফিসের সবাই সেই ঘুস আনুপাতিক হারে ভাগ করে নেয়। কিন্তু ভালো দিক হলো এই যে, দিনের শেষে কাজটাও সম্পন্ন হয়। ফলে যার কাজ সেও সন্তুষ্ট হয়। তার কোনো অভিযোগ থাকে না। বাংলাদেশে ঘুসের এ রকম কোনো স্বীকৃত পদ্ধতিও নেই। এমন কি, ঘুস দিলেও কাজ হবে–তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
দুর্নীতির দ্বিতীয় এবং সম্ভবত প্রধান কারণ: রাজনৈতিক প্রভাব। মন্ত্রী, যন্ত্রী, সন্ত্রিীরা–সবাই প্রভাব খাটান। সবার হাতেই টেলিফোন। আগে টেলিফোন যখন সর্বত্রগামী ছিলো না, তখন অন্তত থানা, ইউনিয়ন ইত্যাদি পর্যায়ে কর্মকর্তাদের তোেয়াজ করে অথবা টাকা পয়সা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া যেতো। কিন্তু এখন গ্রামীণ ফোনের দৌলতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামও রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় এসেছে। কেবল মন্ত্রী নন, সাংসদ, ক্ষমতাসীন দলের কমী, দালাল এবং চাঁদাবাজসবাই ফোনাফুনিতে পারদশী। থানায় একটা মামলা নেওয়া হবে। কিনা, সেটাও সাংসদ এবং তার চামচাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। ওদিকে প্রশাসনের অনেক কর্মচারীই যেহেতু দুর্নীতিগ্ৰস্ত সে জন্যে তারা এই রাজনৈতিক টাউট এবং চেলাদের ফোন অগ্রাহ্য করতে পারেন না। সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না নিজেদের বিবেক-বিবেচনা অনুযায়ী। বরং যে-কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব যতো বেশি স্বীকার করে নেন, তাঁর উন্নতি ততো দ্রুত গতিতে হয়। কেউ ভিন্ন পথে চলতে চাইলে তাকে ওএসডি হতে হয়। ব্যাচ-মেইটদের পেছনে পড়ে থাকতে হয়। এমন কি, ক্ষেত্রবিশেষে চাকরি হারাতে হয়। সুতরাং নিতান্ত অবিবেচক না-হলে সব কর্মকর্তা বাধাপথেই চলেন। বাংলাদেশে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হয়–এটা ঐ সৰ্ব্বগ্রাসী দুর্নীতিরই প্রত্যক্ষ ফলাফল। এটা স্বাধীনতার সুফল নয়, অবাঞ্ছিত কুফল। কোন তথাকথিত নিরপেক্ষ বিচারপতিকে দিয়ে ভোট কারচুপির পথ পরিষ্কার হবে–সেই হিশেবে করে বাংলাদেশে বিচারপতির অবসর গ্রহণের সময় পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। দুর্নীতির এমন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেন রাজনীতিকরা! কে বলে বাঙালিরা মেধাবী নন? উর্বর মস্তিষ্কবিশিষ্ট লোক নন?
বাংলাদেশে যে-জিনিশটার অস্তিত্ব বলতে গেলে লোপ পেয়েছে, তা হলো আইনের শাসন। ষাটের দশকে আমরা ছিলাম ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। তার ওপর সেই শাসনের চরিত্র ছিলো সঙিন—উচানো। তা সত্ত্বেও তখন দেশে আইনআদালত ছিলো। অপরাধ হলে তার বিচার হতো। জীবন এবং মালের নিরাপত্তাও ছিলো। এমন কি, পত্রপত্রিকায় ধর্মীয় রক্ষণশীলতা-সহ নানা বিষয়ে লেখা যেতো। রক্ষণশীলতার দুর্গে হামলা চালালে অথবা সরকারের সমালোচনা করলে লোকে প্ৰগতিশীল বলে প্ৰশংসা করতো।
মানুষ খুন করেও শাস্তি না-পেতে পারে। এমন কি, প্ৰাণদণ্ড-প্রাপ্ত অপরাধীও বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীরা বহাল তবিয়তে জেলখানায় জামাই আদরে না-থাকলেও অন্তত খেয়ে-পরে বেঁচে থাকে। এর মধ্যে সাধারণ খুনী থেকে আরম্ভ করে এমন খুনীও আছে যারা দেশের নির্বাচিত সরকার-প্রধানকে হত্যা করার অপরাধে প্ৰাণদণ্ডে দণ্ডিত। আবার প্রাণদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বিদেশে অবস্থান কালেই তার দেশে ফেরার পথে লাল গালিচা বেছানোর জন্যে তার দণ্ডাদেশ রাষ্ট্রপতি মওকুফ করে দেন– এমন ঘটনাও ঘটে। কেবল তাই নয়, মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্তকে দণ্ড দিতে যে-প্ৰশাসন ব্যর্থ হচ্ছে, সেই একই প্রশাসন আবার চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী অথবা চরমপন্থীকে নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে হত্যা করে। এভাবে ন্যূনতম মানবাধিকার পর্যন্ত লোপ পায়।
দেশের বেশির ভাগ লোক অবশ্য খুনখারাপি নয়, ক্ষতিগ্ৰস্ত হন। ছোটোখাটো অপরাধ থেকে। তারও কোনো বিচার হয় না। বিচার হলেও ন্যায্য বিচার হয় না। ন্যায্য বিচার হলেও শাস্তি হয় না। শোনা যায়, এখন টাকা দিয়ে জামিন নিশ্চিত করা যায়। এমন কি, মামলার রায়কে প্রভাবিত করা যায়। ক্ষমতাসীন দলের হাতের পুতুল হওয়ায় উচ্চ আদালত সেই বিচারকের ক্ষমতাকে স্থগিত রাখার আদেশ দিয়েছে— এমন দৃষ্টান্ত এর আগে কোথাও স্থাপিত হয়নি। রাজনীতি দিয়ে বিচার-ব্যবস্থাকে এতো প্রভাবিত করা যাচ্ছে বলেই ক্ষমতাসীন দল বিচার-ব্যবস্থাকে প্রশাসন ব্যবস্থা থেকে আলাদা করার দাবিকে নানা কৌশলে ঠেকিয়ে রাখে। আবার সেই দল বিরোধী দলে পরিণত হলে তখন বিচার-ব্যবস্থাকে স্বাধীন করার দাবি জানায়। বিচার বিভাগের এ হেনো সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উচ্চ আদালতে এখনো মাঝেমধ্যে এক-একটা স্বাধীন রায়ের কথা শোনা যায়, এমন কি সরকারের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে।
আর্থিক দিক দিয়েও বাংলাদেশ কিন্তু অনেকটা অর্জন করেছে। প্রবৃদ্ধির পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়েছে। আর ব্যক্তির কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের কয়েক লাখ পরিবার রীতিমতো ধনী হয়েছে। বস্তুত, স্বাধীনতার ননী-মাখন তাঁরাই নিঃশেষে শোষণ করেছেন। তবে এ কথা বোধহয় স্বীকার করতে হবে যে, ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও বৈদেশিক সাহায্যের কল্যাণে আগের তুলনায় খানিকটা উন্নত হয়েছে। তবে সেই সঙ্গে এও স্বীকার নাকরে উপায় নেই যে, এ দেশে শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ যতোটা হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো, তার তুলনায় সামান্যই হয়েছে। এই সীমিত বিকাশের কারণ: সর্বব্যাপী দুর্নীতি, দলবাজি ট্রেড ইউনিয়ন এবং অস্থিতিশীল রাজনীতি।
