কেবল তাই নয়, একদিন কলকাতা নগরীতে যে-বাংলা ভাষা বিকাশ লাভ করেছিলো এবং যে-ভাষা সমগ্র বঙ্গদেশের আদর্শ ভাষায় পরিণত হয়েছিলো, সেই ভাষা আর সমগ্র বাংলাভাষীদের প্রামাণ্য বাংলা বলে বিবেচিত হবে কিনা, সে নিয়ে এখন সন্দেহ দেখা দেওয়া স্বাভাবিক; প্ৰথম যৌবনে প্ৰবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বরিশালের গ্রাম থেকে ঢাকায় পড়তে এসে প্রথমেই যা শিখতে চেষ্টা করেছিলাম, তা হলো “শুদ্ধ ভাষা”য় কথা বলা। এই প্রবণতা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত কমবেশি বজায় ছিলো। কিন্তু এখন ঢাকার তরুণ-তরুণীরা প্রামাণ্য বাংলায় কথা বলেন না। এখন বরং এক ধরনের ঢাকাই বাংলায় কথা বলাই ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। এমন কি, যারা যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া, রাজশাহী-দিনাজপুর–এসব অঞ্চলের এবং ইচ্ছে করলেই “শুদ্ধ বাংলা” অথবা “শুদ্ধ ভাষা’র কাছাকাছি একটা ভাষায় কথা বলতে পারেন, তারাও সে বাংলা না-বলে ঢাকাই বাংলা বলেন। বাংলাদেশের গণ্যমান্য লোক থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষ যখন কথা বলেন, এমন কি একটা সভায় বক্তৃতা করেন, তখনো তারা পুরোটা অথবা আংশিকভাবে এই ঢাকাই বাংলাই ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশের সৃজনশীল সাহিত্যে দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বহু বছর আগে থেকেই লক্ষ্য করা গেছে, সে কেবল যশোর-খুলনার ভাষা নয়, নোয়াখালির ভাষারও মতো দুর্বোধ্য আঞ্চলিক ভাষাও সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। ষাটের দশকের গোড়ায়। “মুসলমানী” শব্দের আধিক্যও দেখা দেয় দেশবিভাগের পরে থেকে। এখন ঢাকার টেলিভিশন-নাটকে আঞ্চলিক ভাষা। এতো বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যে, কোনো চরিত্র প্রামাণ্য কথ্য ভাষায় কথা বললে তাকে প্রায় কৃত্রিম বলে মনে হয়। সৃজনশীল সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষার এই ব্যবহার অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু যা আশঙ্কার সঙ্গে এখন লক্ষ্য করছি, তা হলো, ইতিমধ্যে তরুণদের কেউ কেউ ঢাকাই ভাষায় প্ৰবন্ধও লিখতে চেষ্টা করছেন। এমন কি, ঢাকার ভাষায় কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান এবং, কেবল সংলাপ নয়, পুরো গল্প লিখেছেন ইমদালুল হক মিলন।
এই ঢাকাই বাংলা বিশেষ করে ঢাকা অঞ্চলের বাংলা নয়। এ হলো কয়েকটি জিলার এক ধরনের মিশ্র বাংলা। এ ভাষায় মুসলমানদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় অনুষঙ্গের বহু আরবি-ফারসি শব্দও আছে। যেমনটা, ধরা যাক, সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে লক্ষ্য করি। বলা শক্ত, এ ভাষা ঠিক কোন জিলার ভাষা, কিন্তু এ যে কলকাতার প্রামাণ্য বাংলা নয়, এ যে পূর্ববঙ্গীয় আঞ্চলিক ভাষা–এটা পরিষ্কার। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, প্রামাণ্য বাংলার সঙ্গে বাংলাদেশের বহুল প্রচলিত কথ্য ভাষার পার্থক্য মার্কিন এবং ব্রিটিশ ইংরেজির মতো প্রধানত কেবল উচ্চারণের নয়, তার চেয়ে বড়ো পার্থক্য শব্দাবলীর। আঞ্চলিক এবং আরবি-ফারসি শব্দ তাতে অনেক বেশি। এমন অনেক শব্দ আছে, যা লেখার মতো হরফও আমাদের বাংলা ভাষায় নেই। তা ছাড়া, যে-ইসলামী শুদ্ধবাদী চেতনা থেকে ‘খোদা” “আল্লায় পরিণত হয়েছেন, সেই চেতনার প্রভাবে বহু আরবি-ফারসি শব্দ এখন এমনভাবে লেখা হচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে তা আর তাবৎ বাঙালির কাছে বোধগম্য থাকবে না। পূর্ববঙ্গীয় ভাষার ব্যাকরণও যথেষ্ট পরিমাণে ভিন্ন ধরনের। বিশেষ করে ক্রিয়াবিভক্তি এবং সর্বনামে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের ভাষায় ইংরেজির প্রভাবে “ফোন দেওয়া”র অথবা “ধরা খাওয়া”র মতো এমন অনেক প্রয়োগও দেখা যাচ্ছে, যার সঙ্গে প্রামাণ্য বাংলার মিলন ঘটানো শক্ত। এমন কি, ঢাকার ভাষায় পারিভাষিক ও আভিধানিক শব্দের সঙ্গে আঞ্চলিক শব্দের মিলন ঘটিয়ে যেসব বাক্য তৈরি করা হচ্ছে, তা এতোকাল অভাবনীয় ছিলো। (যেমন, তুমি আজীবন সদস্য হইবা? আমারে রেজিস্ট্রি কইরা বিয়ে করব? তোমারে খুব সুন্দর লাগে। আপনের নাম কয়েন। কী কইলা? আয়েন, বসেন ইত্যাদি ) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা বেড়ে যাওয়া ছাড়া, কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই দেখতে পাচ্ছি না।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ভাষায়ও আঞ্চলিকতার ছাপ পড়া খুবই স্বাভাবিক। বস্তুত, সে লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে। সেখানকার সৃজনশীল সাহিত্যে এখন ক্রমবর্ধমান মাত্রায় বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে— বাঁকুড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, ভাগলপুর, শিলিগুড়ি–দূরদূরান্তের ভাষা এখন সংলাপে আসতে আরম্ভ করেছে। তার ফলে এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের লোকেরা পুরো বুঝতে পারবে কিনা, তাতেও সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় জাহান্নাম থেকে বিদায় নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন শওকত ওসমান। সে উপন্যাসে আরবিফারসি উপাদান সহ বেশকিছু আঞ্চলিক শব্দ ছিলো। পাছে পশ্চিমবঙ্গের পাঠকরা সে ভাষা বুঝতে না-পারেন, তার জন্যে তিনি সেসব শব্দের অর্থ বন্ধনীর মধ্যে দিয়ে দিয়েছিলেন। এ রকমের আর-একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে ব্রিটিশ ইংরেজি এবং মার্কিন ইংরেজির পার্থক্য থেকে। কয়েক বছর আগে একটি মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ব্রিটিশ টেলিভিশনের একটি জনপ্ৰিয় সোপ অপেরা–ঈষ্ট এন্ডার্সদেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই সোপ অপেরার ভাষা এতো লন্ডনভিত্তিক এবং বহু শব্দের অর্থ এবং উচ্চারণ প্রামাণ্য ইংরেজি থেকে এতো আলাদা যে, মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সেই ধারাবাহিক দেখানোর আগে এই সব শব্দের অর্থ দিয়ে একটি তালিকা তৈরি করে এবং সেই তালিকা দর্শকদের মধ্যে বিতরণ করে। কালে কালে দুই বাংলার মধ্যে তাই হবে কিনা, আমার প্রশ্ন এবং আশঙ্কা সেটাই।
