এক সময়ে যারা বিলেতে যেতেন, তাদের বলা হতো: বিলোতফেরত। এতো কম লোক তখন সুদূর বিলেতে যেতেন বা যেতে পারতন যে, কথাটার একটা তাৎপর্য থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু এখন আর তা নেই। তেমনি যখন দেশ থেকে মাত্র কয়েক শো লোক হজ করতে মক্কা যেতেন, তাদের বলা হতো আল-হজ। বোম্বাই পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এলে বলা হতো বোম্বাই হাজী। কিন্তু এখন? এখন কি আল-হজ না-বললে চলে না! দেশের অমুসলমান ছাড়া বাকি তো তাবৎ লোকই প্রায় হজ করে ফেলেছেন। কেউ কেউ বছরে একাধিকবার রাজনৈতিক হাজও করেন। তা হলে আর কেন আল-হাজ?
কেবল ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক নেতাদেরই নয়, অন্যদেরও সম্মানের আতিশয্য দেখানো হয়। যে-রবীন্দ্রনাথের গান অথবা কবিতা ছাড়া সম্ভবত শৌচাগারের উদ্বোধনও সম্ভব হয় না, সেই রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে শুরু করা যাক। রবীন্দ্রনাথ মস্ত বড় কবি, সন্দেহ নেই। বিশ্বের কাছে তিনি বাঙালিদের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন, তাতেও সন্দেহ নেই। তবে তাঁকে মহাকবি, বিশ্বকবি, কবীন্দ্র, কবিগুরু, গুরুদেব ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করার কী প্রয়ােজন? তাঁর নামটাই কি কালিদাস অথবা শেক্সপীয়রের মতো যথেষ্ট নয়? অন্তত আমি আমার কোনো রচনায় এই বিশেষণগুলোর একটাও ব্যবহার করিনি। তাতে যে সেসব রচনায় তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কিছুমাত্র হ্রাস পেয়েছে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথের মতো বঙ্কিমচন্দ্র পরিণত হয়েছেন ঋষি অথবা সাহিত্যসম্রাটে, নজরুল বিদ্রোহীতে। এসবের কোনো দরকার ছিলো না। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় একজন কবি-মুক্তিযোদ্ধার খবর পড়লাম। তিনিও অনেকগুলো বিশেষণের অধিকারী। বিশিষ্ট কবি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা’। মুশকিল। হলো: এই বিশিষ্ট কবির নাম পর্যন্ত আমি শুনিনি। তা ছাড়া, তিনি বন্দুক নিয়ে মুক্তিযুদ্ধও করেননি। কী করে বীরত্ব প্রমাণ করলেন, দুর্বোধ্য।
বস্তুত, বাঙালিদের বিশেষণ-গ্ৰীতির প্রবল বন্যায় বিশিষ্ট” কথাটার অর্থ বঙ্গোপসাগরে ভেসে গেছে। বিশিষ্ট হলো সে, যাকে সাধারণ থেকে আলাদা কর লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ঢালাওভাবে সবার নামের সঙ্গে বিশিষ্ট লাগালে বিশিষ্ট কথাটাই বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। সত্যি বলতে কি, কেবল বাঙালিদের মধ্যে নয়, ংলা ভাষার মধ্যেও অতিকথনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা না হলে কেন বলা হবে। অমুক ব্যক্তি সভাপতির পদ অলকৃত করেন? পদটাকে কী করে একজন অলস্কৃত করেন? রঙ লাগান? মহতী সভা এ রকমের একটি অর্থহীন বাগাড়ম্বর। কিন্তু ব্যাকরণের দিক দিয়ে এতে লিঙ্গের কোনো ভুল নেই। অপর পক্ষে, কিছু দিন আগে “শাহাদাত বরণকারী”। “স্বাধীনতার ঘোষক’ ‘জেনারেল (অবঃ)’ জিয়াউর রহমানের বিধবা” “ক্ষমতাসীন চার দলীয় ঐক্যজোটের নেতা’, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী’ ‘দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া এক ভাষণে বলেন, “মহতী” অনুষ্ঠান। এ থেকে অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিশেষ কিছু বোঝা না-গেলেও, বোঝা গেলো তাঁর ভাষণ যিনি লিখেছিলেন, তার লিঙ্গজ্ঞান দুর্বল। অনুষ্ঠান কথাটা পুংলিঙ্গ। অতএব মহতী না হয়ে মহৎ অথবা মহান হবার কথা। এসব বিশেষণ ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যাকরণের শ্ৰীলতাহানির কী দরকার? সোজা এবং সংক্ষেপে ‘অনুষ্ঠান’ বললেই হয়!
আরেকটা বিশেষণ প্রায়ই শোনা যায়: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। ধরা যাক, কারো বই ঢাকা ও কলকাতা থেকে প্ৰকাশিত হলে অমনি তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখকে পরিণত হন। এ রকমের খ্যাতি আরোপের বাসনা বাঙালিদের মধ্যে এতই প্রবল যে, ‘প্রবাসী’ও একটি বিশেষণে পরিণত হয়েছে। যেমন, প্রবাসী লেখক। এ দিয়ে বোঝা গেলো। যে-লেখক বিদেশে থাকেন। কিন্তু তার মধ্যে গৌরবের কী আছে? বিশেষণের এই ভিড়ে এখন আর ফল দিয়ে কারো পরিচয় হয় না, তোশামোদীরা কী বিশেষণ দিলেন, তা দিয়েই বাজিমাতের চেষ্টা চলে। অর্থহীনভাবে চিরন্তন, আবহমান, প্রচণ্ড, অসম্ভব, বিখ্যাত, প্ৰখ্যাত ইত্যাদি বিশেষণও ব্যবহার করা হয় যখন-তখন। অসম্ভব সুন্দরের একটা অথেনটিক দৃষ্টান্ত দিই আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে–অসম্ভব সুন্দর মুহূর্ত কিশোর পারেখা অমর করে রেখেছেন।” এক জায়গায় পড়েছিলাম ‘অন্যতম’–শ্ৰেষ্ঠ অৰ্থে। যেমন, শ্ৰেষ্ঠ কবি লিখতে গিয়ে লেখক লিখেছেন অন্যতম কবি।
মনে আছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বাংলার অধ্যাপক। ১৯৬৯ অথবা ৭০ সালে দাউদ পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে সম্মান জানানোর জন্যে একটি সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে একটি ছাত্রী এই পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপককে খুশি করার জন্যে (অন্য ভাষায়—তৈল প্রদান করার নিমিত্ত) তার বক্তৃতায় বলেছিলো, ‘…দাউদ পুরস্কার পেয়ে বিশ্বের কাছে তিনি বাঙালিদের মুখোজুল করেছেন।” শুনে হেসেছিলাম। কিন্তু অবাক হইনি। কারণ বাঙালিরা এমন অতিশয়োক্তি করেই থাকেন। এঁরা দিঘিকেও সাগর বলেন। ব্যাং ভাবে তার কুয়োই মহাসাগর। কারণ, মহাসাগর সে কখনো দেখেনি। তুলনা করার সময়ে একটা বস্তুকে অন্য একটা বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা হয়। দুটোরই আকার, আয়তন, বৈশিষ্ট্য, সাদৃশ্য ইত্যাদি জানা থাকলে তবেই সেই তুলনা সার্থক হয়। তা না-হলে সেই তুলনাই অনর্থক। জ্ঞানের অভাব থেকে অনৰ্থক তুলনা দেখা দিতে পারে; কিন্তু না, বাঙালির অনৰ্থক তুলনার কারণ তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য–আদিখ্যেতা।
