অল্পকাল আগে বাঙালি সংস্কৃতির একটি ইতিহাস লিখে তারপর তার নির্ঘণ্ট তৈরি করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে উল্লেখ আছে। ছিয়াশিটি পৃষ্ঠায়; আর শেখ মুজিব সম্পর্কে চারটি পৃষ্ঠায়। আমি রবীন্দ্রনাথের ভক্ত নিঃসন্দেহে, তবে অন্ধভক্ত নই; কেবল তাই নয়, যারা অন্ধভক্ত তাদের আমি অপছন্দ করি। গুরুগিরিতে আমার বিশ্বাস নেই। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের কথা আমি বাড়িয়ে লিখিনি। এ ইতিহাসে তাঁর যতোটুকু কৃতিত্ব প্রাপ্য, আমি তার বেশি দিইনি বলেই মনে করি। তা সত্ত্বেও ংলা ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, সঙ্গীত, মননশীলতা, ইতিহাস, নাটক, থিয়েটার, সিনেমা, ধর্ম, পোশাক, খাদ্য, নারী ইত্যাদি বিষয়ে লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা বারবার আসতেই পারে। আমরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে রবীন্দ্রবিশ্বেই বাস করি। তা ছাড়া, আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার—রবীন্দ্রনাথ কেবল বঙ্গদেশে অথবা ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা নন। তিনি বিশ্বেরই চিরকালের একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি। ধরা যাক, দা ভিঞ্চি। অসাধারণ প্ৰতিভার অধিকারী ছিলেন। বিজ্ঞান এবং শিল্পকলা থেকে শুরু করে বহু ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো এতো বৈচিত্র তাঁর প্রতিভাতেও ছিলো না। রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে কবি, নাট্যকার ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্প লেখক, গীতিকার, সরকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, চিত্রশিল্পী—কী না! কাজেই প্রতিভার মানে তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।
অপর পক্ষে, শেখ মুজিব ছিলেন একজন জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী রাজনীতিক। যখন তিনি হয়তো দেশকে আরও দিতে পারতেন, তার আগেই আততায়ীরা তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে। সুতরাং তাঁর নাম আর কতোবারই আসবে? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পৌনঃপুনিক উল্লেখ আর মুজিবের সীমিত উল্লেখ থেকে বাঙালির ইতিহাসে তাদের প্রভাবের পরিমাপ করা বোধ হয় সম্ভব নয়। অর্থাৎ মুজিবের প্রভাব এবং অবদান রবীন্দ্রনাথের ছিয়াশি ভাগের চার ভাগ নয়। বাঙালির ইতিহাসে তাঁর স্থান তার থেকে অনেক ওপরে, অনেক বেশি। তিনি বাঙালিদের চিরস্থায়ীভাবে একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছেন। কেবল তাই নয়, তিনি যে-দেশ তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে ধর্মনির্বিশেষে বাঙালিত্বের বিকাশের সম্ভবনাও অনেক বেশি ছিলো। পিতা সাধারণত সন্তানের একটা নাম দিয়ে সেই নামের মধ্য দিয়ে একটা প্ৰত্যাশা ব্যক্ত করেন। এক সময়ে বৃহত্তর বঙ্গদেশের জনপ্রিয় নাম ছিলো বাংলাদেশ। শেখ মুজিব তাঁর স্বপ্নে দেশকে ভালোবেসে সেই পুরোনো বাংলাদেশ নামটাই দিয়েছিলেন। সেই দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিশেবে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথেরই একটি গান–আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। অনেক সময়ে তিনি বক্তৃতায় বলতেন “আমি তোমায় খুবই ভালোবাসি।” এই নামের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রত্যাশার খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাংলাদেশের নাগরিকদের সরকারী নাম তিনি দিয়েছিলেন। “বাঙালি’ ৷ হয়তো তিনি আশা করেছিলেন তাবৎ বাঙালির দেশ হবে এই বাংলাদেশ। সব ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতে পারবেন। এখানে স্বাধীনভাবে। এখানে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে অবাধভাবে।
কিন্তু সন্তানের বাল্যকালে পিতার মৃত্যু হলে সে সন্তান যেমন অনেক সময়ে অভীষ্ট পথে যায় না, অথবা যেতে পারে না, শেখ মুজিবের স্বপ্নে-দেখা বাংলাদেশও তার প্রত্যাশিত পথে যায়নি। তার জন্যে দায়ী রাজনীতি। তিনি নিজে অসাধারণ জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী রাজনীতিক হলেও, স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। অসীম সম্ভাবনা এবং জীবনীশক্তি নিয়ে যে-বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো, অচিরেই তা পাগলা ঘোড়ার মতো তার হাত থেকে ফসকে বেরিয়ে যায়–তিনি তার রাস টেনে ধরতে পারেননি। আসলে তিনি যতো বড়ো নেতা ছিলেন, প্রশাসক হিশেবে ততোটাই অযোগ্য ছিলেন। সে কেবল অভিজ্ঞতার অভাবে নয়, শাসক হবার মতো ক্ষমতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তাই তাঁর ছিলো না। সময়টাও তাঁর অনুকুল ছিলো না। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে তিনি আদৌ খাড়া করতে পারেননি। একদিকে, উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো ভেঙে পড়েছিলো; অন্যদিকে, শিল্প-বাণিজ্য এবং প্রশাসন চালানোর মতো অভিজ্ঞ লোকের অভাবও ছিলো। তার ওপর দুনীতি ও দলবাজি মুক্তিযুদ্ধ এবং তার ত্যাগাস্বীকারের স্পিরিটকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছিলো। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ভারতের দাদাগিরির মনোভাবও তাঁর। সহায়তা করেনি। হিন্দুদের প্রতি মুসলমানদের বহু শতাব্দীর অবিশ্বাসও এ সময়ে হাঁ করে বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসাকে গিলে ফেলেছিলো। সর্বোপরি, মোশাহেবপরিবেষ্টিত মুজিব মুক্তচিন্তা এবং জনগণ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলেন। ফলে সপরিবারে চরম মূল্য দিতে হয় তাঁকে। কিন্তু তার থেকে বেশি মূল্য দিতে হয় বাঙালিদের। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশের যে-সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো, তা একেবারে ধূলিসাৎ হয়। ক্ষমতালোভী ফৌজী-শাসকদের হাতে পড়ে এবং পেট্রো-ডলারের কল্যাণে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশই রুদ্ধ হয়নি, সেই সঙ্গে ‘বাঙালি’ পরিচয়ও ধুয়ে-মুছে যায়।
এ অবস্থায় বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে যে-বাঙালি সংস্কৃতি রচিত হবে, তাতে একই সঙ্গে প্রাধান্য পাবে মুসলমানী এবং পূর্ববঙ্গীয় আঞ্চলিক উপাদান। স্বাধীন দেশ হিশেবে রাষ্ট্ৰীয় পৃষ্ঠপোষণায় সেই সংস্কৃতিই হবে অনেক জোরালো এবং ভবিষ্যতের মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতি। বাংলা ভাষাও এ প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে বলে আমি মনে করি না। অপর পক্ষে, ভারতের একটি রাজ্যের সংস্কৃতি হিশেবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সংস্কৃতি দুর্বল থেকে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তাতে প্রাধান্য পাবে হিন্দু উপাদান। তখন ইংল্যান্ডের ইংরেজি এবং মার্কিন ইংরেজির মতো বাংলা ভাষার দুটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হলে অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না।
