১৮৬০-এর দশকে এসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাধু রীতিকে অবলম্বন করে ংলা ভাষাকে সৃজনশীল সাহিত্যের উপযোগিতা দান করেন। বিষয়বস্তু অনুযায়ী তিনি কোথাও ব্যবহার করেন লঘু ভাষা, কোথাও গুরুগম্ভীর ভাষা। তবে ক্রিয়াবিভক্তি অথবা সর্বনামে তিনি কথ্যভাষাকে অনুসরণ করেননি। তাঁর ঝোঁকও ছিলো প্রধানত তৎসম শব্দ এবং সমাসবদ্ধ পদের ওপর। এ কথায় বলা যায় যে, তাঁর গদ্য কোথাও কোথাও মুখের ভাষার শক্তিকে প্রকাশ করলেও, তা ছিলো মূলত সাধু ভাষা। তখনো কৃত্রিমতা কাটিয়ে মুখের ভাষাকেই সাহিত্যের ভাষার মর্যাদা দেওয়ার মতো লেখকের আবির্ভাব ঘটেনি। ১৮৭৮-৭৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ থেকে কতোগুলো চিঠি লিখেছিলেন তার ইউরোপ প্রবাসের অভিজ্ঞতা জানিয়ে। সে চিঠিগুলো ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। কথ্যভাষায় লেখা এই চিঠিগুলো প্রমাণ করে যে, সেই আঠারো বছর বয়সেই তিনি কথ্যভাষার সম্ভাবনার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এর কয়েক বছর পরে তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করেন, তখন তিনি আর কথ্যভাষায় লিখতে সাহস পাননি, পাঠকরা সে ভাষাকে মেনে নেবেন কিনা, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। তাই সেসব তিনি সাধু ভাষাতেই লেখেন, যদিও ১৮৯০-এর দশকে তিনি গল্পগুচ্ছের ভাষায় সর্বনামে কথ্যভাষার রীতি কোথাও কোথাও ব্যবহার করেছিলেন।
প্ৰবন্ধ–সব কিছুই লেখা সম্ভব মুখের ভাষায়। তারপর থেকে গত নকবুই বছর ধরে বেশির ভাগ লেখকই চলতি বাংলায় তাদের সাহিত্য রচনা করেছেন। এমন কি, কলকাতায় আনন্দবাজার পত্রিকা অথবা ঢাকায় ইত্তেফাকের মতো পত্রিকা সাধুভাষাকে জোর করে ধরে রাখার যে-প্ৰয়াস চালায়, তাও অনেক আগেই ভেঙে পড়ে। এভাবে এককালে যে-গদ্য মুখের ভাষার কাছাকাছি ছিলো, সেই গদ্য আবার মুখের ভাষার কাছাকাছি ফিরে এলো। কিন্তু তার জন্যে এক শো বছরেরও বেশি সময় তাকে উজানপথে চলতে হয়েছে।
উনিশ শতকের গোড়া থেকে কলকাতায় যে-ভাষা এবং সাহিত্যের বিকাশ লক্ষ্য করি, তার আরও কতোগুলো বৈশিষ্ট্য ছিলো। এই নগরীতে তখন প্ৰায় একতৃতীয়াংশ লোক ছিলেন মুসলমান। কিন্তু তাঁরা বেশির ভাগই ছিলেন অবাঙালি। তাঁরা লেখাপড়ার দিকে এগিয়ে আসেননি। সে জন্যে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিকাশে তাদের কোনো ভূমিকা পালন করার প্রশ্নই ওঠে না। বস্তুত, তাঁরা বঙ্গদেশে বাস। করলেও, বাঙালি বলে নিজেদের পরিচয় দিতেন না; প্রতিবেশী বাংলাভাষী হিন্দুরাও তাদের বাঙালি বলে গণ্য করতেন না। উনিশ শতকের বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য তাই পনেরো আনাই হিন্দুদের গড়া। এমন কি, শতাব্দীর শেষেও খুব কম মুসলমানই বাংলায় লিখতেন। খুব কম মুসলমানই স্বীকার করতেন যে, তাদের মাতৃভাষা বাংলা। এই পরিবেশে যে-সাহিত্য রচিত হয়, সেও বাংলা গদ্যের মতো হিন্দু লেখকদের তৈরি। তাতে মুসলমানদের অবদান যেমন খুব সামান্যই ছিলো, তেমনি তাতে মুসলিম জীবনও প্রায় অনুপস্থিত। এক কথায়, কলকাতাকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকে যে-নতুন সংস্কৃতি দানা বাঁধে, সেই সংস্কৃতিতে মুসলিম অবদান ছিলো নিতান্তই নগণ্য, এবং তার প্রধান কারণ বাংলা ভাষার দিকে তাদের মুখ ফিরিয়ে থাকা এবং আধুনিক শিক্ষার দিকে এগিয়ে না-আসা।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ এবং তারপর ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর অবশ্য অবস্থা বৈপ্লবিকভাবে পাল্টে গেছে। দেশবিভাগের পর কলকাতা পরিণত হয়। ভারতের একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে। শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সীমিত বিকাশ এবং বামপন্থী ও উগ্ৰবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে কলকাতা প্রাদেশিক রাজধানী হিশেবেও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। তদুপরি, ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দী এবং ইংরেজি হওয়ায় বাংলার গুরুত্বও অনেক কমে যায়। এর ফলে উনিশ এবং বিশ শতকের কলকাতায় বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে অগ্ন্যুৎপাতের মতো সৃজনশীলতার যে-স্ফুরণ লক্ষ্য করেছিলাম, সেই ধারা বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে আর বজায় থাকেনি। তার অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায় সর্বত্র। একুশ শতকের গোড়ায় এখন দেখা যাচ্ছে, কলকাতায় হিন্দীর চর্চা ক্রমবর্ধমান, কিন্তু বাংলার চর্চা সে অনুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে হয় না। এমন কি, সন্দেহ হয়, পঞ্চাশ বছর পরে বাংলার চর্চা এখন যেটুকু আছে, তাও থাকবে কিনা।
অপর পক্ষে, বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা অন্য ছবি দেখতে পাই। বিশ শতকের গোড়া থেকে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বাংলা তাদের মাতৃভাষা কিনা তাই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কিন্তু ১৯৩০ সালের মধ্যে এই বিতর্কের অবসান ঘটে। দেশবিভাগের পরে মুসলমানপ্রধান পূর্বপাকিস্তানে বাংলা ভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা সত্যিকার প্রবল হয়ে ওঠে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। বস্তুত, এই আন্দোলনকে ঘিরেই শেষ পর্যন্ত পূর্বপাকিস্তান ভেঙে গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। এই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষাও বাংলা। সেদিক দিয়ে এই দেশে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য বিকাশ লাভ করার অসাধারণ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও সামগ্রিকভাবে বাংলা সাহিত্যে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের অবদান ছিলো খুবই কম। বাংলা ভাষা চর্চায়ও তাঁরা অনেক পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু এই শতাব্দীর শেষে এসে, এখন মনে হয়, মানের দিক দিয়ে না-হলেও বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য চর্চায় পরিমাণের দিক দিয়ে পশ্চিম বাংলাকে বাংলাদেশ হারিয়ে দিয়েছে। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিক বিদ্যা চর্চার জন্যে যতো বাংলা বই প্রকাশিত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে কি তার একাংশও প্রকাশিত হয়েছে? অথবা এখন বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো বই এবং পত্রপত্রিকা প্ৰকাশিত হয়, পশ্চিমবঙ্গে কি তা হয়? কেবল তাই নয়, বাংলাদেশে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য যে-সরকারী পৃষ্ঠপোষণা পাচ্ছে, পশ্চিম বাংলায় তা পাওয়া যাচ্ছে না, অথবা তা প্ৰত্যাশা করাও ঠিক নয়। এমন কি, সেখানে এখন যেটুকু সরকারী আনুকূল্য পাওয়া যাচ্চে, ভবিষ্যতে তাও অব্যাহত থাকবে বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের চর্চা তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট কমে যাবে। অন্য দিকে, সরকারী ভাষা হিশেবে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার চর্চা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। এমন কি, গান, নাটক এবং সিনেমার ব্যাপারেও এ কথা বলা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে এসব এখনো বাংলাদেশের তুলনায় বিস্তর এগিয়ে আছে, কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরে সে অবস্থা তেমন থাকবে বলে মনে হয় না।
