বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ— যারা বাংলা গদ্যকে নির্মাণ করেছিলেন, তারা দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার ছিলেন না। খবরের কাগজ পড়েও তারা বাংলা শেখেননি। বরং তাদের ভাষা শিখেই প্রভাবিত হয়েছেন খবরের কাগজের রিপোর্টার। বস্তুত, সংবাদপত্র চিরকাল প্রামাণ্য ভাষাকে অনুসরণ করেছে–সংবাদপত্র প্রামাণ্য ভাষা গড়ে তোলেনি।
আমার আশঙ্কা হচ্ছে: লেখাপড়া থেকে আরম্ভ করে সবকিছু যখন নিম্নমুখী, তখন ভাষাও উল্টো পথে চলতে শুরু করবে। অর্থাৎ যোগ্য লেখকরা ভাষাকে নতুন পথ দেখাবেন না, বরং মাঝারি সাংবাদিক ভাষাকে অধঃপথে নিয়ে যাবেন। খবরের কাগজের এই ভাষা সব ধরনের ভাষাকেই ধীরে ধীরে প্রভাবিত করবে। খবরের কাগজের ভাষা দিয়ে নব্য ঔপন্যাসিক তার উপন্যাস লিখবেন। সংবাদপত্রের ভাষাকেই অনুসরণ করবেন শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ। গুরুগম্ভীর শব্দ এবং সমাসবদ্ধ পদ উধাও হয়ে যাওয়ার ফলে বাংলা ভাষার যে-প্রকাশক্ষমতা, পৌরুষ এবং সৌন্দর্য ছিলো, তা হ্রাস পাবে। এলিয়ে-পড়া এবং কাব্যিক পদক্রমই প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হবে। এর দরুন সবচেয়ে ক্ষতিগ্ৰস্ত হবে প্ৰবন্ধের ভাষা।
খবরের কাগজী মেরুদণ্ডহীন ভাষা দিয়ে কোনো মতে একটা খবর যদি বা প্ৰকাশ করা যায়, একটা প্ৰবন্ধ, বিশেষ করে কোনো গুরুগম্ভীর বিষয়ে, লেখা যায় না। আমার ধারণা, বঙ্কিমচন্দ্রের আরও কিছুকাল বেঁচে থাকা প্রয়োজন ছিলো। অতো কম বয়সে মরে গিয়ে তিনি আমাদের ভাষাকে মেরে গেছেন। তিনি যেমন বাংলায় গল্প লেখার অসাধারণ ভাষা নির্মাণ করেছিলেন; তেমনি প্রবন্ধের ভাষাও তার হাত ধরেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছিলো। এমন কি, তিনি যখন তাঁর ব্যঙ্গাত্মক রচনাগুলো লিখেছেন, তখনো বুদ্ধিদীপ্ত ভাষাকে তরল করে ফেলেননি। স্থূলতারও আশ্রয় নেননি। বরং শব্দচাতুর্য দিয়ে পাঠকের মন রাঙিয়েছেন। প্রবন্ধের একটা ঋজু এবং দৃঢ় কাঠামোও তিনি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর প্রবন্ধে যেমন বিষয়বস্তু সম্পর্কে তথ্য এবং বিশ্লেষণ থাকতো, তেমনি তার মধ্যে দেখা যেতো তাঁর একেবারে নিজস্ব স্টাইল।
রবীন্দ্ৰনাথ বাংলা ভাষায় পরিবর্তন এনেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়েও বেশি। তিনি তাকে যে-সরলতা এবং সৌন্দৰ্য দান করেছিলেন, সেটাই অতঃপর অন্য লেখকরা গত আশি নকবুই বছর ধরে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু তিনি সাহিত্যের অন্যান্য ধারার প্রভূত উন্নতি করলেও, আমার ধারণা, পরোক্ষভাবে প্রবন্ধ সাহিত্যকে দুর্বল করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্ৰ প্ৰবন্ধকে যে-কাঠামো এবং দৃঢ়তাপূর্ণ ভাষা দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাকে অনেকটাই দুর্বল করে ফেলেছিলেন। তাঁর চলিত রীতির গদ্য এবং ব্যক্তিগত ও কাব্যিক প্ৰবন্ধ লেখার স্টাইল দিয়ে বাংলা প্ৰবন্ধ সাহিত্যকে উন্নতির পথ থেকে বিচলিত করেছিলেন। তবে অসামান্য প্ৰতিভাবান লেখক হিশেবে তিনি তার ভাষা এবং স্টাইল দিয়ে যা পেরেছিলেন, কম ক্ষমতাশালী লেখকের জন্যে তা ছিলো চোরাবালিতে পা দেওয়ার মতোন। বাংলা আনুষ্ঠানিক ভাষা এখন সেই চোরাবালিতেই ডুবে যাচ্ছে।
প্রমথ চৌধুরী লিখেছিলেন, কলমের ভাষাকে মুখে দিলে মুখে কালি লেগে যায়। তাঁর এ কথার মধ্যে সত্য আছে ঠিকই, কিন্তু এর পুরোটা সত্য নয়। তিনি নিজেও সত্যিকার মুখের ভাষায় লিখতে পারেননি। অথবা তিনি যে-ভাষায় লিখেছিলেন, তা সম্পূর্ণ বর্জন করে তিনি প্রতিদিন কথাবার্তা বলতে পারেননি। আসলে মানুষ একএকটা পরিবেশে এক একটা ভাষায় কথা বলে। পরিবার-পরিজনের মধ্যে প্রতিদিন যে-কাজের ভাষা ব্যবহৃত হয়, বন্ধুদের সঙ্গে মননশীল আলোচনায় সে ভাষা চলে না। একটা খবর যা দিয়ে বলা যায়, সে ভাষায় একটা তত্ত্ব আলোচনা করা যায় না। যেভাষায় গল্প লেখা যায়, তা দিয়ে দার্শনিক প্ৰবন্ধ রচনা করা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক কালে বঙ্কিমচন্দ্ৰ অথবা রবীন্দ্রনাথের মতো কোনো শিল্পী আমাদের পথ দেখাচ্ছেন না। সাধারণ পাঠকও এখন আর প্রামাণ্য সাহিত্য পড়েন না। স্কুলকলেজেও ভাষা শিক্ষার মান নিচে নেমে গেছে। সাধারণ মানুষ যা এখনো মাঝেমধ্যে পড়েন, তা হলো সংবাদপত্র। ফলে সংবাদপত্রের ভাষাকেই তারা আদর্শ ভাষা হিশেবে গ্রহণ করছেন। সৎ সংবাদপত্র চিরদিনই একটা সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছে। আমার বিশ্বাস, বাংলা ভাষার মান যখন লক্ষণীয়ভাবে নেমে যাচ্ছে, সেই সংকটের সময়ে সংবাদপত্রের উচিত ভাষাকে আবার খানিকটা শক্তি দেওয়া; আনুষ্ঠানিকতা দেওয়া; এবং বানানকে প্রামাণ্য রূপ দেওয়া।
(দৈনিক স্টেটসম্যান, ফেব্রুয়ারি, ২০০৬)
২৮. স্বাধীনতার লাভ লোকসান
প্রতিদিন যেসব নতুন ঘটনা ঘটে, তার প্রতিবেদন থাকে খবরের কাগজে। সেসব ঘটনার প্রতিটি আলাদা, তাদের চরিত্রও আলাদা। কিন্তু বছর ঘুরে গেলে সেই আলাদা-আলাদা ঘটনাগুলো মিলে একটা কোলাজ তৈরি হয়। তার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে একটা সামগ্রিক প্রবণতা। সেই প্রবণতা, সেই প্যাটার্ন নিয়ে আলোচনা করা ইতিহাসকারের কাজ। সেই সামগ্রিক ঘটনাবলীর মূল্যায়নও ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পর যাদের জন্ম হয়েছে, তাদের বয়স এখন ৩৫। আর, লড়াই করে যারা দেশকে স্বাধীন করেছিলেন তাঁরা এখন বৃদ্ধ– অনেকেই মৃত। একটা মূল্যায়ন করার জন্যে সময়ের যে-দূরত্ব প্রয়ােজন, তা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতা আসায় কি পেয়েছি, কি পাইনি–তার হিশেবে খানিকটা মেলানো এখন সম্ভব। খানিকটা বলছি। এই জন্যে যে, কিভাবে পাকিস্তান গড়ে উঠলো দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে এবং তারপর কিভাবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থানের ফলে আবার পাকিস্তান ভেঙে গেলো, দূর থেকে তাকালে সেটা প্রায় জ্যামিতিক ধারাবাহিকতার মতো লক্ষ্য করা যায়। অপর পক্ষে, বাংলাদেশ হবার ফলে যেসব লাভ-লোকসান হয়েছে, সেগুলো এখনো অতোটা স্পষ্ট নয়, তার কারণ আমরা তারই মধ্যে এই মুহূর্তে ডুবে আছি।
