বিষাদ সব মহৎ সাহিত্যেরই সাধারণ লক্ষণ। শামসুর রাহমান তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর অনেক কবিতায় বিষাদের ঘন ছায়া চেষ্টা না-করলেও চোখে পড়ে। তা সত্ত্বেও তার কাব্যে গোড়া থেকেই একটা আশাবাদ লক্ষ্য করি। তিনি দ্বিতীয় বার মৃত্যুর আগেও প্রথম গান গেয়েছেন, করোটির ওপরও রৌদ্র দেখতে পেয়েছেন। নিরালোকেও তিনি দিব্যরথে চড়েছেন। তার এই আশাবাদ তাঁর পাঠককে উদ্বোধিত করে, অনুপ্রেরণা দেয়। শেষ পর্যন্ত এই আশাবাদ তিনি বজায় রেখেই কবিতার সঙ্গে গোরস্থালি করে গেছেন। তাঁর শেষ জন্ম দিনের একটি সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম, তাতে তিনি হতাশায় অন্ধকার দেশ সম্পর্কে এই আশাবাদের কথা বলেছেন। আস্থা হারাননি। তিনি বলেছেন, তিনি হয়তো দেখে যেতে পারবেন না, কিন্তু বর্তমানের নীরন্ধ অন্ধকারে আবার আলোর বন্যা আসবে। তাঁর এই ইতিবাচক কণ্ঠস্বর দৈববাণীর মতো আশ্বাস দেয়।
শামসুর রাহমানের আর-একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকে আমাদের জাতীয় জীবনের পথ কখনো সমতল ছিলো না। তাতে অনেক চড়াই-উৎরাই ছিলো। সেই পরিবেশে দেশের প্রতি একজন সমাজসচেতন কবির যে দরদের দৃষ্টি থাকবে, সে তো স্বাভাবিক। কিন্তু শামসুর রাহমানের মধ্যে দেশপ্রেম একটু প্রবলভাবেই লক্ষ্য করা যায়। তার ভালোবাসা দেশ এবং মাটির জন্যে, ভাষার জন্যে, নিপীড়িত মনুষ্যত্বের জন্যে, স্বাধীনতার জন্যে। দেশকে তিনি তুলনা করেছেন মায়ের সঙ্গে— তাতে এমন কিছু অভিনবত্ব নেই, কিন্তু তিনি যখন মাকে তুলনা করেছেন দেশের সঙ্গে— স্বদেশের স্বতন্ত্র মহিমা অনন্য উপমা তার–তখন বোঝা যায়, দেশের জন্যে তার ভালোবাসা কতো আন্তরিক। টেলিমেকাস, বর্ণমালা, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, আসাদের শার্ট, তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে, একটি মোনাজাতের খসড়া, বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় ইত্যাদি কবিতায় দেশের নানা স্বপ্ন দেখেছেন তিনি।
বস্তুত, তাঁর কবিতা আমাদের একদিকে যেমন স্বাধীনতা আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে, অন্য দিকে তেমনি তাঁর কবিতা আমাদের স্বাধীনতার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখার জন্যে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি দুঃখিনী বর্ণমালাকে দেখে। যেমন শোকাহত হয়েছেন, তেমনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন উদ্ভট উটের পিঠে স্বদেশকে চলতে দেখে। তাঁর দেশপ্ৰেমমূলক কবিতা তার প্রেমের কবিতার মতোই হৃদয়কে নাড়া দেয়। আমার ধারণা, রবীন্দ্রনাথের পরে তিনিই বাংলা ভাষায় সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে বেশি দেশাত্মবোধক কবিতা রচনা করেছেন। নজরুল ইসলামের কথা আমি ভুলে যাচ্ছি না। এ দুজনের দেশাত্মবোধক কবিতার চরিত্র আলাদা। নজরুলের দেশাত্মবোধক কবিতা বিদ্রোহমূলক, রাজনৈতিক; শামসুর রাহমানের দেশাত্মবোধক কবিতা দেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম প্রেমের কবিতা।
ভাষা ব্যবহারে তাঁর বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ না-করলে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হয় না। নজরুল ইসলাম থেকে আরম্ভ করে বিশ শতক জুড়ে যে-মুসলমান কবিসাহিত্যিকরা লিখেছেন, তাদের সবার ভাষাতেই মুসলমানী শব্দ অর্থাৎ আরবিফারসি শব্দের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। কারণ ব্যক্তিগত এবং প্রাত্যহিক জীবনেই তাঁরা এ ধরনের শব্দ বেশি ব্যবহার করতেন। কিন্তু শামসুর রাহমানের ভাষায় তাঁর ধর্মীয় চরিত্র প্রাধান্য পায়নি। তিনি আরবি-ফারসি এবং গ্রামীণ শব্দ প্রচুর ব্যবহার করেছেন, কিন্তু প্রয়োজন অনুসারে। এ ক্ষেত্রেও তাঁর মধ্যে এক ধরনের নাগরিকত্ব লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে আরও বলা উচিত যে, তিনি ভাষা এবং শব্দ ব্যবহারে অত্যন্ত সচেতন এবং সব সময়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। ঢাকার কুট্টিদের ভাষায় কবিতা লেখা যায়। কিনা, সে পরীক্ষাও তিনি সফলভাবে করেছেন। ছন্দের ক্ষেত্রে তিনি বৈশিষ্ট্য রেখেছিলেন সেই পুরোনো অক্ষরবৃত্তের মধ্যেই। যদিও তিনি অন্য ছন্দ নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন।
শামসুর রাহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিলো— এর জন্যে আমি সত্যি গর্ব অনুভব করি। এই পরিচয় থেকে একটা জিনিশ সব সময়ই চোখে পড়েছে। তিনি অসম্ভব নিরহঙ্কার লোক ছিলেন। নিজের ঢাক বাজাতে আমরা সবাই আগ্রহী। আমরা অনেকেই মনে করি, নিজের ঢাক নিজে না-পেটালে, আর কে পেটাবে। এবং শূন্যপোত্রই বেশি ঝনঝন করে। কাজেই আমাদের ঢাকই প্রবল শব্দে বাজে। শামসুর রাহমান এর উল্টো ছিলেন। তিনি নিজেকে জাহির করেননি–কী দেশে, কী বিদেশে। সম্প্রতি উইলিয়াম র্যাডিচি একটি প্রবন্ধে বলেছেন যে, শামসুর রাহমান যদি তার কাব্যসমূহের অনুবাদ করানোর ব্যাপারে এবং প্রচারের ব্যাপারে তৎপর হতেন, উদ্যোগী হতেন, বিদেশের সমালোচকদের নজরে আসতেন, তা হলে, তার পক্ষে নোবেল পুরস্কার পাওয়াও হয়তো অসম্ভব হতো না। কিন্তু আত্মপ্রচারে বিমুখ এই লাজুক মানুষটি নিজেকে চিরদিন লুকিয়ে রাখলেন!
কাছের মানুষকে আমরা যথাযথ সম্মান দিই না, সম্মান দিতে শিখিনি। তাদের আমরা নিজেদের প্রতিপক্ষ বলে বিবেচনা করি। তারপর সাধারণত মরার পর আমরা অনুষ্ঠান করে তাদের প্রতি সম্মানের পাত্ৰ উজাড় করে দিই। শামসুর রাহমান যে অতো মহৎ একজন কবি ছিলেন, আমার মনে হয়, আমরা তা বুঝতে পারিনি। তার জীবদ্দশায় জীবনানন্দকে পেরেছিলাম? পারিনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শামসুর রাহমান ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবেন না। বরং বাংলা সাহিত্যের পাঠকরা তার কাব্যে আরও গুণ দেখতে পাবেন। তার কাব্য আরও ভালোবাসবেন। তাকে মনে রাখবেন দীর্ঘকাল।
