চলিত রীতির বাংলায় কেবল ক্রিয়া-বিভক্তি এবং সর্বনামগুলোই সাধু ভাষা থেকে ভিন্ন নয়। সাধু ভাষার অনেক শব্দও চলিত ভাষায় অচল। তাই সাধু ভাষার যুগ শেষ হওয়ার ফলে অসংখ্য শব্দ অপ্রচলিত শব্দ হিশেবে অব্যবহার্য হয়ে গেছে। তা ছাড়া, সাধারণভাবে বলা যায়, চলিত ভাষার চরিত্রও তরল। এই দুই লক্ষণ মিলে বাংলা ভাষার প্রকাশক্ষমতা কমেছে বলেই ধারণা হয়। সৌন্দৰ্যও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথের মতো অতুলনীয় শিল্পীর হাতে বাংলা ভাষা সরল হয়েও, তার সৌন্দর্য এবং প্রকাশক্ষমতা বজায় রাখতে পেরেছিলো। কিন্তু তাঁর পরে অসংখ্য সাধারণ লেখকের হাতে পড়ে চলিত রীতির বাংলা ভাষা অতীতের অর্জনকে ধরে রাখতে পেরেছে কিনা, তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন করা যেতে পারে। অন্তত সাম্প্রতিক কালের বাংলা গদ্য–বিশেষ করে খবরের কাগজের গদ্য পড়ে এ কথা মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
কলকাতার খবরের কাগজের ভাষা পড়লে, বিশেষ করে সে ভাষার পদক্রম দেখলে, ধারণা হয় যে, এলিয়ে-পড়া সেই গদ্যের কোনো মেরুদণ্ড নেই। তিনবার কাশলেন রাজ্যপাল–এটি কোনো সংবাদ-শিরোনামে আমি পড়িনি, কিন্তু বেশির ভাগ শিরোনামই এ রকম। “কোটে আত্মসমৰ্পণ করতে ফোন নেতার”–এ বাক্যটি আমার বানানো নয়, পত্রিকা থেকেই উদ্ধৃত করেছি। একবার পড়ে এর অর্থ উদ্ধার করতে হলে রীতিমতো প্রতিভার প্রয়ােজন। “সরকারী গাড়িতেই বেশি দূষণ, মানলেন সুভাষ”, “চাপে পড়েই দেশে ফেরার প্রস্তাব দাউদের” ইত্যাদি বাক্য অথবা অনুবাক্য দুর্বোধ্য হওয়ার কারণ পদক্রমের সাধারণ নিয়ম লঙ্ঘন। কাব্যে এ ধরনের পদক্রম সব সময়ই চলে। গদ্যেও বৈচিত্ৰ্য বাড়ানোর জন্যে মাঝে-মাঝে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেটাই বারবার ব্যবহার করলে তা মুদ্রাদোষে পরিণত হয়। আচার দিয়ে খাদ্যকে আমরা সুস্বাদু করতে পারি। কিন্তু শুধু আচার খাদ্য বলে বিবেচিত হতে পারে না।
কেবল শিরোনাম নয়, অনেক সময় বাক্যগঠনেও শৈথিল্য লক্ষ্য করি। যেমন, “কাশীর সমস্যার সঙ্গে দাউদ প্রত্যার্পণের বিষয়টিকে সরাসরি যুক্ত না করলেও, সুযোগ পেলেই আন্তর্জাতিক মহলকে বিদেশ মন্ত্রক যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিয়েছে।”— বাক্য হিশেবেই এটি ত্রুটিপূর্ণ–এর অর্থ হয় না। কিন্তু কলকাতার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোয় এ ধরনের বাংলা লেখা হচ্ছে। আর-একটি অসাধারণ জিনিশ লক্ষ্য করি সংখ্যার সঙ্গে টা, টি, জন ইত্যাদি সংখ্যাচক বিভক্তি ব্যবহার না-করার প্রবণতা। ফলে “নিহত ৩, আহত ২”, “৫ পুলিশ বরখাস্ত”-এর মতো অদ্ভুত প্রয়োগ লক্ষ্য করি। এটা ইংরেজি, বাংলা নয়। বর্তমান কলকাতার পত্রিকায় যে-ভাষা। ষাটের দশক থেকে গড়ে উঠেছে, এক কথায় বললে, তার প্রকাশক্ষমতা সীমিত। সে গদ্যের চরিত্র উচ্ছাসপূর্ণ, ফেনানো, কাব্যিক। শব্দ ব্যবহারের কথা বললে তাতে ক্রমবর্ধমান হিন্দীর প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়।
কলকাতার টেলিভিশনেও এ ধরনের ভাষায় বাংলা খবর শুনতে পাই। খবরের কাগজের তুলনায় টেলিভিশনের ভাষা সাধারণত মুখের ভাষার আরও কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু সে ভাষাকে ক্রমশ নিম্নগামী হতে দেখে বিষন্ন না-হয়ে পারিনে। বিলেতের টেলিভিশনে দেখতে পাই, নাট্যানুষ্ঠান অথবা সোপ অপেরায় একেবারে সাধারণ মানুষের ভাষাও ব্যবহৃত হয়। এমন কি, খবরের মধ্যেও যখন সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকার থাকে, তাতেও শোনা যায় এ ভাষা। কিন্তু মূল খবরের ভাষা হলো প্রামাণ্য চলিত ভাষা। তার উচ্চারণও প্রামাণ্য–আঞ্চলিক নয়। ডকুমেন্টারি সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য। পোশাকের সঙ্গে তুলনা করে বলতে পারি, বাড়িতে লুঙ্গি পরা যায়, কিন্তু বাইরে যেতে হলে প্যান্ট-শার্ট পরতে হয়। একজন অপরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তার ওপর টাই না-হোক অন্তত একটা কোট চাপাতে হয়। আর চাকরির সাক্ষাৎকারে যেতে হলে সুট পরে যেতে হয়। খবরের ভাষা–তা লেখ্য মাধ্যম, অথবা ইলেট্রনিক মাধ্যম যাতেই হোক না কেন–তাকে খানিকটা আনুষ্ঠানিক ভাষা হতে হয়। প্রবন্ধের ভাষা হতে হয়। সবচেয়ে ফর্ম্যাল। শিবনারায়ণ রায় অথবা মুনীর চৌধুরীর মতো লেখকরা প্রবন্ধের ভাষায় সেই আনুষ্ঠানিকতা অনেকটাই বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সংবাদ মাধ্যম ভাষাকে অতি তরল করে দিয়েছে।
চলিত বাংলা প্রথম প্ৰচলিত হয়েছিলো কলকাতাতেই। এই বিবর্তনকে গ্ৰহণ করার ব্যাপারে পূর্ব বাংলা ছিলো পিছিয়ে। এখন চরিত্ৰহানির যুগেও কলকাতা সামনে এগিয়ে আছে, ঢাকা আছে খানিকটা পিছিয়ে। কিন্তু ঢাকা যে কলকাতাকে অনুসরণ করে একই পথে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে বিশেষ সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের শিরোনামেও সংখ্যাবাচক এবং তারিখবাচক বিভক্তি লোপ পেয়েছে। তবে ঢাকার ভাষা এখনো কলকাতার মতো অতোটা “আধুনিক” হতে পারেনি। বাংলাদেশের খবরের কাগজের ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তাতে কলকাতার দোষগুলোকাব্যিক পদক্রম, অতি-চলিত শব্দ (স্ল্যাং), সংখ্যাবাচক বিভক্তি লোপ–ইত্যাদি। তুলনামূলকভাবে কম হলেও এগুলো ক্রমশ জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। তা ছাড়া, ঢাকাই সংবাদপত্রের ভাষায় আছে সংস্কৃত ও আভিধানিক পরিভাষা, আরবি-ফারসির অত্যধিক ব্যবহার এবং আঞ্চলিক শব্দ ও প্রয়োগের ছড়াছড়ি। তবে এক কথায় বলা যায়, ঢাকার পত্রিকার ভাষা কলকাতার মতো ফেনানো নয়; তাতে সাধু ভাষার প্রভাব এখনো খানিকটা রয়ে গেছে এবং পদক্রম এখনো অতোট এলিয়ে পড়েনি। কিন্তু ঢাকার সংবাদ মাধ্যমও কলকাতার মতো “আধুনিক” হয়ে উঠতে প্ৰাণপণ চেষ্টা করছে।
