বস্তুত, ইলিয়াস শাহের হাতে একবার একটা অখণ্ড বঙ্গদেশ স্থাপিত হওয়ার পর অখণ্ড বঙ্গীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠারও সম্ভাবনা দেখা দেয়। তার আগে, রবীন্দ্রনাথের মতে, এই দেশগুলোর সংস্কৃতি এক ছিলো না। “বাংলাদেশের ইতিহাস খণ্ডতার ইতিহাস। পূর্ববঙ্গ পশ্চিমবঙ্গ, রাঢ় বরেন্দ্রের ভাগ কেবল ভূগোলের ভাগ নয়; অন্তরের ভাগও ছিলো তার সঙ্গে জড়িয়ে, সমাজের মিলও ছিলো না।” কিন্তু এক বঙ্গদেশের আওতায় এসে ধীরে ধীরে একটা বঙ্গীয় পরিচয় গড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি হলো। সিকান্দার শাহ এবং হোসেন শাহের আমলে এই ভিত্তি আরও মজবুত হয়। এই প্রশাসনিক ইউনিট আরও সমন্বিত হয় মোগল যুগে। তারপর কয়েক শতাব্দী ধরে আমরা আঞ্চলিক পরিচয় কাটিয়ে বাঙালি হয়ে উঠি। ষোড়শ শতকে মুকুন্দরাম যাকে “বাঙাল’ বলেছিলেন, ভারতচন্দ্র সে পরিচয়কে আরও সম্প্রসারিত করে বঙ্গের তাবৎ অধিবাসীকে ‘বাঙ্গালী” বলে চিহ্নিত করেন, কারণ গোটা এলাকাই সুবোহ বাঙ্গালায় পরিণত হয়েছিলো।
তা ছাড়া, বাংলা ভাষাও রীতিমতো বাংলা হয়ে ওঠে আলোচ্য সময়ে। মনে রাখা দরকার, চর্যাপদের ভাষা খাটি বাংলা ছিলো না। তা ছিলো বাংলা, ওড়িয়া এবং অহমিয়ার জননী। শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তনের রচনাকাল এবং চর্যাপদের সঙ্গে তার ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্যের পরিমাণ বিবেচনা করলে বলতে হয় বাংলা ভাষা তার নিজের বৈশিষ্ট্য লাভ করতে শুরু করে ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দী থেকে। তারপর সেই বিবর্তিত ভাষাতেই শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তন রচিত হয়, মনে হয়, পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে। কিন্তু বঙ্গদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তখনো একটা অখণ্ড ভাষিক পরিচয় গড়ে উঠেছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। আঠারো শতকের আগে পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের ভাষা “বাঙ্গালা” নামে পরিচিত হয়নি। এলাকা এবং ভাষা উভয় দিয়ে একটা অভিন্ন বঙ্গীয় পরিচয় গড়ে ওঠে কয়েক শতাব্দী ধরে। ভারতচন্দ্ৰ নিজেকে বাঙ্গালী বলেছিলেন বঙ্গের অধিবাসী হিশেবে। কিন্তু তাঁর দেড় শো বছর পরে রবীন্দ্রনাথের কাছে বাঙালির প্রধান ঐক্য মনে হয়েছে আঞ্চলিক নয়, ভাষিক ঐক্য। “এর মধ্যে এক ঐক্যের ধারা চলে এসেছে সে ভাষার ঐক্য নিয়ে। আমাদের যে বাঙালি বলা হয়েছে তার সংজ্ঞা হচ্ছে, আমরা বাংলা বলে থাকি।” অর্থাৎ বাঙালি সংস্কৃতিতে যেসব অভিন্ন উপাদান আছে, রবীন্দ্রনাথের মতে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলা ভাষা। সে কারণে যখন থেকে বাংলা ভাষার উন্মেষ, তখন থেকে বাঙালি সংস্কৃতির সূচনা।
ভৌগোলিক অনৈক্য ছাড়াও, বাঙালি সমাজের সবচেয়ে বড়ো বিভেদ হলো: এ সমাজ বহু কোঠায় বিভক্ত, জল-অচল কোঠায়। বহু প্ৰাচীর গড়ে উঠে এই সমাজকে ছোটো ছোটো ভাগে বিভক্ত করেছে। সবচেয়ে দুর্লজম প্রাচীর হলো ধর্মের। সেনআমলে বৌদ্ধ আর হিন্দুরা পাশাপাশি বাস করতে পারেননি–একীভূত হয়েছিলেন। আবার হিন্দু-মুসলমান বহু শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বাস করেও কাছাকাছি আসতে পারেননি। তাদের একত্রে খানাপিনা হয় না; বিয়েতো দূরের কথা। একটা সময়ে ছোয়াছুয়িও ছিলো বিরাট ব্যবধানের কারণ। এক বাংলা ভাষায় কথা বললেও তাদের ভাষায়ও স্বাতন্ত্র্য আছে। জল আর পানি–উভয় এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। কিন্তু হিন্দুরা পানি বললে তাদের জাত যায়; মুসলমানরা জল খেলে তাদের মুসলমানীত্ব চলে যায়। বাংলা ভাষার মতো ‘কুফুরী জবান’ (কাফেরদের ভাষা) তাঁদের মাতৃভাষা কিনা, তা নিয়েও এক শতাব্দী আগে মুসলমানরা বিতর্ক করেছেন। কাগজ-কলম, জামা-মোজা, জমা-খরচের মতো আরবি-ফারসি শব্দ হিন্দুরা ব্যবহার করেন বটে, কিন্তু সন্তানের আরবি-ফারসি নাম রাখেন না। তবে গ্রামের অশিক্ষিত মুসলমানরা চাঁদ মিঞা, সুরুজ মিঞা, তারা মিঞা, কালা মিঞা, ধলা মিঞা নাম রাখেন। শহরের শিক্ষিত অসাম্প্রদায়িক মুসলমানরাও তাদের বৈদগ্ধ্য প্রমাণ করার জন্যে নাম রাখেন। বাংলায়। কিন্তু তবু তাদের ভেদ ঘোচে না। জ্ঞাতে-জ্ঞাতে ধর্মীয় পরিচয় তাদের ভূতে পাওয়ার মতো সারাক্ষণ অধিকার করে থাকে। তেমন অবস্থা হলেই ভদ্র পোশাকের আড়াল থেকে ধর্মের লেজটা বেরিয়ে পড়ে।
দেবতাহীন ধর্মে বিশ্বাসী বাউলরা আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচয় অস্বীকার করে মনুষ্য পরিচয়কেই বড়ো করে তুলে ধরেছিলেন। ‘আমার পথ ঢাইকাছে মসজিদে মন্দিরে’ বলে মদন বাউল গান গেয়েছেন। লালন ফকির জাতের ভিন্নতা দেখতে পাননি। কিন্তু বৃহত্তর সমাজে এঁদের প্রভাব পড়েনি। যাঁরা সাহিত্য-সৃষ্টি করে সমাজের আরও বৃহত্তর, পরিধিতে পৌঁছতে পেরেছিলেন, যেমন ধরা যাক, বঙ্কিমচন্দ্র, তারা আবার ধর্মের উর্ধে উঠতে পারেননি। যিনি নিজের বিচিত্ৰ সৃষ্টি দিয়ে একটা ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিবেশ রচনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি রবীন্দ্ৰনাথ। নজরুল ইসলামও খানিকটা। সে দিক দিয়ে সময়ের বিচারে বাঙালিত্বের ইতিহাসে ইলিয়াস শাহ যেমাইলফলক তৈরি করেছিলেন, তারপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক রবীন্দ্রনাথ। তাদের অবদান ভিন্ন ধরনের। কাজেই সেই অবদানের কোনো তুলনা চলে না। ‘শাহে বাঙ্গালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের শাহ উপাধি গ্রহণ করে ইলিয়াস শাহ নিজেকে গৌরবান্বিত করেছিলেন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বাঙালিদের বিদগ্ধ রুচির মানুষে পরিণত করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি দিয়ে, বস্তুত, বাঙালিকেই গৌরবান্বিত করেছিলেন তিনি। ইলিয়াস শাহ ভারতবর্ষে বাঙালিদের একটা স্বাধীন দেশের অধিবাসীতে পরিণত করেছিলেন। অপর পক্ষে, স্বাধীনতা দিতে না-পারলেও রবীন্দ্রনাথ বাঙালিদের বিশ্বের কাছে একটা স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিলেন। নজরুল ইসলামও সাম্প্রদায়িকতার সীমানা লঙ্ঘন করে মানুষকে মানুষ হিশেবে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। মদন বাউলের মতো তিনিও বলেছিলেন যে, দাঙার পরে মসজিদ-মন্দির টিকে থাকলো, কিন্তু মানুষ থাকলো না। তিনিও বলেছিলেন যে, মানুষের জন্যে ধর্ম, মানুষ ধর্মের জন্যে নয়। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ঈশ্বরের কথা না-বলে, যিশু, কৃষ্ণ, মোহাম্মদ-প্রবর্তিত দৈবিক এবং আনুষ্ঠানিক ধর্মকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন, যদিও বিশেষ কোনো ধর্মকে তিনি অন্য ধর্মের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেননি।
