বাংলাদেশের ভাষায় যদি কালে কালে স্বাভাবিকভাবে পরিবর্তন আসে, তা হলে সে সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। সেটা কারো পক্ষে ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব হবে না। কিন্তু কোনো সচেষ্ট ষড়যন্ত্রের ফলে যদি বাংলা ভাষার চরিত্র কৃত্রিমভাবে বদলে দেওয়া হয়, তা হলে তা হবে স্বেচ্ছায় আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার সামিল। সত্য বটে, স্বতন্ত্র চেহারার বাংলা চালু হলে কয়েক দশকের মধ্যেই আমরা আমাদের ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবো না। কিন্তু, ধরা যাক, এক শতাব্দী পরে তখনো কি অখণ্ড বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য চালু থাকবে? অথবা রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র অথবা জীবনানন্দ, এমন কি নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন অথবা শামসুর রাহমানের সাহিত্য কেউ পড়বে? অথবা পড়লে তার অর্থ সবটা বুঝতে পারবে?
(প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি, ২০০৬)
২৬. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : গৌরব ও বাস্তব
বাঙালি চরিত্রের মস্ত একটা বৈশিষ্ট্য; ঘরে বসে আসার অহঙ্কার করা। শুনে যতোই খারাপ লাগুক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আমাদের গর্বও আসলে এমনি একটা অসার অহঙ্কার। কারণ, এই দিবসের সঙ্গে বাংলা ভাষার বলতে গেলে কোনো যোগ নেই। জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা-সংস্কৃতি সংস্থা— ইউনেস্কো— একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিশেবে ঘোষণা করে সত্যি সত্যি বাংলা ভাষাকে কোনো বিশেষ মর্যাদা দেয়নি। বাংলার সঙ্গে এ দিবসের একমাত্ৰ যোগাযোগ: একুশে ফেব্রুয়ারি–এই তারিখটার। পূর্ব বাংলায় এই দিনে মাতৃভাষার দাবিতে একটা রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হয়েছিলো, সেই ঘটনার প্রতি স্বীকৃতি জানিয়েই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিশেবে নির্বাচিত হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি–এই দিবসের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ এই পর্যন্ত।
পৃথিবীতে এখনো প্রায় সাড়ে ছ হাজার ভাষায় লোকেরা কথা বলেন। কিন্তু এর মধ্যে তিন হাজার ভাষাই প্ৰধান প্ৰধান ভাষার চাপে হারিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যার অন্তত আংশিক প্রতিকার করার উদ্দেশ্য নিয়ে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে। ইউনেস্কার উদ্দেশ্য ছিলো: এ দিন যাতে পৃথিবীর সকল মানুষ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং মাতৃভাষা যে অমূল্য সম্পদ সে কথাটা উপলব্ধি করেন। তারিখ হিশেবে যাতে একুশে ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হয়, সে জন্যে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন ক্যানাডার দুজন কৃতী বাঙালিরফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম।
তারপর ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্কো প্রতি বছর এই দিনটি উদযাপন করে আসছে। এই উপলক্ষে প্রতি বছর একটি করে পোস্টার প্রকাশ করে ইউনেস্কো। তা ছাড়া, এই প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে একটি বাণীও দেওয়া হয়। ২০০২ সালের পোস্টারটি ছিলো ভাষার বৈচিত্ৰ্য সম্পর্কে। এই পোস্টারে নানা ভাষার হরফ ছিলো। কিন্তু তাতে কোনো বাংলা হরফ ছিলো না। এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক প্রতি বছর যে-বাণী প্ৰদান করেন, তা করেন ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, চীনা এবং রুশ ভাষায়। এমন কি, আরবি ভাষাতেও এ বাণী প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা–বাংলায় একবারও এই বাণী দেওয়া হয়নি। এ থেকেই বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ কতো ক্ষীণ।
আমার ধারণা, খোদ বাংলাদেশেও এ দিবসটির প্রতি সত্যিকারের সম্মান দেওয়া হয় না। অথবা এ দিনটি উদযাপনের পেছনে যে-মহান উদ্দেশ্য ছিলো, তার প্রতিও কোনো শ্ৰদ্ধা দেখানো হয় না। বরং এই শ্রদ্ধাবোধ আরও কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিবাচক ফলগুলোর দিকে যদি নজর দিই, তা হলে প্রথমেই বলতে হয় একদিন রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের লোকেরা নিজেদের মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করেছিলেন। তার প্রথম ফলই হয়েছিলো বাংলা ভাষা সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানদের মনে যে-দ্বিধা এবং বিদ্বেষ ছিলো, তা দূর হয়ে যায় এবং তাঁরা বাংলা ভাষাকে নিজেদের ভাষা হিশেবে ভালোবাসতে আরম্ভ করেন। কেবল তাই নয়, নিজেদেরও তারা শনাক্ত করেন বাঙালি বলে। সেই সচেতনতা থেকেই–বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়— মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাঙালি মুসলমানরা স্বদেশে ফিরে আসেন। তা ছাড়া, এই আন্দোলনের ফলে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিশেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং তার চর্চা অনেক বৃদ্ধি পায়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ: এই আন্দোলন থেকে যেভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে, তা-ই শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়। একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা হিশেবে এখন বাংলাদেশে ংলা ভাষার চর্চা ক্ৰমাগত বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায় এবং এ ভাষা হয়তো পৃথিবীর ভাষা-মানচিত্রে কালে কালে বাংলাদেশের ভাষা হিশেবেই টিকে থাকবে।
সে দিক থেকে বিবেচনা করলে ভাষা আন্দোলনের অর্জন অসীম। কিন্তু এর যে কোনো নেতিবাচক ফল হয়নি, তা নয়। ভাষার সঙ্গে জাতীয়তাবাদের একটা ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৮ জন লোকের মাতৃভাষাই বাংলা। এ রকম এক-ভাষী জাতির মধ্যে যেমন এক ধরনের ঐক্য এবং সংহতির মনোভাব তৈরি হয়, তেমনি এই পরিবেশে সংখ্যালঘু ভাষাগোষ্ঠীর লোকেদের পক্ষে তাদের ভাষিক পরিচয় বঁচিয়ে রাখা শক্ত হয়। তা ছাড়া, এর ফলে জন্ম নিতে পারে এক ধরনের অন্ধ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ। সে রকমের জাতীয়তাবাদের তোড়ের মুখে দেশে কেবল ভাষিকসংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নয়, ধর্মীয় এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতিও অসহিষ্ণুতার মনোভাব দানা বঁধতে পারে। তাদের ওপর অবিচার হওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। যেমন হয়েছিলো, ধরা যাক, হিটলারের জর্মেনিতে। বাংলাদেশেও গত তিন দশকে ভাষিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি অসহিষ্ণুতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের পরিচয়কে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
