তার অর্থ শেখ মুজিব নিজে রবীন্দ্ৰভক্ত হলেও ঠিক এক শো বছর আগে বঙ্গভঙ্গের সময়ে রবীন্দ্রনাথ যে-আশঙ্কা প্ৰকাশ করেছিলেন, মুজিব নিজের অজ্ঞাতে তাকেই বাস্তবায়িত করলেন। রবীন্দ্রনাথের আশঙ্কা ছিলো যে, বঙ্গদেশকে মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গ এবং হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে বিভক্ত করলে কালে-কালে অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি, এমন কি, বাঙালি পরিচয়ও বিনষ্ট হবে। সেই বাঙালি সংস্কৃতি এবং পরিচয়কে আপাতদৃষ্টিতে রীতিমতো রাষ্ট্ৰীয় ভিত্তি দান করেন শেখ মুজিব। মনে হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকেই বাস্তবায়িত করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, স্বাধীন বাংলাদেশ এবং ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবাংলাকে কেন্দ্র করে কালে-কালে অখণ্ড বাঙালিত্ব চিরকালের জন্যে খণ্ডিত হবে মনে হয়। সেদিক দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে শেখ মুজিব কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নন, এমন কি, এক অর্থে, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে?
রবীন্দ্রনাথ বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রসারিত এবং সমৃদ্ধ করেছিলেন–তাকে উৎকর্ষ দিয়েছিলেন। অপর পক্ষে, শেখ মুজিব যা করেন তার ফলে বাঙালি সংস্কৃতি খণ্ডিত হয় এবং তাঁর অভীষ্ট পথে না-গিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। তিনিও রবীন্দ্রনাথের মতো বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশের স্থায়ী ব্যবস্থা করেন, যদিও কার্যকারণে তা এক ভিন্ন বাঙালি সংস্কৃতি। অদৃষ্টের পরিহাস এ সংস্কৃতি স্বাধীন বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেদিকে যাচ্ছে এবং যাবে–তিনি তা কামনা করেননি। কিন্তু তবু তা অবশ্যম্ভাবী। বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে শেখ মুজিব রবীন্দ্রনাথের মতো “শ্রেষ্ঠ” না-হলেও, কম গুরুত্বপূর্ণ নন।
(দৈনিক স্টেটসম্যান, ২০০৫)
২২. নজরুলের ধর্মমত ও অসাম্প্রদায়িকতা
নজরুল ইসলামকে কেউ খুবই ভালোবেসেছেন, কেউ বা অসম্ভব ঘৃণা করেছেন। কিন্তু কেউই তাকে অবহেলা করতে পারেননি। তিনি যখন জনপ্রিয়তার একেবারে তুঙ্গে, তখনো কেবল প্ৰশংসার জোয়ারে ভাসেননি, বরং তীব্র নিন্দা আকর্ষণ করেছেন অনেকের তরফ থেকে। যেমন, মৌলবীরা (নজরুলের ভাষায় মৌ-লোভীরা) ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, তিনি কাজী হলেও কাফের। আর হিন্দুরা তাকে উপাধি দিয়েছিলেন ‘পাত-নেড়ে’। তাঁর ভাষায়, পুরুষেরা তাঁকে নারীঘেষা বলে গাল দিয়েছেন, মেয়েরা তাকে অভিশাপ দিয়েছেন নারীবিদ্বেষী বলে। চরকার গান লিখেছেন বলে তার নিন্দা করেছেন বিপ্লবীরা, আর কংগ্রেসীরা তাকে অবিশ্বাস করেছেন বিপ্লবী ঠাহর করে। তা হলে নজরুল আসলে কী? আপাতদৃষ্টিতে তাঁর পরস্পরবিরোধী ব্যক্তিত্বের পেছনে আছে তার প্রবল পছন্দ-অপছন্দ। তিনি যা বলেছেন, চীৎকার করে বলেছেন। তিনি যে-পথে চলেছেন, তার মাঝখান দিয়ে চলেছেন। আপোশ করে চলা, পাশ কাটিয়ে চলা তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নয়।
আরও একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, তীব্ৰতাই তাঁর বিশ্বাসের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়, তার বিশ্বাস অটল, ধ্রুবতারার মতো। কখনো তিনি এলিয়ে পড়েননি, কারণ একটা শক্ত ভিত্তি ছিলো তার বিশ্বাসের। সেই ভিত্তিটা মানবতার। সব মত, সব পথের উর্ধে মানুষকে নিতান্ত মানুষ হিশেবে দেখার ক্ষমতা ছিলো তাঁর। সে শক্তি তিনি সম্ভবত অর্জন করেননি, সেটা ছিলো তাঁর স্বভাবেরই অংশ। তাঁর যেমানবগ্ৰীতির জন্যে তিনি মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা লাভ করেছিলেন, সেই মানবপ্রীতিই তাকে আবার অনেকের কাছে, অনেক গোষ্ঠীর কাছে অপ্ৰিয় করে তুলেছিলো। তিনি মানুষে মানুষে সাম্যের কথা বলেছেন, কিন্তু কমিউনিষ্ট হতে পারেননি। এমন কি, তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুললেও, তিনি তাতে যোগ দিতে পারেননি। কারণ, তাঁর মানবপ্রীতিকে কতোগুলো বিধান অথবা একটা কট্টর আদর্শের ছকে ফেলতে পারেননি। তিনি। “এক সমাজকে মানলে, করবে / আরেক সমাজ নির্বােসন।” কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি একাত্ম হতে পারেননি। তার মানবতার সংজ্ঞার সঙ্গে কারো ষোলো আনা মিল হয়নি।
নজরুল হয়তো ঠিকই বলেছেন–তিনি বর্তমানের কবি, ভবিষ্যতের নবী নন। হয়তো তাঁর সাহিত্য চিরকালীন সাহিত্য নয়। কিন্তু তিনি যে-মানবতার কথা বলেছিলেন, তা চিরকালের। তাঁর আগে অথবা পরে কোনো বাঙালি সাহিত্যিক, কোনো দার্শনিক, কোনো ধর্মীয় নেতা, এমন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানবতার জয় গান করতে পারেননি–মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” সত্য বটে, তাঁর অন্তত দু শতাব্দী আগে চণ্ডীদাস বলেছিলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।” কিন্তু চণ্ডীদাসের মানুষ এবং নজরুলের মানুষ এক নন। চণ্ডীদাস মনের মানুষের কথা বলেছিলেন। নজরুল বলেছিলেন রক্তমাংসের মানুষের কথা।
মানুষের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্যেই নজরুল বলতে পেরেছিলেন। যে, জগতের সব পবিত্র গ্রন্থ এবং ভজনালয়ের চেয়ে একটি মানুষের ক্ষুদ্ৰ দেহ অনেক বেশি পবিত্র। মানুষকে ঘূণা করে যারা ধর্মগ্রন্থ পড়েন, তিনি তাঁদের কাছ থেকে ধর্মগ্রন্থ কেড়ে নেওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। মন্দির-মসজিদ ভেঙে ফেলার জন্যে কালাপাহাড় এবং গজনি মামুদকে আহবান জানিয়েছিলেন। সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে তাঁর এই যে-মানবগ্ৰীতি, তা-ই তাকে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খাটি বাঙালিতে পরিণত করেছিলো।
