এই যে অন্যান্য গোষ্ঠীর প্রতি অবজ্ঞা এবং বিদ্বেষের মনোভাব–বাংলাদেশে এটা প্ৰকাশ পেয়েছে নানাভাবে এবং গোড়া থেকেই। আমরা সবাই বাংলায় কথা বলি–এই চেতনার বশবর্তী হয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে আমাদের নাগরিকত্বের নাম দেওয়া হয়েছিলো “বাঙালি”। তার মানে বাংলা যাদের মাতৃভাষা নয়, তারাও এই সংজ্ঞা অনুযায়ী নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে বাধ্য। তা ছাড়া, স্বাধীনতার পর থেকে অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীর প্রতিও সুবিচারের অভাব লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা এবং মগ-সহ অন্যান্য আদিবাসীরা আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে পড়লাম, কিভাবে খাসিয়াদের ওপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে। এই অত্যাচারের শিকার সকল খাসিয়া, তবে বিশেষ করে খাসিয়া মেয়েরা। স্বাধীনতার পর থেকেই চাকমা-অঞ্চলের একটা বড়ো অংশ বাংলাভাষীরা দখল করে নিয়েছেন। কেবল তাই নয়, সরকারী কাজেকর্মে বাংলার ওপর অগ্ৰাধিকার দেওয়ায় শিক্ষা, চাকরিবাকরি ইত্যাদিতেও তারা দেশের নাগরিক হিশেবে নিজেদের ন্যায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন।
বাংলাদেশে তিরিশটিরও বেশি আদিবাসী গোষ্ঠী আছে। এসব গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। নিচের পীঠিকা থেকে বিভিন্ন ভাষাভাষীর সংখ্যা দেখা যাবে।
আদিবাসী ভাষার নাম — ভাষাভাষীর সংখ্যা
চাকমা — ২৫২,২৫৮
সাঁওতালী –- ২০২,১৬১
মার্মা –- ১৫৭,৩০১
ওরাওঁ – প্রায় ১০০,০০০
তিপরা –৭৯,৭৭২
গারো — ৬৪,২৮০
হাজং – ৫০,০০০
মনিপুরী – ২৪,৮৮২
মুরোং – ২২,১৭৮
মুণ্ডা – ১৭,৫০০
রাখাইন – ১৬,৯৩২
মালপাহাড়ী – ৯,০০০
মালো, গাঞ্জ, খাসিয়া ইত্যাদি – ৫০,০০০
উপরের পীঠিকায় যে-সংখ্যা দেখানো হয়েছে, তা ১৯৯১ সালের লোকগণণার হিশেবে অনুযায়ী। তখন আদিবাসীর সংখ্যা ছিলো বারো লাখ। এতো দিনে তা কুড়ি লাখে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়। এঁদের প্রায় শতকরা পঁচিশ ভাগ বাস করেন খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবনে। কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও আদিবাসীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, বিশেষ করে ময়মনসিং, সিলেট, রাজশাহী এবং রংপুরে। তা ছাড়া, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল ইত্যাদি অঞ্চলেও আদিবাসীদের দেখতে পাওয়া যায়।
আদিবাসীদের ওপর সবচেয়ে অবিচার করা হয়েছে তাদের ভাষা শিক্ষার প্রশ্নে। দেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের অধিকার তত্ত্বত সমান। কিন্তু বাংলাভাষীরা তাদের ভাষা শিক্ষার জন্যে যে-ধরনের আর্থিক আনুকূল্য এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা লাভ করেন, আদিবাসীরা তা পান না। এমন কি, বাংলাদেশে বিহারী নামে পরিচিত যে-জনগোষ্ঠী আছে, তাদেরও নিজেদের ভাষা শেখার সুযোগ নেই। কেবল তাই নয়, এখন ঢাকায় উর্দু ভাষায় মুদ্রণের ব্যবস্থা আছে কিনা অথবা উর্দু বইপত্র পাওয়া যাবে কিনা, সে সম্পর্কেও আমি নিশ্চিত নই।
বাংলাদেশের আদিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো গোষ্ঠী হলো চাকমাদের। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেন চাকমা ভাষায়। এ ভাষা যথেষ্ট উন্নত এবং এর নিজস্ব লিপিমালা আছে। মগ ভাষারও লিপি আছে। অথচ এই দুই ভাষায় লেখাপড়া শেখানোর কোনো ব্যবস্থা সরকারের তরফ থেকে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে চাকমা এবং মগরা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় বাংলাকেই প্ৰধান ভাষা হিশেবে গ্ৰহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। চাকমাদের পরেই সবচেয়ে বড়ো ভাষাগোষ্ঠী হলো সাঁওতালী। সেদিক দিয়ে তাদের ভাষাও টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিলো অনেক বেশি। কিন্তু বিরাট সংখ্যক লোক সাঁওতালী ভাষায় কথা বললেও সে ভাষা চর্চা করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তাদের নেই। নেই। এ ভাষা শেখার জন্যে সরকারী কোনো সহায়তা। (যেটকু সহায়তা আছে, তা আসে খৃস্টান মিশনারিদের তরফ থেকে ) বস্তুত, সংখ্যালঘু আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণের জন্যে বাংলাদেশে সরকারী কোনো প্ৰয়াস লক্ষ্য করা যায় না। বরং এসব সম্প্রদায়কে বাংলা শিখতে বাধ্য করা হচ্ছে। সাওতালরাও তাই নিজেদের ভাষা বিসর্জন দিয়ে বাংলা শিখছেন। কয়েক দশক পরে এ ভাষার অস্তিত্ব থাকবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।
সাঁওতালী ভাষার সঙ্গে কোল এবং মুণ্ডা ভাষার ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। এক সময়ে মুণ্ডা ভাষা কতো ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো, তার পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় বাং ভাষায় মুণ্ডা শব্দের প্রাচুর্য থেকে। অথচ সেই মুণ্ডা ভাষা এখন বাংলাদেশ থেকে লোপ পাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পারভেজ শুভর একটি গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, সাতক্ষীরার একটি অঞ্চলে মুণ্ডাভাষীরা এবং কুষ্টিয়ার মীরপুরের কোল ভাষীরা কেউই প্ৰায় তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলেন না। কমবয়সীরা ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা ভুলে যাচ্ছেন এবং লেখাপড়া শিখছেন বাংলা ভাষায়। কেবল বৃদ্ধবৃদ্ধাদের কেউ কেউ এখনো তাদের পুরোনো ভাষা আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষা দুটিরও মৃত্যু হবে–অন্তত বাংলাদেশের ঐ দুটি অঞ্চলে। বেদে এবং রাজবংশীরাও এমনি আদিবাসী। তাদেরও নিজস্ব ভাষা ছিলো। কিন্তু তাঁরা ইতিমধ্যে সেই ভাষা ভুলে গিয়ে বর্তমানে বাংলাতেই কথা বলেন। একটা ভাষা পৃথিবী থেকে লোপ পাওয়ার অর্থ হলো মানুষের ঐশ্বর্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আংশিকভাবে বিলুপ্ত হওয়া।
