দেখেশুনে মনে হতেই পারে যে, রবীন্দ্রনাথ আবার অশরীরে আবির্ভূত হয়েছেন। আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছেন। কেউ বেড়াতে এলে নিদেন পক্ষে বসার ঘরে বুড়ো রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি টাঙানো দেখবেন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে পাবেন। তা ছাড়া, কাঁদের আলমারিতে একেবারে আনকোরা নতুন রবীন্দ্ররচনাবলীও দেখতে পাবেন (ঘর সাজানোর উপকরণ–কেউ কোনোদিন খুলে দেখেনি)। এর পরে আর সংস্কৃতিবান বলে অন্য কারো সার্টিফিকেটের প্রয়ােজন হবে না। যে দেবতা সর্বগৃহে সংস্কৃতিরূপে সংস্থিত, তিনি রবীন্দ্রনাথ। (রামকৃষ্ণ পর্যন্ত হয়েছিলেন। বেচারা রবীন্দ্রনাথ একটু দেরিত্বে জন্মেছেন, তা না-হলে তাঁকে দ্বাদশ অবতার বলে চালিয়ে দেওয়া যেতো!)
ভাগ্যের পরিহাস, রবীন্দ্রশিল্প ও বাণিজ্যের যখন এতোই শ্ৰীবৃদ্ধি হচ্ছে, এমন কি, তাঁর গান এবং রচনাবলী ঘরে ঘরে শোভা পাচ্ছে, সেই সুসময়ে আসল রবীন্দ্রনাথ ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ প্ৰায় ভবিষ্যদ্ৰষ্টা ছিলেন। নিজেই তাঁর এই অবস্থা হবে কল্পনা করে রূপকের মধ্য দিয়ে লিখেছিলেন: নদী যখন হারিয়ে যায়, তখন দেখতে পাই গর্ত এবং বালি। (সরিয়াসলি নেবেন না। দয়া করে!) রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ তাঁর আদর্শ যখন প্রায় পুরোপুরি লোপ পেতে বসেছে, অথবা লোপ পেয়েছে, সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথের সুন্দর রঙিন ছবি, গানের রেকর্ড আর রচনাবলী গুনগুনিয়ে আমাদের ঘরে এলো। রবীন্দ্রনাথ আমার চোখে মানবতার প্রতীক। মহত্ত্বের প্রতীক। ঔদার্যের প্রতীক। আন্তর্জাতিকতার প্রতীক। আনুষ্ঠানিকতার বদলে তিনি শেষে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন মানুষের ধর্মে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, তার কাছে ধর্ম ছিলো সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গল। জীবন এবং সমাজ থেকে সেই রবীন্দ্রনাথকে বিসর্জন দিয়ে আজ যে-রবীন্দ্রনাথকে পুজো করা হচ্ছে, তিনি রবীন্দ্রনাথ নন। সে রবীন্দ্রনাথ কবে মরে ভূত হয়ে গেছেন!
(দৈনিক স্টেটসম্যান, রবীন্দ্রজয়ন্তী, ২০০৬)
২১. শ্ৰেষ্ঠ বাঙালি : রবীন্দ্রনাথ বনাম শেখ মুজিব
বছর তিনেক আগে একটি বিশ্ববেতার সম্প্রচার সংস্থা সৰ্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কে, তা নিয়ে একটি জরিপ করেছিলো তাদের শ্রোতাদের মধ্যে। কয়েক হাজার শ্রোতা যো-জবাব দিয়েছিলেন, তাতে শ্ৰেষ্ঠ বাঙালি বলে নাম পাওয়া গিয়েছিলো শ দেড়েক ব্যক্তির–মীর জাফর এবং গোলাম আযমের নামও বাদ যায়নি। সুতরাং এ মতামতকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই জরিপের ওপরের দিকে অনেক বিখ্যাত বাঙালির নাম ছিলো; যেমন রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর, নজরুল ইসলাম ইত্যাদি। কিন্তু সবার ওপরে নাম ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার পরে–দু নম্বরে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শেখ মুজিবের তুলনা দেখে অনেকেই একে এক কথায় উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু প্ৰতিভার বিচারে যেমনই হোক না কেন, বাঙালির ইতিহাসে মুজিব কি রবীন্দ্রনাথের তুলনায় খুব নগণ্য? বিশেষ করে বাঙালিদের যে-ইতিহাস এখন থেকে শত বর্ষ পরে লেখা হবে, তাতে এই গুরুত্ব আজকের তুলনায় কি বৃদ্ধি পাবে না?
আমরা এক কথায় সংস্কৃতি বলে যে-ধারণাটাকে চিহ্নিত করি, তা হলো প্রধানত বৈদগ্ধ্যেরা। এলোমেলোভাবে গলা ওঠা-নামা করে চেচালে, তা থেকে কোলাহল সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু পরিশীলিত পদ্ধতিতে গলার ওঠা-নামা করে শব্দ বের করলে তা সঙ্গীতে পরিণত হয়। তেমনি তালে-তালে পরিশীলিতভাবে অঙ্গভঙ্গি করলে তা নাচে পরিণত হতে পারে। পেট ভরানোর জন্যে যা-তা রান্না করে হাপুসাহুপুস করে খেলে সেটা যা-ই হোক, রন্ধন এবং খাদ্য পরিবেশনাও শিল্পিত হতে পারে। মোট কথা, বিদগ্ধতাকেই আমরা অনেক সময়ে সংস্কৃতির সঙ্গে অভিন্ন করে দেখি। কিন্তু বৈদগ্ধ্যবর্জিত রাজনীতি সংস্কৃতির চেহারা আমূল বদলে দিতে পারে এবং তা পারে তুলনামূলকভাবে কম সময়ের মধ্যে। আমরা যাকে বাঙালি সংস্কৃতি বলি তার একটা প্রধান এলাকাই জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ— বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিক্ষা, রুচি ইত্যাদি বহু বিষয়ে। কেবল তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর অবদানে এসব জিনিশকে এমন একটা উৎকর্ষ দিয়েছেন, যা তাঁর আগেকার অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা এখন তার ভাষায় কথা বলি, লিখি। অজানতেই তাঁর গান, তার কবিতা আমাদের মন এবং হৃদয়কে আলোকিত এবং মার্জিত করে। সেখানে শেখ মুজিবের কোনো অবদান নেই। এমন কি, তিনি নিজে রাবীন্দ্রিক বৈদগ্ধ্য কতোটুকু আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন, সেও প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু এখন বাঙালি সংস্কৃতি যো-পথে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে শেখ মুজিব জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে বৈপ্লবিক অবদান রেখেছেন বলে আমার ধারণা!
বাঙালির যে-ইতিহাস এবং সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে গত সাত-আট শতাব্দী ধরে, তাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এক ভদ্রলোক, যার নাম আমার পাঠকদের অনেকে হয়তো জানেনও না–শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। আমরা এখন যাকে বঙ্গদেশ বলে জানি, প্রাচীন কালে তা বিভক্ত ছিলো ছোটো ছোটো বেশ কয়েকটি দেশে–গৌড়, রাঢ়, সুহ্ম, বরেন্দ্রী, বঙ্গ, চন্দ্ৰদ্বীপ, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি। এসব দেশের শাসক এক ছিলেন না। এসব দেশ মিলে কোনো একটি অভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিটও ছিলো না। যিনি এদের একত্রিত করে এক অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনেন অথবা আনার গোড়াপত্তন করেন। তারই নাম শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। তাঁর মস্ত অবদান এই যে, তিনি চোদ্দো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসব দেশের বেশির ভাগ জায়গাই জয় করে এগুলোকে একটি মাত্র প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করেন। সবগুলো দেশ এক বঙ্গদেশে পরিণত হয়।
