(প্ৰথম আলো, মে ২০০৬)
২৫. ভবিষ্যতের বাংলা ভাষা-সাহিত্য
বাংলা ভাষার বয়স প্রায় হাজার বছর, কারো কারো মতে, তার চেয়েও বেশি। নানা বাঁক ঘুরে, নানা রকমের প্রভাব স্বীকার করে প্রায় সবার অলক্ষে এ ভাষা বর্তমান রূপ নিয়েছে। কিন্তু গত আড়াই শো বছরে দুটি রাজনৈতিক ঘটনা এই ভাষাকে যতো বদলে দিয়েছে, তেমন দ্রুত অথবা ব্যাপক পরিবর্তন একটা ভাষার ইতিহাসে বড়ো একটা দেখা যায় না। প্রথম ঘটনাটি হলো: ইংরেজ শাসনের রাজধানী হিশেবে কলকাতা নগরীর উদ্ভব আর দ্বিতীয় ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিশেবে ঢাকার অভিষেক। কলকাতা রাজধানী হওয়ার ফলে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের যে-পরিবর্তন হয়েছিলো, সে ইতিহাস আমাদের কমবেশি জানা। কিন্তু ঢাকা একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী হওয়ায় বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ওপর যেপ্রভাব পড়তে পারে, তা এখনো জল্পনাকল্পনার বিষয়। তবে কলকাতায় যা ঘটেছিলো এবং গত তিন দশকে ঢাকায় যা ঘটেছে, তা থেকে খানিকটা অনুমান করা যেতে পারে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য কোন পথে যাচ্ছে, অথবা ভবিষ্যতে কোন চেহারা পেতে পারে।
জীবিকার অন্বেষণে এবং ভাগ্যের উন্নতি করার আশায় আঠারো শতকের শেষ দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ কলকাতায় আসতে আরম্ভ করেন। ঐরা আসেন কলকাতার আশেপাশের এলাকা থেকে। যতো সময় যেতে থাকে, এই সংখ্যাও ততো বাড়তে থাকে। তা ছাড়া, যেসব জায়গা থেকে লোকেরা আসেন, তার পরিধিও দ্রুত প্রসারিত হতে থাকে। সবারই একই উদ্দেশ্য–কলকাতায় বিত্ত এবং বিদ্যার যেভোজ হচ্ছে, তার শরিক হওয়া। মফস্বল থেকে আসা এই লোকেরা কলকাতায় ভিড় করেছিলেন বিচিত্র আঞ্চলিক ভাষা এবং সংস্কৃতি নিয়ে। একদিকে এসব ভাষা এবং সংস্কৃতি কলকাতার লোকেদের প্রভাবিত করেছিলো, অন্যদিকে কলকাতার ভাষা এবং সংস্কৃতিও প্রভাবিত করেছিলো এই বহিরাগতদের। কোনো কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রভাবও পড়েছিলো ক্ষেত্রবিশেষে। যেমন, বাংলা গদ্যকে গড়ে তোলার ব্যাপারে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন জোনাথান ডানকান এবং হেনরি পিটস ফরস্টারের মুনশিরা আর উইলিয়াম কেরীর পরিচালনায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কয়েকজন পণ্ডিত। এই পণ্ডিতদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। সরকারী বৃত্তের বাইরে কয়েক বছর পরে বাংলা গদ্যের দিক নিদের্শনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রামমোহন রায়। সর্বোপরি, বাংলা ভাষা ওপর ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাবও পড়েছিলো। তারপর ধীরে ধীরে সমন্বয়ও ঘটেছিলো এসব বিচিত্র উপাদানের।
উনিশ শতকের গোড়ায় যে-প্রামাণ্য বাংলা সাধু ভাষার জন্ম হয়, সে ভাষা এই কলকাতার ফসল। সে ছিলো আগের শতাব্দীর বাংলা থেকে রীতিমতো ভিন্ন ধরনের। আঠারো শতকের যে-বাংলা গদ্যের নমুনা আমরা দেখতে পাই, তাতে একদিকে যেমন আরবি-ফারসি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো, তেমনি সে গদ্য লেখা হতো ছোটো ছোটো বাক্য দিয়ে। কিন্তু ১৭৮০-র দশক থেকে ইংরেজ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে আইনের বই এবং সরকারী কাগজপত্র অনুবাদ করাতে দিয়ে যে-বাংলা লেখা হয়, তাতে আরবি-ফারসি উপাদান কমে যায় এবং বাক্যের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। সরল বাক্য পরিণত হয় জটিল এবং যৌগিক বাক্যে। বিশেষ করে হেনরি পিটস ফরস্টার এবং উইলিয়াম কেরী এই রীতির বাংলাকে খুব উৎসাহিত করেন। (এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্যে দ্রষ্টব্য আমার লেখা বই কালান্তরে বাংলা গদ্য।) কেরীর অধীনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা যেসব পাঠ্যবই লেখেন, তা লেখেন এই নতুন ধরনের এবং অনেকটা কৃত্রিম ভাষায়। সাধারণ বাঙালিদের মধ্যে এসব রচনা বেশি লোক পড়েননি, কিন্তু রামমোহন রায় থেকে শুরু করে অন্য যাঁরা পরবর্তী বিশ বছরে বাংলা লিখতে এগিয়ে আসেন, তারা গদ্যের এই রীতিকে অস্বীকার করতে পারেননি। কমবেশি এই রীতির ওপর ভিত্তি করেই তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের নিজেদের গদ্যরীতি।
এভাবে যে-বাংলা গদ্যের জন্ম হলো, তা ছিলো মুখের ভাষা থেকে যথেষ্ট আলাদা। রামমোহন রায় এই গদ্যকে খানিকটা সাবলীলতা দিতে চেষ্টা করেছিলেন। আর, ১৮২০-এর দশকে খবরের কাগজগুলো এই ভাষাকে প্রতিদিনের ব্যবহারের উপযোগিতা দিয়েছিলো। কিন্তু মাধুর্যবর্জিত এবং আড়ষ্ট এই ভাষা সাহিত্য সৃষ্টির উপযোগী ছিলো না। ১৮৪০-এর দশকের শেষে ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর এই ভাষার স্বাভাবিক ছন্দ আবিষ্কার করেন এবং তাতে সাহিত্যিক গুণাবলী আরোপ করেন। ফলে এক কালের আড়ষ্ট সাধু বাংলাই বেতাল পঞ্চবিংশতি অথবা সীতার বনবাস লেখার মতো সুললিল হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষা পড়তে হোঁচটি খেতে হয় না। তা ছাড়া, তিনি অনুপ্রাস এবং লঘুগুরু শব্দের এমন চমৎকার সমন্বয় ঘটান, যা তার ভাষাকে একটা সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্যও দান করেছিলো। তা সত্ত্বেও এ ভাষাও ছিলো মুখের ভাষা থেকে অনেক দূরে, তার ভিত্তি ছিলো তার আগেকার অর্ধশতাব্দীর সাধু ভাষা। তিনি তাকে কেবল মাধুর্যমণ্ডিত করেছিলেন। তা ছাড়া, এ ভাষা সব বিষয় লেখার উপযোগী ছিলো না।
বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন প্রাচীন ভারতের গল্প অথবা পৌরাণিক কাহিনী। অপর পক্ষে, প্যারীচাঁদ মিত্র ১৮৫৪ সালে আলালের ঘরের দুলাল নামে যে-কাহিনী লিখতে আরম্ভ করেন, তার বিষয়বস্তু নয়, যে-ভঙ্গিতে তিনি লিখতে চেয়েছিলেন, তার জন্যেও বিদ্যাসাগরের ভাষা উপযোগী ছিলো না। এ জন্যে তিনি বহু জায়গায় চলতি ক্রিয়াপদ, সর্বনাম এবং ধ্বন্যাত্মিক শব্দ ব্যবহার করে মুখের ভাষার কাছাকাছি নতুন এক রীতির গদ্য উদ্ভাবন করেন। তার চেয়েও বড়ো কথা, তিনি বাংলা ভাষার অন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেন। সে সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে দেয় কয়েক বছর পরে প্রকাশিত হতোম প্যাঁচার নকশা। এই বইয়ের লেখক কথ্য বাংলার অসাধারণ ক্ষমতাকে তুলে ধরেন। কিন্তু এ ভাষাও সবকিছু লেখার উপযোগী ছিলো না। এমন কি, এ রকমের ভাষা প্রচলনের জন্যে সময়ও তখনো পর্যন্ত অনুকূল হয়নি। এ জন্যেই বোধ হয় এই অসাধারণ রীতির কোনো অনুকারক আমরা দেখতে পাইনে।
