অদৃষ্টর পরিহাস এই যে, যে-নজরুল ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার গান গেয়েছেন, মুসলমানরা, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা সেই নজরুলের নাম ব্যবহার করেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের নিশান উড়িয়েছেন। তাঁরা নজরুলের নাম ভাঙিয়েছেন নিজেদের সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্যে। রবীন্দ্রনাথ থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্যে পাকিস্তানীরা নজরুলকে খাড়া করেন মুসলমান-রবীন্দ্রনাথ হিশেবে। তাঁর কবিতার ভাষা সংস্কার করে তারা নজরুলের ‘ভগবান’কে “রহমানে’ পরিণত করেন। মহাশ্মশানকে বদলে করেন ‘গোরস্থান’। সামগ্রিক নজরুলকে নয়, তারা খাড়া করলেন এক খণ্ডিত নজরুলকে। নজরুলের ইসলামী গান বাজানো হলো বেতারে, টিভিতে। নজরুল যে শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন এবং অন্যান্য ভক্তিবাদী গানও লিখেছিলেন, তার কথা কেউ জানলোও না। পাঠ্যবইতে তিনি যে-প্রাধান্য পেলেন তা তার অবদানকে ছাড়িয়ে গেলো। এমন কি, অনেক সময়ে রবীন্দ্ৰনাথ ম্লান হয়ে গেলেন নজরুলের ছায়ায়। যে-কালে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করাকে সরকার ভালো চোখে দেখতো না, নজরুল-জয়ন্তী পালনে সরকারের উদার পৃষ্ঠপোষণা মিললো।
এমন কি, যে-নজরুলকে ১৯২০-এর দশকে মুসলমানরা নিমরুদ, ফেরাউন, শয়তানের অবতার এবং কাফের বলে গাল দিয়েছিলেন, সেঁহী নজরুল পঞ্চাশের দশকে সংস্কার-সাপেক্ষে মুসলমান হয়ে উঠলেন, আর শতাব্দীর শেষে এসে নব্যসাম্প্রদায়িকতায়-উন্মত্ত লোকেদের কাছে তিনি পাক্কা মুসলমানে পরিণত হলেন। নজরুল একদিনে মরেননি। তিনি নির্বাক হয়ে বেঁচেছিলেন পয়তিরিশ বছর। তারপর কেটে গেছে আরও তিরিশ বছর। এই প্ৰায় পয়ষট্টি বছরের মধ্যে তিনি কয়েকবার মারা যান। তাঁর গানের চরম অনাদর থেকে মনে হয়, তিনি প্রথম বার মারা যান পশ্চিমবাংলায়, দেশবিভাগের ঠিক পরে। মনে হয়, তার পেছনেও ছিলো। সাম্প্রদায়িকতা। দ্বিতীয় বার তিনি মারা যান পূর্ব পাকিস্তানে, তাকে খণ্ড খণ্ড করে হাজির করায়। তৃতীয়বার মারা যান বাংলাদেশে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করায়। চতুর্থবারও মারা যান বাং–মৌলবাদীদের হাতে। এবারে কেবল ব্যক্তি নজরুল নন, তাঁর আদর্শও ভূত অর্থাৎ অতীত হয়ে যায়। নজরুল মরেও মুসলিম জাতীয়তাবাদের হাত থেকে রেহাই পাননি। পরিজনের মতামত ছাড়াই তাকে যে ঢাকায় সমাধিস্থ করা হয়, সেও ইসলামের প্রতীক হিশেবে তাঁর নাম ব্যবহার করার জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্য থেকেই।
অথচ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে উভয় বাংলাতেই বাঙালিত্ব যখন বিপন্ন, এমন কি, বিপন্ন যখন মনুষ্যত্ব, তখন নজরুলের বেঁচে থাকাটাই খুবই দরকার ছিলো। বস্তুত, একজন নজরুল নয়, খুবই দরকার ছিলো ঘরে ঘরে নজরুলের।
(মেলালেন, তিনি মেলালেন? নামে প্রকাশিত দৈনিক স্টেটসম্যান, নজরুল জয়ন্তী, ২০০৫)
২৩. শামসুর রাহমান: মুকুটহীন জাতীয় কবি
কোনো খেতাবে তিনি বিশ্বাস করতেন না। সরকারী খেতাব তার ভাগ্যে জোটেওনি। যাঁরা বিবেকের কথা বলেন, স্রোতের বিরুদ্ধে চলেন, হুক্কাহুয়ায় শরিক হন না, তাদের জন্যে কোনো খেতাব জোটাও শক্ত। তাই মুকুট তিনি পাননি, মৃত্যুর পর রাষ্ট্ৰীয় সম্মানও নয়। কিন্তু তিনি ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি, নিঃসন্দেহে। জাতীয় কবি–নানা কারণেই। রবীন্দ্ৰ-পরবর্তী তিরিশের দশকের কয়েকজন কবি মিলে নতুন যুগ সৃষ্টি করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু— প্ৰত্যেকেই ছিলেন নিজের নিজের বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁরা স্থায়ী আসন পাবেন বলে মনে হয়। তবে তার পরের অর্ধ-শতাব্দী ধরে যারা বাংলা কাব্যের আসরে আবির্ভূত হন, তারা আগের কবিদের তুলনায় কম সাফল্য লাভ করেছেন। তাঁরা কেউ যুগ সৃষ্টি করতে পারেননি। পাঠকরা তাদের কতোদিন মনে রাখবেন, বলা শক্ত। তা ছাড়া, তাদের অনেকে আঞ্চলিক কবি হিশেবে পরিচিত, অখণ্ড বাংলা সাহিত্যের কবি নন। তাঁরা কেউ পশ্চিবঙ্গের কবি, কেউ পূর্ব বাংলার অর্থাৎ বাংলাদেশের কবি। এই আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করে বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি হয়েছিলেন শামসুর রাহমান। আর বাংলাদেশের কথা উঠলে এক বাক্যে বলতে হয় যে, মোটামুটি দেশ-বিভাগের পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অর্ধ-শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তিনি আমাদের সাহিত্যের মধ্যমণি হয়ে বিরাজ করেছিলেন।
কেবল এই ব্যাপ্তি অথবা কবিতার প্রাচুর্যের জন্যে নয়, তাঁর কৃতিত্বকে আরও বড়ো করে দেখতে হয়। এ জন্যে যে, তার কবিতা সত্যি সত্যি হৃদয়কে নাড়া দেয়। কবি তাঁর আবেগকে পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চারিত করতে পারেন জাদুকরের মতো তার নিজস্ব ভাষা, ছন্দ এবং ভঙ্গি দিয়ে। এবং সেটাই তো একজন মহৎ কবির কাজ! তিনি যথার্থই সহৃদয়হৃদয়সংবাদী। তাঁর ভাষা এবং ভঙ্গি এমন বিশিষ্ট রঙে রাঙানো যে, অমনোযোগী পাঠকও চিনতে পারবেন যে, তাঁর কবিতা তারই কবিতা।
আর, সাহিত্যের ইতিহাসের কথা বিবেচনা করলে, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার সাহিত্যের কথা বিবেচনা করলে তাঁকে কৃতিত্ব দিতে হয় একটা নতুন ধারার প্রবর্তক হিশেবে। সত্যি বলতে কি, তিনি কেবল সেই নতুন ধারার প্রবর্তক নন, তার সবচেয়ে বড়ো এক্সপোনেন্টও। পূর্ব বাংলার সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব এমন একটা সময়ে যখন মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রধানত দুটি ধারা প্রচলিত ছিলো। এক, ইসলামী পুনর্জাগরণের ধারা–যার সূচনা নজরুল ইসলাম থেকে এবং যা বিস্তার লাভ করে ফররুখ আহমদ, বেনজির আহমদ, তালিম হোসেন, মোফাখখারুল ইসলাম প্ৰমুখের মধ্য দিয়ে। আর দ্বিতীয় যে-ধারাটি বহমান ছিলো, সেটি হলো পল্লীসাহিত্যের ধারা। এই ধারার প্রবর্তক ছিলেন জসীমউদ্দীন। এবং বন্দে আলি মিঞাদের মতো অনেকেই এ ধারা কমবেশি অনুকরণ করেছিলেন।
