তাই বলে ষাটের দশকে রবীন্দ্রচর্চা আজকের মতো ব্যাপক হয়নি পূর্ব বাংলায়। রবীন্দ্রনাথের গান শোনার সুযোগ ছিলো খুবই সীমিত। ঢাকা বেতারে গান গাইতেন কলিম শরাফী, সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, বিলকিস নাসিরউদ্দীন, জাহেদুর রহীম-সহ হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। তখন পর্যন্ত একটি মাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীতআমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ— ব্যবহৃত হয়েছিলো পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্রে। প্রকাশিত হয়েছিলো ফাহমিদা খাতুনের গাওয়া ঐ একটি মাত্র গানের রেকর্ড। ঢাকা বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠানও থাকতো খুব কম। এমন কি, একাধিকবার রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজানোর ওপর সরকার পুরো নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো। কলকাতা থেকে প্রকাশিত গ্রামোফোন রেকর্ডও ঢাকায় ছিলো দুর্লভ বস্তু–ক্যাসেট আর সিডির দেখাই মেলেনি। তখন। তারই মধ্যে কলকাতা থেকে আসতো বেতার জগৎ। সেই বেতার জগৎ দেখে সকাল আর সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান শুনতে হতো। এই পরিবেশে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়–এঁরা ছিলেন আমাদের চোখে এক-একজন জাগ্ৰত দেবদেবীর মতোন।
এক কালের অবহেলিত রবীন্দ্ৰনাথ সে পরিবেশে কতোটা ভালোবাসা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে গৃহীত হয়েছিলেন, তার একটা প্রমাণ— আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। এ গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিশেবে স্বীকৃতি লাভ করে ধীরে ধীরে জনগণের হাতে, যুদ্ধের সময়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় সংসদ তাকে কেবল আইনী অনুমোদন দান করে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ২৫শে মার্চ। কিন্তু আমার সোনার বাংলা” গেয়ে সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হচ্ছিলেন, ভাবী স্বাধীন বাংলার প্রতি তাদের ভালোবাসা প্ৰকাশ করছিলেন তার অনেক আগে থেকেই।
স্বাধীনতা লাভের পর তিন দশক চলে গেছে। ইতিমধ্যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আদর্শ ধুয়েমুছে বঙ্গোপসাগরে ভেসে গেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে-উৎসাহ ষাটের দশকে দেখা দিয়েছিলো, সমাজের একাংশে তা এখনো জোরালোভাবেই বহাল রয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে নয়, রবীন্দ্রনাথ এখনো এঁদের মধ্যে সক্রিয়ভাবেই বেঁচে আছেন বলে মনে হয়। অপর পক্ষে, সমাজের আর-এক অংশে আছেন ধর্মািন্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি, যাদের আর-এক পরিচয় ভারতবিরোধী বলে। এঁদের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ জ্যান্ত একটা সত্তা। এঁরা মৃত রবীন্দ্রনাথকে খুব ভয় করেন। এঁরা যেভাবে রবীন্দ্রবিরোধিতা করেন, ষাট বছর আগে মরো-যাওয়া কোনো ব্যক্তির প্রতি সাধারণত এতো বিরোধিতা কারো থাকে না। কেউ রবীন্দ্রচর্চা করছেন শুনলেই এঁরা তার মধ্যে ভারতের দালালির গন্ধ পান। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ মরেও এঁদের চেতনায় রীতিমতো জীবিত। সে অর্থে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের অ্যাকাডেমিক চর্চা সীমিত হলেও রবীন্দ্ৰ-সমর্থক এবং রবীন্দ্ৰ-বিরোধী–উভয় গোষ্ঠীর মধ্যেই তিনি বেঁচে আছেন।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে?
কালিদাস, ভ্যর্জিল প্ৰমুখের সঙ্গে তুলনা করে মাইকেল মধুসূদন বলেছিলেন এঁরা মানুষ, কিন্তু মিল্টন ডিভাইন। আমার চোখে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন ডিভাইন। কিন্তু সেই ভাবে রূঢ় আঘাত লেগেছিলো ৭১-এর পঁচিশে বৈশাখ এবং কোথায়? না, যেখানে রবীন্দ্রনাথের জন্ম এবং বাস–সেই খোদ কলকাতায়। পার্ক স্যার্কাসে বাংলাদেশ মিশনের সামনে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে শিল্পীরা যোগ দিয়েছিলেন স্বতঃস্ফৰ্তভাবে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর দেবব্রত বিশ্বাস আসতে পারেননি ব্যক্তিগত কারণে। কিন্তু নামীদামী অন্য শিল্পীরা এসেছিলেন। দেখলাম রাস্তায় বসে থাকা, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য শ্রোতা সুচিত্রা মিত্রের মতো শিল্পীর গানও শুনছেন না। গল্প করছেন নিজেদের মধ্যে। বিস্মিত হলাম বললে কিছুই বলা হয় না–দারুণ দুঃখিত হলাম। বুঝলাম, রবীন্দ্রনাথ এঁদের কাছে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আর-পাঁচটা ঠাকুর-দেবতার পুজোর মতো অথবা জামাই ষষ্ঠী কি ভ্রাতৃদ্বতীয়ার মতো ঐও একটা বাৎসরিক অনুষ্ঠান। বেল পাতা নয়, তবে এর জন্যে নির্দিষ্ট কয়েকটা উপকরণ লাগে। যেমন, সভাপতি, বক্তা, গায়ক, হারমোনিয়াম, তবলা, মাইক, ইত্যাদি। সেগুলো সরবরাহ করার ব্যবস্থাও থাকে। ভাড়া করা যায়। পুজো দেখার মতো এ অনুষ্ঠানেও ধুতিপাঞ্জাবী পরে যেতে হয়। গেলে সংস্কৃতিবান বলে পরিচিত হওয়া যায়।
এখন সাড়ে তিন দশক পরে রবীন্দ্রনাথের এই পতনের প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারি। এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কোনো অনুষ্ঠানের সাদৃশ্যও দেখতে পাই। সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হলো একুশে ফেব্রুয়ারি–শহীদ দিবস। এক-একটি শহীদ দিবস প্রচণ্ড ঢেউয়ের মতো এসে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে ক্রমাগত দূরে সরিয়ে দিচ্ছিলো। ফলে দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তান পুরোপুরি এগিয়ে যাচ্ছিলো ভেঙে যাওয়ার দিকে। এ দিনের উদযাপনে কারো উদ্যোগ নিতে হয়নি। এ ছিলো স্বতঃস্ফুর্ত। পূর্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজের সঙ্গে এর ছিলো নাড়ীর বন্ধন। এই দিনের উদযাপন তাদের উজীবিত করতো, শোকের মধ্য দিয়ে শক্তি সঞ্চার করার অনুপ্রেরণা জোগাতো, বাঙালি হওয়ার, স্বাধীন হওয়ার উৎসাহ দিতো। ৭১ সাল পর্যন্ত এ দিনের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য ছিলো অন্তহীন। কিন্তু ৭২ সাল থেকে এ দিনের রূপান্তর ঘটলো–এ দিন পরিণত হলো আনন্দ-উৎসবে। ধীরে ধীরে এর উদ্দেশ্য এবং তাৎপৰ্য–দু-ই লোপ পেলো। এ হলো এখন বাঙালির পঞ্জিকায় আরও একটি ছুটির দিন, আরও একটি পার্বণ। এ দিনে এখনও প্রভাত ফেরী বের হয়, হাজার হাজার লোক শহীদ মিনারে যান। কিন্তু অনেকে, বিশেষ করে তরুণদের অনেকে, জানেনও না কেন যান। এ দিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সে অনুষ্ঠানের জন্যে সরকারী তহবিল থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বরাদ্দ থাকে। ঠিকাদার রাস্তায় আল্পনা আকে, সামিয়ানা খাটায়। শিল্পীরা গান গাইবার জন্যে সম্মানী পান। দর-দস্তুর হয়। এক অনুষ্ঠানের গান শেষ করে তাদের অন্য অনুষ্ঠানে ছুটতে হয়।
