মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইণ্ডিয়ানরা অনেকগুলো ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু এসব ভাষা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। তেমনি, এস্কিমোদের ভাষাগুলোও লুপ্তির পথে। ১৯৯০ সালের হিশেব থেকে দেখা যায়, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দু লাখ বিরাশি হাজার রেড ইন্ডিয়ান ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলতেন। এসব ভাষাভাষীর সংখ্যা এতো কম হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা সমানাধিকারের ভিত্তিতে এসব ভাষা শেখার সুযোগ পান। তবে কালে কালে ইংরেজির চাপের মুখে এসব ভাষা লোপ যাবে–এ প্রায় ভবিষ্যৎ বাণীর মতো বলা দেওয়া যায়।
ভাষিক সংখ্যালঘুদের জন্যে ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা ব্রিটেনেও যথেষ্ট রয়েছে। ওয়েলশ ভাষা একটি ছোটো ভাষা। এই ভাষাভাষীর সংখ্যা এখন ৫০৮,০৯৮। বহু বছর ধরে আস্তে আস্তে এঁদের সংখ্যা কমে যাচ্চিলো। কিন্তু ২০০৩ সালে প্রথম বারের মতো এঁদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হয়। ওয়েলশ ভাষা শিক্ষা করার খুব ভালো ব্যবস্থা আছে। এ ভাষায় পরীক্ষা দেওয়ারও ব্যবস্থা আছে। চাকরিবাকরিতে এই ভাষা জানার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে যে-ভাষা ধীরে ধীরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, সেই ভাষাই আবার নতুন প্ৰাণ লাভ করতে আরম্ভ করেছে। এই ভাষার চর্চা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে রয়েছে ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সহায়তা এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষণা।
একই কথা বলা যায়, ব্রিটেনের অন্যান্য ভাষিক সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে। দৃষ্টান্ত হিশেবে বাংলার কথা বলতে পারি। ব্রিটেনে বাংলাভাষীর সংখ্যা লাখ তিনেকের কিছু বেশি; হিন্দী এবং উর্দুভাষীদের তুলনায় যা অনেক কম। তা ছাড়া, বহু বাঙালি পরিবারে বাংলার কোনো চৰ্চা নেই। তা সত্ত্বেও স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বাংলাকে একটি বিষয় হিশেবে বেছে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এ রকম আরও আঠারোটি ভাষা আছে আধুনিক ভাষাসমূহের তালিকায়। (তার মধ্যে পাঞ্জাবী, হিন্দী, গুজরাটি এবং উর্দুও রয়েছে।) স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বাংলাকে নির্বাচন করে মাত্র হাজার দুয়েক ছাত্রছাত্রী। আর, উচ্চমাধ্যমিক এ লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র শখানেক প্রার্থী। ংলার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এতো কম হওয়া সত্ত্বেও অনেকগুলো মাধ্যমিক স্কুলে বাংলা পড়ানো হয়। বাংলা পড়ানো এবং বাংলায় পরীক্ষা নেওয়ার জন্যে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হয়। কিন্তু তবু তা পড়ানো হয় এবং এ ভাষা জানলে কোনো কোনো চাকরিতে অগ্ৰাধিকারও দেওয়া হয়।
এ ধরনের সরকারী পৃষ্ঠপোষণা সত্ত্বেও, ইউরোপের প্রায় চল্লিশটি ভাষা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। দক্ষিণ অ্যামেরিকায় লুপ্ত হতে চলেছে প্রায় পৌনে চার শো ভাষা। এক সময়ে আফ্রিকায় বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর প্রায় দু হাজার ভাষা প্রচলিত ছিলো। কিন্তু ব্যাপক উপনিবেশ গড়ে ওঠার মূল্য দিতে গিয়ে শত শত ভাষা লোপ পেয়েছে। এখন সেখানে চোদ্দো শো ভাষা টিকে আছে; তবে বেশির ভাগই নামে মাত্র। অতীতে জুলু ভাষা ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকার একটি বড়ো ভাষা। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যে-ভাষা, তার নাম আফ্রিকানার। এ ভাষা হলো স্থানীয় ভাষার সঙ্গে সামান্য সমন্বয়ের ফলে উপনিবেশ স্থাপনকারী ডাচদের যে-ভাষা তৈরি হয়েছে, সেই ভাষা। স্থানীয় ভাষাগুলোর বদলে ফরাসি ভাষাও প্রচলিত হয়েছে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে। তা ছাড়া, নাইজেরিয়ার মতো দেশে প্রচলিত হয়েছে পিজিন ইংরেজি। খোদ আফ্রিকার ভাষার মধ্যে যেভাষাগুলো জোরের সঙ্গে টিকে আছে, সেগুলো কোনো একটি দেশের ভাষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভাষা। এগুলো হলো: আরবি, সোয়াহিলি আর হাউসা। এরা স্থানীয় ভাষাগুলোকে বিলীন করে দিয়েছে। তবে দুৰ্দশা সত্ত্বেও এখনো অনেকগুলো স্থানীয় ভাষা শেখার ব্যবস্থা আছে— স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সাম্প্রতিক কালে জাতীয়তাবাদের উত্থানই নয়, বিশ্বায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদ বিচ্চার লাভের ফলেও ইংরেজি, চীনা অথবা আরবির মতো আন্তর্জাতিক ভাষা ক্রমবর্ধমান মাত্রায় গুরুত্ব লাভ করছে। বাংলাদেশও এ ব্যাপারে। কোনো ব্যতিক্রম নয়। সেখানে শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এখন বাংলার বদলে ইংরেজি শিখতে চেষ্টা করছে। এরা ইংরেজি স্কুলে লেখাপড়া করতে গিয়ে মৌখিক ইংরেজি ছাড়া সত্যিকার ইংরেজি ভাষা কতোটুকু শিখছে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে; কিন্তু তারা যে বাংলা যথেষ্ট শিখছে না, সে সম্পর্কে সন্দেহ নেই। সরকারী কর্মকর্তা-সহ বয়স্ক লোকদের মধ্যেও অনেকে যে-ভাষায় কথা বলেন, তা ভুল। ইংরেজি এবং ভুল বাংলার একটা জগাখিচুড়ি।
ইসলামী সাম্রাজ্যবাদ এবং মৌলবাদ প্রসার লাভ করার ফলেও বাংলাদেশে বাংলা ভাষার চর্চা হ্রাস পাচ্ছে। একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিশেবে স্বাধীন হলেও, স্বাধীনতার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থে বাংলাদেশে মাদ্রাসার প্রসার ঘটেছে মূলধারার স্কুল-কলেজের তুলনায় অনেক বেশি। দাবি করা হয় যে, এসব মাদ্রাসায় বাংলাইংরেজি-বিজ্ঞান ইত্যাদিও পড়ানো হয়। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, সেখানে আসলে জোর দেওয়া হয়। ধ্রুপদী আরবিতে কোরান-হাদিস শিক্ষার প্রতি। এমন কি, মাদ্রাসার ছাত্ররা আধুনিক আরবিও শেখে না। চলতি আরবি তো নয়ই। কিন্তু মৃত ধ্রুপদী ভাষার বদলে জীবন্ত ভাষার চর্চা প্রাত্যহিক জীবনের জন্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত, মাদ্রাসা শিক্ষা-ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না-করে শিক্ষার্থীরা প্রাচীনমুখী শিক্ষা গ্ৰহণ করছে। এর ফলেও বাংলাদেশের তরুণদের একটা বড়ো অংশ বাংলা ভাষা ভালো করে শেখার সুযোগ পাচ্ছে না।
