সাৰ্বজনিক সাহিত্য হিশেবে সীমাবদ্ধতা যা-ই থাকুক না কেন, এই দুই ধারার কোনোটাকেই কৃত্রিম বলা যায় না। কারণ, পূর্ব বাংলার পিিছয়ে-থাকা মুসলমান সমাজে ইসলামী জাতীয়তাবাদী চেতনা প্ৰবল থাকাই তো স্বাভাবিক! আবার কবিদের সবারই শেকড় যেহেতু প্রোথিত ছিলো গ্রামের মাটিতে, সে জন্যে তাদের পক্ষে পল্লীর উপাদান নিয়ে সাহিত্য রচনাও ছিলো স্বাভাবিক।
হয়তো আরও অনেক কাল চলতো এই দুই ধারার অনুবর্তন। কিন্তু শামসুর রাহমান সেই পরিবেশে এই দুই ধারার ঠিক বিপরীত দিকে গেলেন। তিনি ইসলামী ভাবধারা দিয়ে উদ্ধৃদ্ধ হননি। জসীমউদ্দীনের “পল্লীসাহিত্য” দিয়েও নয়। ছাত্রজীবনেই তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে। জীবনানন্দের ভাষা এবং বৈশিষ্ট্য তিনি দ্রুত কাটিয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তাঁর সেকুলার মানবিক আবেদনের কবিতা তাঁর অন্তরকে নাড়া দিয়েছিলো। তিনি তাই ধর্মীয় জাগরণমূলক মুসলমানী কবিতা লিখলেন না। তাঁর কাছে হিন্দু অথবা মুসলমানের থেকে মানুষ অনেক বড়ো। তিনি মানুষের কবিতা লিখলেন। আবার, মানুষের কবিতা লিখতে গিয়েও তিনি কুলি-মজুরদের উদ্ধার করার কবিতা লিখলেন না। ধর্ম এবং জাগরণমূলক কবিতার বদলে ব্যক্তিগত অনুভূতির, প্রেমের, প্রকৃতির, দেশের, সৌন্দর্যের কবিতা লিখেছেন তিনি। ধর্মীয় ধারার বদলে তিনি প্রবর্তন করেন একটি সেকুলার রোম্যান্টিক ধারা। সে অর্থে তিনিই পূর্ব বাংলার প্রথম বিশুদ্ধ কবি।
দ্বিতীয়ত, পল্লীসাহিত্যের ধারাও তিনি অনুকরণ করলেন না। তাঁর জন্ম নগরে সেটাই তার একমাত্র কারণ নয়। মন-মানসিকতার দিক দিয়েও তিনি ছিলেন নাগরিক। পল্লীবাংলার উপাদান, পল্লীর অনুষঙ্গ এবং গ্রামের ভাষা তাকে বিশেষ অনুপ্রাণিত করতে পারেনি। তবে তিনি নাগরিক বিষয়বস্তু নিয়ে কাব্য রচনা করেন–কেবল এই অর্থেই তিনি নাগরিক কবি নয়। তিনি বিদগ্ধ কবি–এই অর্থেও নাগরিক। তার মধ্যে কোনো গ্ৰাম্যতা ছিলো না।
সব কবিই রোম্যান্টিক। কিন্তু শামসুর রাহমান এমন আপাদমস্তক রোম্যান্টিক ছিলেন যে, সেটা আলাদা করে উল্লেখ না-করলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। রোম্যান্টিক বললে অনেকেই প্রেমের কথা ভাবেন। কিন্তু তিনি তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন, তার প্ৰেম, তাঁর আশা-নিরাশা সবই দেখেছেন রঙিন রোম্যান্টিক আলোতে, কঠোর বাস্তবতার খররৌদ্রে নয়। মানুষ দুঃখ নয়, আনন্দের ভিখিরি। কিন্তু তিনি দুঃখ নিয়েও এমন রোম্যান্টিক হয়েছেন যে, তাকে দুঃখবিলাস বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। তাঁর “হৃদয়ে-লতিয়ে-ওঠা একটি নিভৃত্যতম গানে / সুখে নিদ্রায় কিবা জাগরণে, স্বপ্নের বাগানে, / অধীরের অধীর চুম্বনে সান্নিধ্যের মধ্যদিনে / … দুর্কিনীত ইচ্ছার ডানায় / আসক্তির কানায় কানায়”–সর্বত্রই দুঃখ তার নাম লেখে।
সত্যি বলতে কি, জীবন এবং মৃত্যু উভয়ের কথা বলতে গিয়েই তিনি তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। জীবনকে তিনি দারুণ ভালোবাসতেন। জীবন তাঁর কাছে ঝাঁ ঝাঁ রোদে লাঙল চালানো, মেঘনার ঢেউয়ে দাড় বাওয়া, শীতার্তা রাতে আগুন পোহানো নিরিবিলি, কারখানার কালি মুছে বাড়ি ফেরা এক শিস দিয়ে, বইয়ের পাতায় মগ্ন হওয়া, সহপাঠিনীর চুলে অন্তরঙ্গ আলো তরঙ্গের খেলা দেখা, মিছিলে এগিয়ে চলা, নিশান ওড়ানো।
মনে আছে, তাঁর ষাট বছর পূর্তি হওয়ার পর আমি বিবিসির জন্যে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তাতে তিনি বলেছিলেন যে, তিনি নিজেকে বৃদ্ধ বলে কল্পনা করেন না। তিনি মনের চোখে দেখতে পান যে, তিনি হাফ-প্যান্ট পরে স্কুলে যাচ্ছেন। চোখের সামনে অনেক লাল-নীল-সবুজ দেখতে পান। তিনি। বয়স যে বাড়ছে, এটা তিনি প্রায় অস্বীকার করতে চেষ্টা করেছেন। “বয়সের ওষ্ঠে ঠোঁট রেখে দেখি দূরে / বয়স দাঁড়িয়ে থাকে বালকের মতো আলোজ্বালা গলির ভেতরে।” কবি আর ব্যক্তি হুবহু এক হয় না। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি এই রোম্যান্টিক প্ৰেমাকুল মনোভাব বহাল রেখেছিলেন। ভালোবাসায় তিনি উদার ছিলেন। ভালোবাসতেই তিনি ভালোবাসতেন। অনেক জায়গায় তার ভালোবাসা রীতিমতো দেহঘন। “তোমার শরীর কোথাও নিরালা পথ, মসৃণ অথবা তরঙ্গিত, / কোথাও বা সুরভিত ঝোপ, আমার ওষ্ঠ-পথিক / ক্রমাগত আঁকে পদচিহ্ন সবখানে। … তোমার সপ্ৰাণ চুললগ্ন বেলফুল / কী কৌশলে আমার বয়স নিয়েছিল চুরি করে।” “অবৈধ সঙ্গম করে ঘামে নেয়ে উঠতে পারি সহজ অভ্যাসে।” এসব কবিতা তিনি লিখেছিলেন। প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়ে। তাঁর কবিতায় ভালোবাসাবাসির ছড়াছড়ি নিজেই তা স্বীকার করেছেন। “আমার কবিতা পথপ্ৰান্তে দুঃখীর চোখের মতো / চোখ মেলে চেয়ে থাকে কার পায়ের ছাপের দিকে, / গা ধোয় ঝরনার জলে। স্বপ্ন দেখে বনদেবী তার / ওষ্ঠে ঠোঁট রেখে হু হু জুলছেন সঙ্গম-লিপ্সায়।”
জীবনের প্রতি এই কামরাঙা ভালোবাসা সত্ত্বেও নিজের মৃত্যু নিয়েও তিনি বিলাস করেছেন বহু কবিতায়। তাঁর বয়স যখন চল্লিশের চেয়েও কম, তখন বিবেচনা” বলে একটি কবিতায় ভেবে নিয়েছেন: যেদিন তিনি খাটে নিশ্চেন্তন হয়ে পড়ে থাকবেন, সেদিন হয়তো কাঁদবে কেউ; আত্মীয় স্বজন কেউ কেউ শোকে ধোবে সত্তা, প্রতিবেশীদের কোনো একজন হয়তো বলবে, লোকটা নাস্তিক ছিলো, শরিয়তে মোটেই ছিলো না মন, মসজিদে তার সাথে কখনো হয়নি দেখা, এবং নিষিদ্ধ দ্রব্যে ছিলো তার উৎসাহ প্রচুর। তাঁর মৃত্যুর দিনটা কেমন হবে, আবহাওয়া কেমন থাকল ভালো হয়, তাও তাঁর কল্পনাকে উস্কে দিয়েছে। এমন কি, তিনি যে বলে গেলেন যে, তাকে যেন সমাধিস্থ করা হয় তার মায়ের সমাধিতে–সেও এক করুণ রোম্যান্টিক কল্পনা। দিনের শেষে মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার ভাবনা থেকে ৷ প্ৰসঙ্গত বলতে হয়, মা তাঁর সত্তায় একটা প্রগাঢ় আসন জুড়ে আছেন। প্রতিদিন ধ্যানী প্ৰদক্ষিণে ছায়াবৃত আপন সংসারে তিনি মাকে দেখতে পান। মায়ের অন্তহীন স্নেহের সলিলে সিক্ত তাঁর সমগ্র অস্তিত্ব।
