৭১-এর কলকাতায় এই একই ধরনের প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতা দেখেছিলাম। আমার ধারণা, এখন তিনি সম্ভবত আরও প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছেন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো: অন্যদিকে–কলেজ স্ত্রীটে আর কলেজ পাড়ায়–তিনি আবার যৌবন ফিরে পেয়েছেন। হ্যাঁ, রবীন্দ্র-বাণিজ্য এবং রবীন্দ্র-শিল্পের খুব প্রসার ঘটেছে, অনেক শ্ৰীবৃদ্ধি হয়েছে। তা ছাড়া, বাংলার অধ্যাপক একের পর এক রবীন্দ্রসাহিত্য বিষয়ক নোট বই লিখে বাড়ি বানাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথের নামে প্ৰবন্ধ লিখে কলামিস্ট পচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ যৎকিঞ্চিৎ কামাই করছেন। কেউ বা চাকরিতে উন্নতি করার জন্যে রবীন্দ্রনাথের ওপর সম্ভাব্য (এমনকি অসম্ভব) সব বিষয় নিয়ে ডাক্তারি পাশ করছেন। (রবীন্দ্রনাথ হোমিওপ্যাথিতে কতোটা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন, তা নিয়েও বোধ হয়। এতো দিনে পিএইচডি অভিসন্দৰ্ভ লেখা হয়েছে। আমার অজ্ঞতা মাফ করবেন–আমি ঠিক নিশ্চিত নই এ বিষয়ে লেখা হয়েছে কিনা। কিন্তু হাস্যরসিক রবীন্দ্রনাথ, ভোজনরসিক রবীন্দ্রনাথ, কৃষিবিশারদ রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ–এসব বিষয় নিশ্চয় এখন আর বাদ নেই!)
রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছিলেন যে, তার গান আর ছোটোগল্প টিকে থাকবে। অন্তত এখনো আছে। গল্পটা তেমন নয়, কিন্তু তার গান ছাড়া আধুনিক শৌচাগার উদ্বোধনও কল্পনাতীত। এ বছরের (২০০৬)। ২৫শে জানুয়ারি মাইকেল মধুসূদনের সমাধিতে গিয়েছিলাম। সেখানে কিভাবে তাকে বাঙালিরা স্মরণ করেন, তা দেখার ঔৎসুক্য মেটাতে। দেখলাম রাজনৈতিক টাউটরা এসেছেন এবং তরুণ-তরুণীরা এসেছেন জোড়ে। টেলিভিশনের ক্র্যরাও। সভাপতি মশাই ছাড়া বাকি সবাই বোধ হয় কবিতা আবৃত্তি করলেন। হ্যাঁ, মাইকেলের কবিতা। আমি যখন ভাবছি— কী অন্যায়, বাংলার মাটিতে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত!— ঠিক তখনই এক তরুণী আবেগে গলা কাঁপিয়ে পড়লেন রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছাড়া মাইকেলের জন্মদিনও উদযাপিত হয় না! আর তাঁর গান তো বাঙালি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ গান বোঝার জন্যে উচ্চাঙ্গসংগীতের জ্ঞান লাগে না। তা ছাড়া, কথাগুলো খুব আকর্ষণীয়। প্রচুর ‘তুমি” এবং প্রচুর ভালোবাসার কথা থাকে। সেগুলো সহজে বোঝা যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, তার গানের কথাগুলো কানের ভিতর দিয়া একেবারে মরমে প্ৰবেশ করে। সে জন্যে কবিতা অথবা ছোটোগল্পের চেয়েও তাঁর গানের চাহিদা ঢের বেশি। চাহিদা আর সরবরাহের নিয়মে তার গান নিয়ে তাই রীতিমতো বাণিজ্য হচ্ছে। (বৈদেশিক মুদ্রার কথা ভেবে সরকারী ভুর্ভুকী দিলে কেমন হয়?)
বাণিজ্য করতে গেলে বিবেকের, বিবেচনার কথা ভাবা যায় না। রবীন্দ্ৰবাণিজ্যেও এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান মাত্রায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন, একটা সময় পর্যন্ত দেখা যেতো যে, একজন বড়ো শিল্পী একটা গান রেকর্ড করলে অন্য শিল্পী আর সে গানের রেকর্ড করতেন না। ফলে নতুন রেকর্ডের জন্যে যেসব গান বড়ো একটা গাওয়া হতো। না, তেমন গান খুঁজে বের করতে হতো। এভাবে অনেক অপ্রচলিত গান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতো। কিন্তু এখন আর সেই চক্ষুলজ্জা নেই। যে-কোনো শিল্পী যে-গান খুশি গাইতে পারেন। আগের শিল্পীর তুলনায় ভালো করলে তার যুক্তি থাকতো। এমন কি, আগের শিল্পী গানের যে-ইন্টারপ্রেটেশন দিয়েছেন, তার থেকে ভিন্ন ইন্টারপ্রেটেশন দিলে অথবা নিজস্ব ভঙ্গিতে গান পরিবশেন করলেও অযৌক্তিক হতো না। কিন্তু এখন ক্যাসেটের যুগে স্বরলিপি ধরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে যিনি গান করতে পারেন, তারই গান বাজারে ছাড়া হয়। কারণ, এর জন্যে কম্পোনিকে টাকা খরচ করতে হয় না, যাঁর ক্যাসেট তিনি নিজেই টাকাপয়সা দিয়ে কম্পানির কর্মকর্তাদের অনুরোধ-উপরোধ করে ক্যাসেট প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। আর্থিক অবস্থা আর-একটু ভালো হলে একই কৌশলে সিডিও প্রকাশ করা যায়। কম্পোনির কোনো আর্থিক লোকসান নেই তাতে–কারণ ক্যাসেট বিক্রি না-হলেও কিছু যায়আসে না, গায়ক-গায়িকাই টাকা দিয়ে পুষিয়ে দেন।
রেকর্ড কম্পোনিগুলোর আর-একটা আয় হলো: একজন বিখ্যাত শিল্পী ধরা যাক যদি চল্লিশটা গান গেয়ে থাকেন, তা হলে নানা রকমের পামিউটেশন-কম্বিনেশন করে। সেই গানগুলো দিয়েই চার-পাঁচটা সিডি করে ফেলেন। একজন ভালো শিল্পীর সঙ্গে আরও দুজন মাঝারি শিল্পীর গান মিশিয়ে সংকলন প্রকাশ করেন। যার টাকা আছে, তিনিই ক্যাসেট অথবা সিডি প্ৰকাশ করতে পারার আর-একটা কারণ: এখন আর বিশ্বভারতীর সঙ্গীত পর্ষদের অনুমোদন লাগে না। গলায় সুর না-থাকলে অথবা বেসুরো গাইলে কোনো ক্ষতি নেই। এই অরাজকতার যুগে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রবারবা ব্যবসা চলছে।
রবীন্দ্ৰব্যবসার আর-একটা এলাকা দখল করেছেন প্ৰকাশকরা। রবীন্দ্ৰনাথ তার গ্রন্থস্বত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বভারতীকে। বিশ্বভারতীই ষাট বছর সেই গ্রন্থস্বত্ব ভোগ করেছিলো। কিন্তু এখন সেই একচেটিয়া স্বত্ব লোপ পাওয়ার পর নানা প্রকাশক এগিয়ে এসেছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ব্যবসা করার জন্যে। একই রবীন্দ্ররচনাবলী এখন ছাপছেন নানাজন। কেউ কেউ চক্ষুলজ্জায় একটু ভিন্ন রকমে রচনাগুলো সাজাচ্ছেন। আর কেউ কেউ অতো ঝামেলা না-করে ৬১ সালের সংস্করণই হুবহু ছাপিয়ে দিচ্ছেন। সাধু যার ইচ্ছা ঈশ্বর তার সহায়। এ ক্ষেত্রে প্রকাশকদের সহায় হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। কম্পোজ করার ঝামেলা নেই। অফসেট ছাপা হচ্ছে। সুতরাং চৌর্যবৃত্তির জন্যে চোরদেরও যেসব কৌশল আয়ত্ত করতে হয় সাধনা করে, প্রকাশকের তাও দরকার হয় না। খালি লেটার প্রেসকে একটু উন্নত করে অফসেট প্রিন্টের ব্যবস্থা করতে হয়। রবীন্দ্রনাথের রচনা প্ৰকাশ করার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রকাশদের মধ্যে যে-লড়াই ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রবল হবে, তাতে কাজ করবে। আর-পাঁচটা ব্যবসায় যেসব জিনিশ–মার্কেট ফোর্স–কাজ করে, সেগুলোই। অর্থাৎ কতো কম দামে ছেপে কতো বেশি লাভ করা যায়। কতো চকচকে মলাট দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যায় (হায়রে বিশ্বভারতীয় মলাট!), কতো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া যায়, উপন্যাস হলে মলাটে নায়িকার অর্ধনগ্ন ছবি ইত্যাদি। এর পরে এর সঙ্গে আরও যুক্ত হবে বাংলার অধ্যাপকদের নাম। ভূমিকা-সংবলিত অমুকের সম্পাদিত রবীন্দ্ররচনাবলী।
