ওদিকে, শেখ মুজিব বাংলাদেশের বিতর্কাতীত প্রতিষ্ঠাতা হওয়ায় জিয়াউর রহমানের দল পড়েছেন দারুণ বেকায়দায়। এ দলের লোকেরা যেহেতু তার নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চান, সে জন্যে তাকেও ফেরেশতায় পরিণত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই তাঁরা তাঁকে দুটো বিশেষণ ইতিমধ্যে দিয়েছেন। প্ৰথমে শহীদ, তার পর স্বাধীনতার ঘোষক। অথচ আশ্চর্য, ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হলেও, তাকে শহীদ বলা হয় না! যদ্দুর শুনেছি, জিয়া নিহত হন সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দুে। অন্তত ধৰ্মযুদ্ধে যে নিহত হননি–এ বিষয়ে নিশ্চিত। এমন কি, তিনি যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেটাকেও আদৌ ধর্মসঙ্গত বলা যায় না। তা হলে তিনি কোন যুক্তিতে শহীদ হলেন? এমন কি, বিএনপির নেতারাও ভালো করে জানেন যে, জিয়াউর রহমান কোন পরিবেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং সে ঘোষণায় তিনি কী বলেছিলেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন মুজিবের নামেই। তা না-হলে তার মতো একজন অজ্ঞাত মেজরের আহবানে কেউ যুদ্ধ শুরু করেনি, অথবা যুদ্ধ চালিয়েও যায়নি। অথচ এই ঘোষক পদবীটা এত জরুরি হয়ে পড়েছে যে, সেটা না-বললে দেশের সবচেয়ে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত লোকেরও চাকরি চলে যায়–এমন কি, রাষ্ট্রপতির।
বাঙালির আতিশয্যগ্ৰীতি রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও কিছু কম ছিলো না। তিনিও বিশেষণপ্রেমিক ছিলেন। এমন কি, তার ওপর কেউ কবিগুরু” “গুরুদেব’ ‘মহাকবি ইত্যাদি বিশেষণ একক অথবা একত্রে বর্ষণ করলে তিনি রাগে অন্ধ হয়ে তাকে অভিশাপ দিতেন বলে শোনা যায়নি। গান্ধীজীর রাজনৈতিক আন্দোলন দেখে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি তাই তাকে একটা উপাধি দেন– মহাত্মা। সেই থেকে দেশবাসী গান্ধীজীর আসল নাম প্রায় ভুলে গিয়ে তাঁর নামই দেন মহাত্মা গান্ধী। রবীন্দ্রনাথ ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকে গান্ধীজীকে যখন এই উপাধি দেন, তখন বাংলার জনপ্রিয় নেতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। গান্ধীজীর একটা বিশেষণ থাকলে বাঙালি নেতারও একটা বিশেষণ প্রয়োজন হয়। অতএব তিনি হলেন দেশবন্ধু। তারপর একে-একে দেখা দিলেন দেশপ্রিয়, নেতাজী, শেরে বাংলা, বঙ্গবন্ধু। যারা এ রকম কোনো বিশেষ নামে ভূষিত হলেন না, তারাও পিছিয়ে থাকলেন না। তাদের নামের আগে লেখা হলো দেশবরেণ্য, দেশনন্দিত ইত্যাদি। এ রকমের বীরপূজার পথ ধরে সম্প্রতি শেখ হাসিনা হয়েছেন জননেত্রী। খালেদা জিয়া হয়েছেন দেশনেত্রী।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, বাংলাদেশে সম্প্রতি বিদ্যুতের মতো অনেক কিছুই তীব্ৰ অভাব দেখা দিয়েছে; কিন্তু বন্যার পানির মতো যে-জিনিশটার প্রাদুর্ভাব হয়েছে তা হলো নেতা-কর্মীর। একটা দলের যিনি নেতৃত্ব দেন, তিনি নেতা। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন থাকতে পারেন, যাদের বলা যায় নেতৃস্থানীয়। কিন্তু এখন গ্রাম পর্যায়েও দলের নেতা তৈরি হয়েছেন। এতো নেতা যে, কোনো ভিড়ের মধ্যে একটা লাঠি ছুড়ে মারলে আধ-ডজন নেতা আহত হন। আর, নেতা-কর্মী? এ এক অদ্ভুত পরিভাষা। যা আগে ছিলো সমর্থক, সক্রিয় সমর্থক অথবা কমী, তাই এখন পদোন্নতি পেয়ে নেতাকমীতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক টাউট, দলীয় চাঁদাবাজ এবং মহাফাজিলসবাই এখন নেতাকমীর পদ অলকৃত’ করেছেন। বাঙালিরা কর্তাভজা— শক্তের ভক্ত, নরমের যম। পেছনে গাল দিলেও ক্ষমতাবানের সামনে তারা হাত কচলাতে অত্যন্ত পারদশী। (একটা জন্তুর কথা তারা মনে করিয়ে দেন। সে জন্তুটা মালিক এবং মালিক-স্থানীয় সবার সামনে হাত কচলানোর বদলে একটা বিশেষ অঙ্গ নাড়তে থাকে।) এ জন্যে উচ্চপদস্থ কোনো সরকারি কর্মচারীর সামনে পড়লে বাঙালিরা কেচো হয়ে যান। কী বলে সম্মান জানাবেন ভেবে পান না। তাই একটার পর একটা বিশেষণের আশ্রয় নিতে থাকেন। যেমন, কোনো মন্ত্রী এলে তাঁকে অমুক সাহেব অথবা জনাব অমুক বললে যথেষ্ট মনে করেন না। বলেন মাননীয় মন্ত্রী। মন্ত্রী কথাটাই যথেষ্ট সম্মানের। কিন্তু মাননীয় বললেও যথেষ্ট হয় না। অনেকে বলেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় মন্ত্রী। ভাবখানা। এই যে, এ দেশে সরকার ছাড়া অন্যদেরও মন্ত্রী আছে। অনেকে আবার বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী বলে বিবেচনা করেন যে, কথাটা যথেষ্ট গালভারি হলো না। তারা তখন বলেন–গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় মন্ত্রী–যদিও এরশাদী সংশোধনের পর আক্ষরিক অর্থে বাংলাদেশ এখন আর গণপ্রজাতন্ত্রী নেই। কারণ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এখন আল্লাহর ওপর বর্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ যেহেতু কাৰ্যত নির্বাচিত একনায়কের দেশ, সে জন্যে মন্ত্রীর তুলনায় প্রধানমন্ত্রীর স্থান অনেক উচুতে। তাই মাননীয় বিশেষণ তীর জন্যে যথেষ্ট নয়। তাঁর নামের আগে আরও দু-একটা বেশি বিশেষণ স্বভাবতই প্রয়োজন হয়। যেমন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া জননেত্রী মহামান্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (খালেদা জিয়াকেও সম্প্রতি কী কী বিশেষণে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তার খেই হারিয়ে ফেলেছি।) এই বিনয়ের স্রোতে ভেসে-যাওয়া আত্মসম্মানবর্জিত মহাভণ্ড লোকগুলোই আবার শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে সরে গেলে তাঁর মুণ্ডুপাত করে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর ভজনা শুরু করেন। রাতারাতি অফিসে নতুন ছবি টানান। প্রথম আলোতে প্ৰকাশিত একটি চিঠি থেকে জানতে পারলাম যে, এবারের স্বাধীনতা দিবসে (২০০৬) বাংলাদেশ টেলিভিশন (আসলে হিজ মাস্টার্স ভয়েস অব বাংলাদেশ) থেকে যে-সম্প্রচার করা হয়, তাতে একবারও নাকি শেখ মুজিবের নাম বলা হয়নি। বেশ্যারও বোধহয় খদ্দেরের প্রতি এর চেয়ে বেশি আনুগত্য থাকে। বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিকদের নামের সঙ্গে আরও যেসব অর্থহীন বিশেষণ ব্যবহৃত হতে দেখেছি, সেগুলো হলো: মহানায়ক, মহান নেতা, ক্ষণজন্মো, রূপকথার নায়ক, জনগণের নেতা, মজলুম জননেতা ইত্যাদি। এ রকম একটা দৃষ্টান্ত দিই। মণি সিংহ সম্পর্কিত একটি লেখা থেকে। এতে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বর্ণাঢ্য ও সংগ্ৰামী রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মণি সিংহের জীবনাবসান ঘটে…।”
