স্বাধীন দেশ হিশেবে বাংলাদেশের আত্মপ্ৰকাশই একটা অসাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা। তাবৎ বিশ্বে আমরা এখন বাংলাদেশ নামক একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিশেবে পরিচিত। এই স্বাধীন দেশ গড়ে ওঠার ফলে এই অঞ্চল এবং এই অঞ্চলের জনগণের উন্নতির বহু পথ খুলে গেছে–রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি— প্রতিটি ক্ষেত্রে। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা প্ৰায় নজিরবিহীন উন্নতি লক্ষ্য করেছি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ্যিক্ষত উন্নতি আসেনি আমাদের অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির ফলে। এমন কি, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। মোট কথা, স্বাধীনতা থেকে যে-ফল আমরা পেয়েছি, তার সবটাই অমৃত ফল নয়, তার মধ্যে হলাহলও আছে।
স্বাধীনতা লাভের ফলে আমরা যে একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হতে পেরেছি— এটা যেমন সবচেয়ে বড়ো লাভ; তেমনি স্বাধীনতা লাভের ফলে আমাদের পরিচয় বদলে গেছে অথবা আমাদের পরিচয় আমরা স্বেচ্ছায় বদলে নিয়েছি।–এটাকে আমার মনে হয়েছে সবচেয়ে বড়ো লোকসান। আমরা বহু মূল্যের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিলাম বাঙালি হবো বলে কিন্তু স্বাধীনতা লাভের মাত্র কয়েক বছর পরেই আমরা মুসলমান হয়েছি। এখন কেবল সাধারণ মুসলমান নয়, তালেবান হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এই পরিণতি হবে জানলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রাণ দিতেন কিনা, মুসলমান-অমুসলমান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতেন। কিনা, সন্দেহ হয়। জাপানের নাগরিক হতে হলে প্রথমেই প্রার্থীকে তার পুরোনো নাম বদলে একটা জাপানী নাম নিতে হয়। আত্মপরিচয়ের বিনিময়ে আত্মসম্মানবিশিষ্ট কেউ জাপানের নাগরিক হতে চাইবেন কিনা, আমার জানা নেই। কিন্তু আমি চাইবো না। আমার ধারণা মুক্তিযোদ্ধারা তালেবান রাষ্ট্র গঠনের জন্যে সংগ্রাম করতেন না। স্বাধীনতার এটা সবচেয়ে বড়ো বিষফল।
তবে ক্ষমতা দখলের খেলায় আমাদের পরিচয় পাল্টে গেলেও, রাজনৈতিক কোনো অগ্রগতিই হয়নি, তা নয়। পাকিস্তানী আমলের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছিলো ফৌজী শাসনে। গণতন্ত্র আদৌ। তার শিকড় গাড়তে পারেনি সেখানকার উষর মাটিতে। সেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে শিক্ষাপ্রাপ্ত জিয়াউর রহমান এবং হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ পাকিস্তানী ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে বাংলাদেশে ফৌজী একনায়কত্ব চালিয়েছিলেন প্রায় পনেরো বছর। কিন্তু এ দেশের সেনাবাহিনী যেহেতু দূর থেকে আসেনি, বরং গড়ে উঠেছে আমাদেরই আত্মীয়স্বজন দিয়ে, সে জন্যে তা আইয়ুবী নির্যাতনের চেহারা নিতে পারেনি। অথবা স্থায়ীও হতে পারেনি। সেনাবাহিনী এখনো দেশের শাসনব্যবস্থায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, গত পনেরো বছর ধরে শিশু গণতন্ত্ৰ হাঁটি-হাঁটি পা পা করে চলতে শুরু করেছে, যদিও দলগুলো এখনো চলে নেতার মর্জিমাফিক। নেতৃত্ব গড়ে ওঠে বংশীয় ধারায়। কাজেই এ দেশের গণতন্ত্র এখনো কাৰ্যত নির্বাচিত একনায়কত্ব। এ দেশের রাষ্ট্রপতির চাকরিও নির্ভর করে ক্ষমতাসীন দলের একজন ব্যক্তির ওপর। কোনো রাষ্ট্রপতি দলতন্ত্রের উর্ধে উঠে খানিকটা নিরপেক্ষতার ভান করলেও তার চাকরি চলে যায়। তবে এই একনায়কত্ব সত্ত্বেও কোনো নেতা সাধারণ নির্বাচনকে একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারছেন না। নির্বাচনের মাধ্যমেই তাদের ক্ষমতায় যেতে হয়। কারচুপি করে যাতে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায়, তার জন্যে তাদের কলকাঠি নাড়তে হয়। তা ছাড়া, যতো দুর্বল হোক গণতন্ত্র, তাকে উল্টে দিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করছে না। অথবা দখল করতে পারছে না। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতন্ত্র নয়, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। সবাই যে এই পদ্ধতি মেনে নিয়েছেন–এটা নিঃসন্দেহে স্বাধীনতার একটা ইতিবাচক দিক।
এই অমূল্য রাজনৈতিক লাভ ছাড়াও প্রশাসনিক দিক দিয়েও আমাদের পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতার আগে এবং তারপরের এক দশক আমাদের প্রশাসন কাঠামো এতো বিস্তৃত অথবা স্তরবিশিষ্ট ছিলো না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তা এখন ডানেবায়ে, সামনে-পেছনে, উপরে-নিচে ডালপালা মেলেছে। একটা জনবহুল দেশের জন্যে সেটার প্রয়োজনও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তার ফলে এখন প্রশাসন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে–সরকারের সবচেয়ে ধামা-ধরা সমর্থকের পক্ষেও তা বলা অসম্ভব। বরং স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত প্রশাসনের কাছ থেকে যে-কাজ পাওয়া যেতো, এখন তার অনেকটাই পাওয়া যায় না, অথবা অতো সহজে পাওয়া যায় না। বরং স্তর বৃদ্ধির ফলে এখন কাজ সম্পন্ন হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার গতিও হয়েছে মন্থর।
সম্পদের তালিকায় বিশ্বের তাবৎ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে হলেও, পর পর গত পাঁচ বছর পৃথিবীর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ সবার সেরা বিবেচিত হয়েছে। (সেরা কথাটার কী অপব্যবহার!) দুর্নীতির এই বিষাক্ত হাওয়া দেশ অথবা সমাজের একটি ক্ষুদ্র কোণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অফিস-আদালতের চত্বরেও নয়। তা ছড়িয়ে পড়েছে সবচেয়ে বড়ো পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে একেবারে সবার পিছে সবার নিচে যে আছে, তার মধ্যেও । সব পেশায়–সব মানুষের মধ্যে। এক সময়ে রাজনীতি ছিলো সমাজসেবার মতো, একটা মহৎ কাজ। এখন রাজনীতি মানে দুর্নীতি এবং বাহুবল। আগে চিকিৎসকের কাজ ছিলো মানুষের সেবা করা। এখন সেটা হলো মানুষের দুৰ্গতি ভাঙিয়ে ব্যবসা করার সর্বজন-প্ৰশংসিত প্রশস্ত রাজপথ। আইন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকেরা এখন আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেবল টাকা কামাই করার কাজে শশব্যস্ত। বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগ সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। অথচ আইন বলবত করা এবং দুর্নীতি দমন করাই পুলিশের কাজ। তা ছাড়া, আদালতও, বিশেষ করে নিম্ন আদালতগুলো, দুর্নীতির ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি। আর বড়ো আদালত রাজনীতির ছোবলে কালিমা-লিপ্ত হয়েছে।
