মৃত্যু সম্পর্কে বাঙালিদের অনেকগুলো লক্ষ্য করার মতো এক্সপ্রেশন আছে। যেমন, স্বৰ্গলাভ, স্বৰ্গারোহণ, স্বগীয়, স্বৰ্গত (নরকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও), মৃত্যু বরণ, শাহাদাত বরণ, শাহাদাত বরণকারী ইত্যাদি। এগুলো একটাও আমার বানানো নয়, সবগুলোই অথেনটিক। আমি ভেবে পাইনে, মৃত্যুকে বরণ করে কিভাবে–যদি না সেটা আত্মহত্যা হয়? কেউকেটা মরলে সেই তার বিদেহী আত্মার প্রতি বাঙালিরা শ্ৰদ্ধা জানান। আত্মা যদি থাকেই, তবে সেটা যে বিদেহী–তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না! তা হলে বিদেহী কথাটার আদিখ্যেতা কেন?
খবরের কাগজে মাঝেমধ্যে দুটো ব্যবহার লক্ষ্য করি— যুগব্যক্তিত্ব আর যুগমানব। এর কি কোনো অর্থ আছে, নাকি এও আমাদের আদিখ্যেতা? এর অর্থ কি যে-ব্যক্তি অথবা মানব একটা নতুন যুগ তৈরি করলেন? নাকি যে-ব্যক্তি অথবা মানব একটা বিশেষ যুগের যথার্থ প্রতিনিধি অথবা যথাৰ্থ ফসল? প্রসঙ্গত ‘ব্যক্তিত্ব’ শব্দটাও আদিখ্যেতার আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। ব্যক্তিকে ব্যক্তিত্ব বলে না, ব্যক্তিত্ব হচ্ছে ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। প্যর্সন থেকে যেমন প্যর্সনালিটি। যেভাবে সেই ব্যক্তিত্ব কথাটার অব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিদিন, তা দেখলে আহাদে আটখানা হওয়ার উপায় থাকে না। তিনি একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।” বড় মাপের ব্যক্তিত্বও বোধ হয় শুনেছি। বড় মাপের মানে লম্বা চওড়া। সত্যিকারের লম্বা এবং মোটা লোককে বড় মাপের ব্যক্তি বললে প্ৰবল আপত্তির কারণ দেখিনে। যদিও একজনের দেহের দিকে ইঙ্গিত করে কোনো মন্তব্য করা ঠিক ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু বড় মাপের ব্যক্তিত্ব?–একেবারে অর্থহীন।
রাজনৈতিক এলাকা থেকে আর-একটি আদিখ্যেতার দৃষ্টান্ত না-দিয়ে পারছি না। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতির নামের আগে বেশ কয়েকটি বিশেষণ লক্ষ্য করেছি। অধ্যাপক ডক্টর রাষ্ট্রপতি …। এর থেকে বেহুদা তোশামুদি আর কিছু হতে পারে না। রাষ্ট্রপতির চেয়ে বড়ো আর কী আছে? তা ছাড়া, ইংরেজি ভাষায় কাউকে প্রফেসর বললে তার থেকে সম্মানের কিছু থাকে না। ডক্টর কথাটা তখন বেকার হয়ে যায়। তাই কেউ অধ্যাপকের পর ডক্টর বললে তা হাসির খোরাক ছাড়া কিছুই জোগাবে না। বাড়তি সম্মান তো নয়ই! বাংলাদেশে আরও লক্ষ্য করি অধ্যাপক আর প্রফেসরের মধ্যেও একটা পার্থক্য করা হয়। প্রফেসরকে বাংলায় অধ্যাপক বলা হলে তিনি নাখোশ হন–কারণ অধ্যাপক বললে যেন যথেষ্ট বলা হয় না। (প্ৰশংসার কাঙাল আর কাকে বলে!)৷ কলেজের শিক্ষকরা অনেক দিন আগে থেকেই নিজেদের নামের আগে অধ্যাপক লিখে থাকেন। একজন অধ্যক্ষও অধ্যাপক। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধ্যক্ষরা নামের আগে লেখেন অধ্যক্ষ। সম্প্রতি একজনের নামের আগে দেখলাম উপাধ্যক্ষ। শুনে হাসির চেয়ে বিস্ময়ই বেশি বোধ করেছি। কিছু কাল আগে আরেকজনের নামের আগে দেখলাম। তিনি লিখেছেন ইঞ্জিনিয়ার অমুক। অধ্যাপক, ডাক্তার, ব্যারিস্টার, অ্যাডভোকেট–এঁরা সবাই পেশা আর পদের কথা লিখতে পারলে এনজিনিয়ার আর পিছিয়ে থাকবেন কেন? এর পরে আস্তে আস্তে আরও কতোটা পদস্খলন হবে, সেটা এখনই বোঝা যাচ্ছে না।
মহান এবং পবিত্র শব্দ দুটোরও শ্ৰীলতাহানি করা হচ্ছে প্রতিদিন। যেমন মহান স্বাধীনতা দিবস, মহান শহীদ দিবস। একটা দিন কী করে মহান হয়, সেটা বোঝা কঠিন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানে মহানের এ রকম কোনো সংজ্ঞা নেই। আরেকটি আদিখ্যেতা পবিত্র শব্দের। ওরস, মিলাদ, রমজান, ঈদ, হজ, দরগা, মাজার, মক্কা, মদিনা–সবই পবিত্র, সন্দেহ নেই। কিন্তু শরীফ লেখার পরও কি শব্দের গোড়ায় আবার পবিত্র লেখার কোনো দরকার আছে? আরেকটা এক্সপ্রেশন দেখেছিলাম–‘পবিত্ৰ শোণিতে রঞ্জিত”। কোন রক্তটা পবিত্র আর কোনটা অপবিত্র আমার সীমিত বিজ্ঞানের জ্ঞান দিয়ে তার হদিস করতে পারিনি।
এর থেকেও গুরুতর একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি ধর্ম থেকে। যিশু খৃষ্ট পরিচিত। শুধু যিশু অথবা খৃষ্ট হিশেবে। বুদ্ধ পরিচিত বুদ্ধ হিশেবে। কৃষ্ণ কৃষ্ণ হিশেবে। কোনো বিশেষণ ছাড়াই কোটি কোটি লোকের কাছে তাঁরা পরম শ্ৰদ্ধেয়। কিন্তু ব্যতিক্রম ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা। তাঁরা তাদের ধর্মপ্রবর্তকের নামের আগে-পিছে অনেকগুলো বিশেষণ জুড়ে দিতে পছন্দ করেন। কেউ না-দিলে তাকে প্রায় নাস্তিক বলে গণ্য করেন। সৈয়দ মুজতবা আলি লিখতেন মহাম্মদ সাহেব। তাই নিয়ে তার অনেক গালমন্দ শুনতে হয়েছে। তাঁর যুক্তিটা ছিলো: জীবদ্দশায় মহাম্মদকে সম্মান করে তাঁর অনুসারীরা বলতেন: সাহাব অর্থাৎ সাহেব। সে জন্যেই, তার অনুসারীদের বলা হয় সাহাবা। তার মধ্যে অসম্মানের কিছু নেই। মওলানা আকরম খান তাঁর যেজীবনী লিখেছিলেন, তাতে মোহাম্মদ নামের আগে কোনো বিশেষণ দেননি, এমনকি, হজরতও নয়। তার মানে কি এই যে, তার শ্রদ্ধা ছিলো না ধর্মপ্রবর্তকের প্রতি? তাঁর নামের শেষে দরুদ অথবা পীস বি আপন হিম লেখাও আমার কাছে বাহুল্য মনে হয়। কারণ তিনি তো সৃষ্টিকর্তার পেয়ারা দোস্ত, তাঁর জন্যে আমাদের মতো পাপী তাপীর দোয়ার কি কোনো দরকার আছে?
ধর্ম থেকে অন্য প্রসঙ্গে যাবার আগে পীর অথবা তার থেকেও ছোটো মাপের ধর্মীয় নেতাদের কথা বলে নিই। ছেলেবেলায় কুচিৎ পীরের কথা শুনতাম। পীরদের সম্মানসূচক পদবী ছিলো মওলানা। কিন্তু এখন মওলানার নামের সঙ্গে অনেকগুলো বিশেষণ লাগানো হয়। একটা দৃষ্টান্ত দিই পত্রিকা থেকে। শামসুল উলামা হজরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কেবলাহ’। এই বিশেষণগুলোর একটা ছাড়া বাকিগুলোর অর্থ আমার জানা নেই। এমন কি, যার কথা বলা হচ্ছে, তার নামও শুনিনি। ঐ একই পত্রিকার একটি বিজ্ঞাপনে দেখলাম। লন্ডনের এক বাঙালি পাড়ায় একটি “ওয়াজ মাহফিল’ হবে এবং তাতে ‘ওয়াজ ফরমাইবেন’ পাঁচজন মওলানা ও হাফিজ। এই পাঁচজনের নামের আগেই আছে সম্মানসূচক উপাধি “হযরত’। এতজন হজরতের কাছাকাছি বাস করছি জেনে পুলকিত ও আশ্বস্ত বোধ করলাম। কারণ এদের পুণ্যগুণে মৌলবাদীদের বোমাবাজি থেকে রক্ষা পাব বলে ভরসা করছি। সত্যি সত্যি, সম্প্রতি মওলানাদের বিশেষণের সংখ্যা ‘অত্যাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে (আকারটা আদিখ্যেতা)। আগে যাঁরা মুন্সি অথবা মৌলবী বলে পরিচিত ছিলেন, ভুইফোড়ের মতো রাতারাতি তারা মওলানায় পরিণত হয়েছেন। দাড়ি থাকলেই তাকে মওলানা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। দাড়িহীন মওলানা এখনো দেখিনি, তবে খুনীকে মওলানা হতে দেখেছি। যেমন, পালাবদলের খেলায় রাজাকারও মওলানায় পরিণত হয়েছেন। যে যতো বড় রাজাকার, সে ততো বড় মওলানা। তাঁর ওয়াজের ততো ক্যাসেট বিক্রি হয়। জেএমবি-র খুনিরাও মওলানা, মুফতি ইত্যাদি উপাধিতে অলস্কৃত হয়েছেন। একটু আদিখ্যেতা করে বলতে পারি এসব উপাধিকে তাঁরা অলঙ্কৃত করেছেন।
