(যুগান্তর, অক্টোবর ২০০৬)
২৪. বাঙালির আদিখ্যেতা
আদিখ্যেতা কথাটার মধ্যেই আছে আদিখ্যেতা। কারণ, “অধিক’ শব্দের বিশেষ্য হলো আধিক্য’। কিন্তু বাঙালিরা এই একটা প্রত্যয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেননি। তাঁরা “আধিক্য’র পরে ব্যাকরণের মাথা খেয়ে আবার একটা ‘তা’ প্ৰত্যয় জুড়ে দিয়ে শব্দটাকে করেছেন “আধিক্যতা’–চলতি বাংলায় আদিখ্যেতা”। (অনেকে যেমন ভুল করে দারিদ্র্যতা লেখেন, তেমনি।)। আসলে, বাঙালির চরিত্রেই এই আদিখ্যেতা রয়েছে, রয়েছে সবকিছুকে বাড়িয়ে, অতিরঞ্জন করে বলার প্রবণতা। প্রশংসা করলে বাঙালিরা যেমন মাত্রা ছাড়িয়ে যান, নিন্দা করলেও তেমনি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
এটা যে, সাম্প্রতিক বৈশিষ্ট্য, তা মনে করার কারণ নেই। কারণ, মধ্যযুগের সাহিত্যও দেখতে পাই সবচেয়ে বহুলব্যবহৃত অলঙ্কার হলো: অতিশয়োক্তি অলঙ্কার। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে মুসলমান জমিদার হাসনের লাখ লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে মনসা দেবী দু লাখ নাগ, বাইশ লাখ ভুজঙ্গ, বিশ লাখ ফণা-ধরা মহাপদ্ম নাগ এবং ছত্রিশ লাখ তক্ষক পাঠিয়েছিলেন। মনসামঙ্গলের অনেক পরে লেখা মুসলমানী পুঁথিতেও লাখ লাখ সৈন্য মরার কথা বলে কবি পরীক্ষণে বলেছেন, ‘শুমার করিয়া দেখি চল্লিশ হাজার।’
যে-যুগে মানুষ বয়স গুনতো কুড়ি দিয়ে, সেই যুগে হাজার, লাখ, কোটি–এসব শব্দের বিশেষ কোনো অর্থ ছিলো না! বোধ হয়। আধুনিক কালেও নেই। তা না-হলে একটি বাক্যে কেউ হাজার হাজার (অথবা কোটি কোটি) সালাম ও আদাব জানাতে পারে? হাজার আর লাখ এত অর্থহীন হয়েছে যে, সম্প্রতি হাজারের বদলে লেখা হচ্ছে–হাজারো। লাখের বদলে লাখো।
মনে মনে অন্যের সম্পর্কে যাই ভাবুন, বাঙালিরা বাইরে অন্তত বিনয়ে বিগলিত। ‘পরম পূজনীয়েষ্ণু’, ‘পরম শ্ৰদ্ধাভাজনেষু ইত্যাদি সম্বোধন করে যাদের কাছে চিঠি লেখা হয়, তাদের সবার প্রতিই পত্ৰলেখকের যে-অগাধ অথবা আন্তরিক শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা থাকে, তা হলপ করে বলা যায় না। শ্ৰীশ্ৰীচরণকমলেষুর পাদপদ্মে’ (একই কথা, অতএব আদিখ্যেতা) প্ৰণতি জানাবার সময়ে ভক্তির চেয়ে ভণ্ডামি অনেক বেশি থাকে। এমনি ভণ্ডামির দৃষ্টান্ত হলো: প্রভৃতি খানাপিনার আয়ােজন করে নিমন্ত্রণ করার সময়ে চারটে ডাল-ভাত’ খাওয়ার কথা বলা। প্রাসাদের মতো অট্টালিকা নির্মাণ করে তার নাম দেওয়া ‘পর্ণকুটীর’।
বস্তুত, এ রকমের অতিরঞ্জন থেকেই বাংলা বিশেষণগুলো ধীরে ধীরে ধার খুইয়ে ফেলছে। বিশেষণের আগে তাই লাগাতে হচ্ছে ভীষণের মতো বিশেষণীয় বিশেষণ। যেমন, ভী-ষ-ণ সুন্দর, ভীষণ ভালো। আমার ধারণা, এই ধরনের ব্যবহার সম্প্রতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন, “মহা’ শব্দটির ব্যবহার। সম্ভবত ’৭২ সালে সবার আগে বাংলা একাডেমীর পরিচালক মহাপরিচালক হন। তারপর মহামারীর মতো দেখা দিলো মহাসচিব, মহাজোট, মহাসম্মেলন, মহাসড়ক, মহানগরী। সম্ভব-অসম্ভব সব বিশেষণের আগেই মহা’ এসে মহা উৎপাত শুরু করলো। এভাবে মহা শব্দটিই এখন তার মাহাত্ম্য হারিয়ে ফেলেছে। মহারা মাহাত্ম্য হারানোর একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি। স্বাধীনতার পরে লক্ষ্য করলাম, জনসভাকে লেখা হচ্ছে সমাবেশ। আর শেখ মুজিবের মতো বড় নেতার সভাকে বলা হচ্ছে মহাসমাবেশ। সত্যি সত্যি তখন তাতে অনেক লোক হতো। কিন্তু এখন রাজাকারনেতার সভায় কয়েক ডজন খুদে রাজাকার উপস্থিত হলেও তাকে কেউ কেউ বলেন মহাসমাবেশ। অতঃপর মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর সভাকে কী বলা হবে?–মহামহাসমাবেশ অথবা মহাজনসমুদ্র? (এখনই বলে রাখি, মহাজনসমুদ্র লেখার বিপদ আছেএখন সমাস বিশ্লিষ্ট হবার জামানায় ওটাকে কেউ মহাজন-সমুদ্র মনে করতে পারেন, বিশেষ করে দেশে যখন মহাজন অর্থাৎ ধার-দেনেওয়ালা এবং মহৎ জনদের এতো আদিখ্যেতা হয়েছে!
রাজনৈতিক আদিখ্যেতারও দুয়েকটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। শেখ মুজিব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা— এ বিষয়ে রাজাকার ছাড়া অন্যদের কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু প্ৰতিষ্ঠাতা না-বলে তাকে বলা হয়–জাতির জনক। কথাটা এসেছে সম্ভবত ইংরেজি ফাউন্ডিং ফাদার/ফাদার অব দ্য নেশন থেকে। বহুল প্রচলিত এক্সপ্রেশন–বাংলা ভাষা একে মেনে নিয়েছে। শুনতে অতো খারাপ লাগে না। কিন্তু মুজিবের ক্ষেত্রে ঐ একটা বিশেষণ অনেকে যথেষ্ট মনে করেন না–তাঁর দ্বিতীয় বিশেষণ তাই বঙ্গবন্ধু। সম্প্রতি এক জায়গায় এ দুটির সঙ্গে তৃতীয় আরেকটি বিশেষণ দেখলাম ‘বাংলাদেশের স্থপতি’। যারা ব্যক্তিপূজা করেন, তাদের কথা আলাদা; কিন্তু যারা পূজা করেন না, তেমন কারো তুলনায় শেখ মুজিবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা একটুও কম নয়। আমি বিশ্বাস করি, তিনি যা করেছেন, তার জন্যে তিনি অবশ্যই সর্বকালের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিশেবে ইতিহাসে মর্যাদা পাবেন। কিন্তু এ কথা মনে করা সত্ত্বেও এ যাবৎ আমি কখনো “বঙ্গবন্ধু’ লিখিনি। এবং মনে করি, তাঁর পুরো নাম নয়, তাকে সংক্ষেপে কেবল মুজিব বললেই যথেষ্ট হয়। সক্রেটিস যদি কেবল সক্রেটিস, গেলিলিও যদি গেলিলিও, শেক্সপীয়র যদি শেক্সপীয়র, নিউটন যদি নিউটন, লিঙ্কন যদি লিঙ্কন, আইনস্টাইন যদি আইনস্টাইন এবং ম্যান্ডেলা যদি শুধু ম্যান্ডেলা নামে পরিচিত এবং বিখ্যাত হতে পারেন, তবে মুজিব বলার সময় প্রতিবার তাঁকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বলতে হবে কেন?
