এমন কি, ত্রিপুরা, অসম, মেঘালয়, ওড়িষা এবং বিহারে যে-বাঙালিরা বাস করেন, বিশেষ করে ত্রিপুরা এবং অসমে, তার সঙ্গেও কলকাতার ভাষার পার্থক্য দেখা দেবে বলে মনে করাই সঙ্গত। ভারতের এসব রাজ্যের ভাষায় বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দূরে অবস্থিত ত্রিপুরা এবং অসমের ভাষায় বাংলাদেশের ভাষার প্রভাবও যথেষ্ট মাত্রায় পড়তে পারে। তা ছাড়া, এসব জায়গায় যে-সাহিত্য গড়ে উঠবে, তাতে সেখানকার জীবনযাত্রা ক্রমবর্ধমান মাত্রায় স্থান পাবে।
ভাষার পার্থক্য কতোটা হবে, তা নিয়ে আমরা আপাতত কেবল আন্দাজ-অনুমান করতে পারি। কিন্তু সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে যে পার্থক্য দেখা দেবে, সে সম্পর্কে জল্পনাকল্পনা না-করেই বলতে পারি, তা হবে ব্যাপক। কলকাতায় গত দু শো বছরে যে-সাহিত্য রচিত হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করি প্রধানত হিন্দু-জীবনের প্রতিফলন। অপর পক্ষে, এখন বাংলাদেশে যে-সাহিত্য রচিত হচ্ছে, তার মধ্যে মুসলিম-জীবন প্রাধান্য পাবে, বলাই বাহুল্য। দেশবিভাগের ঠিক পরে পূর্ববাংলায় হিন্দুদের সংখ্যা ছিলো মোট জনসংখ্যার শতকরা প্ৰায় তিরিশ ভাগ। কিন্তু এখন সে সংখ্যা দশ ভাগের এক ভাগ। কেবল তাই নয়, ডানপন্থী সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের ফলে দেশ থেকে যেভাবে হিন্দুরা চলে যাচ্ছেন, তাতে এখনকার তুলনায় হিন্দুদের অনুপাত আরও কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। এবং তা হলে, বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে যেটুকু হিন্দুমুসলমানের মিলিত জীবন প্রতিফলিত হচ্ছে, তার পরিমাণ আরও কমে যাবে বলে মনে হয়। মোট কথা, আগামী পঞ্চাশ-একশো বছরে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের দুটি স্বতন্ত্র ধারা প্রবাহিত হবে বলেই ধারণা করি। এবং এই দুই ধারার মধ্যে বাংলাদেশের ধারাই যদি তখন বেশি জোরদার হয়, তা হলেও অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না।
এক শো বছর আগে যখন প্রথম বারের মতো বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়, তখন রবীন্দ্রনাথ আশঙ্কা করেছিলেন যে, বঙ্গদেশকে একটি হিন্দু-প্রধান এবং একটি মুসলমান-প্রধান অংশে বিভক্ত করলে কালে কালে দুই বাংলায় অখণ্ড বাংলাভাষা নাও থাকতে পারে। শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীন পূর্ববঙ্গের নাম দেন বাংলাদেশ, তখন তিনি ঠিক কী ভেবেছিলেন, জানা যায় না। তবে তাঁর মনে হয়তো এমন ক্ষীণ আশা ছিলো যে, কালে কালে সে দেশ হবে তাবৎ বাংলাভাষীদের দেশ। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ যে এক কালে কেবল বাঙালি মুসলমানদের দেশে পরিণত হবে অথবা সেখানে একটা ভিন্ন ধরনের বাংলা ভাষা তৈরি হবে এবং তার ফলে দুই বাংলা স্থায়ীভাবে আলাদা হয়ে যেতে পারে–এটা তিনি নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারেননি।
আপাতত বাংলাদেশের অনেকে এই সম্ভাবনার কথা ভেবে আশঙ্কিত না-ও হতে পারেন। তারা ভাবতে পারেন, ভালোই তো, বাংলাদেশে একটা বাংলাদেশী ভাষা তৈরি হবে! কিন্তু এর ফলে যে-অপূরণীয় ক্ষতি হবে, দূরদৃষ্টির অভাবে সেটা তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না। তারা হয়তো ভাবতে পারছেন না যে, বাংলাদেশের ভাষা যদি মূল ভাষা থেকে যথেষ্ট মাত্রায় বদলে যায়, তা হলে এ দেশের লোকেরা তাদের ঐশ্বর্যমণ্ডিত সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবেন। পূর্ব পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর নানাভাবে পূর্ব বাংলার ভাষাকে মূলধারার বাংলা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছিলো। তার মধ্যে দুটি প্রয়াসের কথা এখানে বলা যেতে পারে–এক, আরবি হরফে বাংলা লেখা এবং দুই প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ জোর করে বাংলা ভাষায় নিয়ে আসা। পাকিস্তানের নেতারা আশা করেছিলেন যে, এই দুই উদ্যোগ সফল হলে ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার ভাষা পশ্চিম বাংলার ভাষা থেকে আলাদা হয়ে যাবে। এবং কালে কালে পূর্ব বাংলার লোকেরা আর মূল বাংলা সাহিত্য পড়তে পারবেন না অথবা পড়বেন না।
পূর্ব বাংলার লোকেরা অবশ্য এই ষড়যন্ত্রকে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে ব্যৰ্থ করে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের পরে তাদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি যে-গভীর ভালোবাসা এবং অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে, তা সব ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলো। গোটা বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁরা নিজেদের শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিপ্রেক্ষিতে এখন বাংলাদেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আবার বাংলা ভাষার পায়ে কুডুল মারতে উদ্যত হয়েছেন। এর মধ্যে যারা ইসলামী সক্রিয়বাদী এবং ইসলামী ফাউন্ডেশন অথবা কোনো ইসলামী এনজিও-র অর্থ সহায়তায় নতুন করে আরবিফারসি প্রভাবিত বাংলা চালু করতে চেষ্টা করছেন, তাদের উদ্দেশ্যটা বোঝা শক্ত নয়। কিন্তু একদল তথাকথিত “প্রগতিশীল” বুদ্ধিজীবীও আছেন, যারা সজ্ঞানে মূলধারার বাংলা থেকে ভিন্ন চেহারার বাংলা প্রবর্তনের পক্ষে ওকালতি করছেন। এঁদের কেউ কেউ আবার মার্কসবাদী বলেও নিজেদের শনাক্ত করেন। কিন্তু একটু ঠাহর করলেই বোঝা যায়, আসলে এঁরা মার্কসবাদী নন। অন্তরের অন্তস্তলে এঁরা একটা “বাদে”ই বিশ্বাস করেন, সেটা ইসলামী জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদকে এই সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে অভিন্ন করে দেখেন। নিজেদের বাঙালি পরিচয় নিয়ে এঁরা তাই বিব্রত বোধ করেন। প্রকৃত পক্ষে, তাদের বাংলাদেশীত্বকেই জোরদার করার জন্যেই তারা বাংলা ভাষার সংস্কার করতে চান।
