এমন কি, মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় যে-বাংলা শেখানো হয়, তাও যথেষ্ট নয়। যারা বাংলা শেখানোর দায়িত্বে নিয়োজিত, তাঁরা নিজেরাই কথা বলেন আঞ্চলিক ভাষায় এবং আঞ্চলিক উচ্চারণে। এই শিক্ষকদের অনেকে সঠিক বানানে একটা ছোটো রচনা লিখতে পারবেন। কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এবং পরীক্ষার মূল্যায়নের পদ্ধতিও খুবই পুরোনো। এমন কি, যে-সব পাঠ্যপুস্তক সরকারী উদ্যোগে লিখিত হচ্ছে, তার ভাষা এবং বানানও অস্থির। অনেক ক্ষেত্রে এই ভাষা হলো পারিভাষিক, আঞ্চলিক, অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ এবং সাধু ভাষার এক অবিশ্বাস্য মিশ্রণ। এর মধ্যে যদি কিছু দেখা যায়, তা হলে তা হলো: ভাষাকে বাংলাদেশীকরণের একটা সক্রিয় প্ৰয়াস।
তা ছাড়া, বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে যে-সূক্ষ্ম এবং স্কুল সাম্প্রদায়িকতা লক্ষ্য করা যায়, তা থেকেও ছাত্রছাত্রীরা ভুল শিক্ষা পায়। বাংলা পাঠ্যপুস্তকের গোড়াতেই যদি থাকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে একটি রচনা, তা হলে অমুসলমানরা সে বিষয় পড়তে কেন আগ্রহী হবে, আমি যুক্তি দিয়ে তা বুঝতে পারিনে। এমন রচনা কি থাকতে পারে না, যা সকল ধর্মাবলম্বী পড়তে পারে এবং তা পড়ে ভাষা শিখতে পারে? বাংলা ভাষার পাঠ্যবই বিশ্লেষণ করলে সন্দেহ হয়, তা ধর্ম শেখানোর বই, না ভাষা শেখানোর। এসব পাঠ্যবইয়ে যেসব গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ নির্বাচিত হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই নিকৃষ্ট মানের। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা কেবল যে ভালো বাংলা শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাই নয়, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের অমূল্য ঐহিত্য সম্পর্কেও সচেতন হতে পারে না। এসব পাঠ্য বইয়ে যে ইতিহাস বিকৃতি লক্ষ্য করা যায়, তা যেমন নির্লজ্জ, তেমনি ন্যক্কারজনক। পাছে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকে, সে জন্যে বলছি: ন্যক্কারজনীক শব্দটার মানে হলো–যা থেকে বমি আসে।
আমাদের মনে রাখা দরকার যে, মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। মাতৃভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষ কেবল যে সুস্থ আবেগ প্রকাশের ভাষা শেখে তাই নয়, কোনো শিক্ষা কার্যকরভাবে দিতে হলে তা দেওয়া দরকার মাতৃভাষারই মাধ্যমে। তা ছাড়া, মাতৃভাষা নিয়ে যে গর্ব করতে পারে না, সে নিজের পরিচয়কেই অস্বীকার করে। আমাদের দেশের মাইকেল মধুসূদনরা নিজেরা ভুল করে এই সত্যের দৃষ্টান্তই রেখে গেছেন। এখন নতুন করে ভুল করে সত্যের অনুসন্ধান করার দরকার নেই। আমরা যদি কেবল নিজেদের ভাষাকে ভালো না-বেসে, মাতৃভাষাকেই শ্রদ্ধা জানাতে পারি, তা হলেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা সাৰ্থক হবে। তার জন্যে বাংলার সঙ্গে অন্যান্য ভাষার চর্চা বৃদ্ধি করা আবশ্যিক। নয়তো, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আমাদের গর্ব হবে নিতান্ত ফাঁপা, অর্থহীন।
(যুগান্তর, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬)
২৭. ভাষার চরিত্ৰহানি
জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর টাকাকড়ি রেখে গিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষার বানান সংস্কারের জন্যে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময় চলে গেছে। তবু কেউ ইংরেজি বানান সংস্কার করেননি, অথবা করতে পারেননি। তার কারণ, ভাষার পরিবর্তন সম্পর্কে সবাই কমবেশি রক্ষণশীল। কিন্তু এ রক্ষণশীলতা সত্ত্বেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার বিবর্তন হবে–এটা না-মেনে উপায় নেই। জীবন্ত ভাষা কোথাও দাঁড়িয়ে থাকে না। নিরন্তর তার মধ্যে ঘটতে থাকে পরিবর্তন। তবে বিবর্তন মাত্ৰই যে উন্নতি, সে কথা বলা যায় না। বাংলা ভাষায়, বিশেষ করে বাংলা গদ্যে, গত এক শো বছরে যে-পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তা সত্যিকার অর্থেই যুগান্তকারী। যুগান্তকারী, কারণ এ সময়ে সাধু ভাষার যুগ শেষ হয়ে চালু হয় চলিত ভাষার যুগ। তাই বলে এই এক শতাব্দীতে বাংলা ভাষা কি কেবলই সামনের দিকে এগিয়েছে?
বাংলা ভাষায় যুগান্তর আনায় প্রধান ভূমিকা ছিলো রবীন্দ্রনাথের। চলিত ভাষার প্রতি গোড়া থেকেই তার পক্ষপাত ছিলো। একেবারে প্রথম যৌবনে ইউরোপ থেকে যে-চিঠিগুলো তিনি লিখেছিলেন প্রকাশের জন্যে, তা লিখেছিলেন চলিত ভাষায়। ছিন্নপত্রের চিঠিগুলোও। কেবল চিঠি নয়, ১৮৯০-এর দশকে তিনি গল্পগুচ্ছের ভাষায় ক্রিয়া-বিভক্তিগুলো সাধু ভাষায় লিখলেও, সর্বনামে পরিবর্তন আনতে আরম্ভ করেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং খ্যাতি যখন তুঙ্গে, তখন প্রমথ চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় তাঁর সব রচনাই তিনি লিখতে আরম্ভ করেন চলিত বাংলায়। পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে তাঁর এই ভাষাই প্রামাণ্য বাংলা হিশেবেই গৃহীত হয়। রবীন্দ্রনাথ একাই ছিলেন এক শো। তাঁর অতুলনীয় প্রতিভা দিয়ে তিনি যা কিছু স্পর্শ করেছেন, তাকেই নতুন জীবন দিয়েছেন। সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, চিত্রকলা ইত্যাদি সম্পর্কেই এ কথা প্রযোজ্য নয়, এ কথা পুরোপুরি সত্য বাংলা ভাষা সম্পর্কেও। জ্ঞাতে অজ্ঞাতে আমরা তাঁর ভাষায় কথা বলি, তার ভাষাতে লিখি এবং তার ভাষাতে চিন্তা করি। বাংলা ভাষার বিবর্তনে যদি ব্যক্তির অবদানের কথা বলতে হয়, তা হলে যে-দুজনের নাম সবার আগে মনে পড়বে তাঁরা হলেন বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ। তবে সাধু ভাষার যুগ শেষ করে একেবারে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এঁরা দুজনেই ছিলেন অসামান্য শক্তির অধিকারী। অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন। বহুজনের অবদানে ভাষায় যে-বীর পরিবর্তন আসে, তাদের আনা পরিবর্তন সে প্রকৃতির নয়। তাঁরা বাংলা ভাষায় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য, এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মতোন দুজন শিল্পী। তাঁদের পথ অনুসরণ করে আমরা বাংলা ভাষাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু বাংলা ভাষায় গত পঞ্চাশ বছরে যে-নেতৃত্ব লক্ষ্য করছি, তা মধ্যম শ্রেণীর লোকেদের। তার ফলে বাংলা ভাষা তার উর্ধ্বগতি অক্ষুন্ন রাখতে পারছে কিনা, আমাদের প্রশ্ন সেটাই।
