আরও একটা কারণে রবীন্দ্রনাথকে তখনকার পূর্ব বাংলার সমাজে খুব জীবন্ত মনে হতো। সে হলো: বাঙালি মুসলমান সমাজ তাঁকে কখনো নিজেদের লোক” বলে গ্রাহ্য করেনি। তাদের শতকরা নকবুই জন অথবা তার চেয়েও বেশি সেকালে বাস করতেন গ্রামে। তাদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিলো খুবই কম। ইংরেজ আমলে শিক্ষার যে-সুযোগ এসেছিলো, চাকরি-বাকরির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার যে-পথ খুলে গিয়েছিলো, বর্ণহিন্দুরাই সেই ভোজের শরিক হয়েছিলেন। মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সেখানে পাত পড়েনি। রবীন্দ্ৰনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর যখন গর্বে বাঙালিদের বুক ফুলে ওঠে, তখনও গ্রামের মুসলমানদের কাছে সে খবর পৌঁছেনি। আর যে-শিক্ষিত মুসলমানরা এ সম্পর্কে জানতে পান, তারাও তখন অবিমিশ্র ঔদাসীন্য দেখান। এর জন্যে দায়ী ছিলো তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং হীনম্মন্যতা। এক ধরনের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা। আরও মুশকিল। ছিলো: তাদের মধ্যে কোনো খ্যাতিমান সাহিত্যিক ছিলেন না, যাকে নিয়ে তারা বড়াই করতে পারেন। কিন্তু সে অভাব অনেকটা পূরণ হয়েছিলো ১৯২০-এর দশকে–যখন বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে হৈ হৈ করে নজরুল মাঠে নামলেন। মুসলমানদের মানসিক দৈন্য আংশিক পূরণ করে তিনি পরিণত হলেন মুসলমান রবীন্দ্রনাথে। যে-নজরুল জীবন ও সাহিত্যে ষোলো আনা অসাম্প্রদায়িক; যে-নজরুল তারস্বরে অসাম্প্রদায়িকতার শিঙ্গার হুঙ্কার বাজিয়েছিলেন, মুসলমানরা সেই নজরুলকেই ব্যবহার করলেন রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তাঁদের সাম্প্রদায়িকতার হাতিয়ার হিশেবে।
এতে রবীন্দ্রনাথের যে কোনো অবদান ছিলো না, তা নয়। মুসলিম সমাজ সম্পর্কে তার অজ্ঞতার কোনো কৈফিয়ৎ নেই। তিনি গ্রাম বাংলায় বাস করেছিলেন বহু বছর। তাঁর প্রজাদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সেই মুসলমানদের সম্পর্কে এতোটা জানেননি, যাতে তাঁদের নিয়ে তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন। বুড়ো বয়সে দুঃখ করে বলেছেন, মাঝে মাঝে তিনি ওদের প্রাঙ্গণের ধারে গেছেন, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করার সাধ্য ছিলো না। কেন সাধ্য ছিলো না, বিশ্বাসযোগ্যভাবে সে কথা বলতে পারেননি। শিক্ষা, বিত্ত এবং সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে এগিয়ে থাকা হিন্দু সমাজের একাংশ এখন মুসলমানদের সঙ্গে একত্রে পান-ভোজন করলে জাত যাবে বলে মনে করেন না বটে, কিন্তু মুসলমানদের সম্পর্কে এখনো তারা উদাসীন। জানতে অনাগ্রহী। এমন কি, একটা মুসলিম নাম উচ্চারণ বা সঠিক বানান করতে গেলে গলদঘর্ম হন। উনিশ এবং বিশ শতকের নেতৃস্থানীয় তাবৎ বাঙালি সম্পর্কেই এই মন্তব্য কমবেশি প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও। কিন্তু অসীম কৌতূহলী মনের অধিকারী, অজানাকে জানার জন্যে পরম উৎসাহী হয়েও, বাকি সব বাঙালিদের মতো আচরণ তিনি করবেন কেন? বাড়ির পাশের একটা বড়ো সম্প্রদায়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা কি অতোই শক্ত। বিশেষ করে তাঁর মতো পাঠকের জন্যে? গ্রামে গিয়ে তাঁর গোরা প্রথম বারের মতো বৃহত্তর বাঙালি সমাজকে প্রত্যক্ষ করেছিলো। গোরার স্রষ্টা হিশেবে দৃষ্টিকে আর-একটু প্রসারিত করে তিনি কেন সেই বৃহত্তর সমাজের কেবল বাইরের দিকটা দেখলেন, সমাজের ব্যক্তিগুলোর দিকে নজর দিলেন না? সহানুভূতির সঙ্গে কেন জানতে চাইলেন না তাদের ছোটোছোটো সুখদুঃখের কাহিনী? কেন তিনি নিজেকে বন্দী করে রাখলেন একটি গণ্ডীর মধ্যে? নাকি, এটাকেই বলে ব্যক্তির সীমানা?
অভিমান ভেঙে মুসলমানরা সেই রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করেন তাঁর মৃত্যুর দু দশক পরে— ১৯৬০-এর দশকে। এই অভিমানের মেঘ দূর হবার পেছনে অবশ্য তাঁর সাক্ষাৎ কোনো ভূমিকা ছিলো না। কারণগুলো নিহিত ছিলো অন্যত্র। দেশবিভাগের পর থেকে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যে একটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্ৰেণী গড়ে ওঠে। নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে তাদের সচেতন হতে হয়েছিলোআর্থ-সামাজিক কারণে, প্রতিকূল শাসন এবং দুৰ্বহ শোষণের মুখে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে-বাঙালিয়ানার হাওয়া বইতে শুরু করে, তাই রবীন্দ্রনাথকে তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁরা তাঁকে আপনজন বলে গ্ৰহণ করেন। তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে আরম্ভ করেন। আর, রবীন্দ্রনাথও সে পর্যায়ে তাঁর রচনা দিয়ে, বিশেষ করে তাঁর গান দিয়ে, পূর্ব বাংলার বাঙালিদের অনুপ্রাণিত করেন।
বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথকে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা পড়ে পাননি, অর্জন করেছিলেন। এবং, সে জন্যেই সেই অর্জিত সম্পদকে রক্ষা করার ব্যাপারে তারা অতিরিক্ত যত্ন দেখান। অচেনা রবীন্দ্রনাথ জ্যান্ত হয়ে ওঠেন এই পরিবেশেই। তখনকার পূর্ব বাংলায় যখন, ধরা যাক, রবীন্দ্রজয়ন্তী হতো, রবীন্দ্ৰমৃত্যুবার্ষিকী হতো, ঋতু-উৎসব হতো, পয়লা বৈশাখ হতো তখন তার মধ্যে একটা আন্তরিকতা থাকতো, প্যাশন থাকতো। সারা জীবনে যে রবীন্দ্রনাথ পড়েনি অথবা পড়লেও বুঝতে পারেনি, অথবা বুঝতে পারলেও তাঁর বাণী স্বীকরণ করেনি, সেও হাজির হতো। এসব অনুষ্ঠানে। মাঠের মধ্যে হাজার হাজার লোক আসতো ছায়ানটের আহবানে। সে মোটেই সাহিত্যের টানে নয়। তার ভেতরে থাকতো। রবীন্দ্ৰনাথ নামটির প্রতি খাটি ভালোবাসা, বাধ-ভাঙা উৎসাহ, রবীন্দ্রনাথ নামটিকে নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আগ্রহ আর বাঙালিয়ানা-বিরোধী মনোভাবের প্রতি প্ৰচণ্ড প্ৰতিবাদ। সে আমলে যখন ফৌজী শাসনের খড়গ নেমে আসতো সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর তখন গোটা ছায়ানট গাইতে: ওদের বাঁধন যতো শক্ত হবে মোদের বাঁধন টুটবে। ফাহমিদা খাতুন তখন “সার্থক জনম আমার জন্মেছি। এই দেশে’ বলে সুর ধরলে শ্রোতারা ভাবাবেগে বাষ্পাকুল হতেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল হতো। একটা জাতির পরিচয়কে জাগিয়ে তুলতে, সেই পরিচয়ের পতাকাকে উর্ধে তুলে ধরতে–বন্দুক নয়–গান আর কবিতার পঙক্তি যে অব্যৰ্থ শক্তিশেলের মতো কাজ করতে পারে, সেটা তখনকার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।
