বাঙালিরা এক হোক বলে আজ থেকে ১০১ বছর আগে ঈশ্বরের কাছে তিনি প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ বিভক্ত হলে কালে-কালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সহ পুরো বাঙালি সংস্কৃতিই দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তার সেই আশঙ্কা এখন দাঁত মেলে দেখা দিয়েছে। একই ভাষায় কথা বললেও, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বাঙালিদের আত্মপরিচয় এখন আর অভিন্ন নেই। এখন সেই বাঙালিদের একাংশ ক্রমবর্ধমান মাত্রায় ভারতীয় হচ্ছেন; আর-এক অংশ ইতিমধ্যে বাংলাদেশীতে পরিণত হয়েছেন। এই বিভেদের যুগে দু পারের বাঙালিদের মধ্যে যে-দুজন মিলন সেতু হিশেবে কাজ করতে পারতেন, তাদের একজন রবীন্দ্রনাথ, অন্যজন নজরুল।
এই কলুষিত পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের নাম এখনও অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলনে সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা হিশেবে বিবেচিত হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িকতা আর রবীন্দ্রনাথকে এখন সমার্থক বলে গণ্য করা হয়। বস্তুত, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে-বিতর্ক তার একদিকে আছে সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তি, অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। নয়তো সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। মুসলিম জাতীয়তাবাদীরাও পয়লা বৈশাখ রবীন্দ্রনাথেরই গান দিয়েই পুরোনো বৎসরের আবর্জনা দূর করেন, তাঁর গানের সঙ্গেই নাচেন।
আধুনিক কালে জাতিসজা গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে বহু আন্তজাতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বায়ন এখন সবচেয়ে ধরতাই ধুয়ো। সত্যি সত্যি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গোটা বিশ্ব ছোটো হয়ে এসেছে। কিন্তু তারই মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে। অন্ধ জাতীয়তাবাদ। নয়া-সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয় স্বাৰ্থ এবং ধর্মীয় উন্মাদনার নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ যে হানাহানি, মানুষের জীবন নিয়ে যেতাণ্ডবনৃত্য, তার পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণ। এখন থেকে নব্ববুই বছর আগে রবীন্দ্রনাথ এর বিরুদ্ধে হাঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। এর ফলে পাশ্চাত্যে তাঁর জনপ্রিয়তাও রাতারাতি হ্রাস পেয়েছিলো। কিন্তু তাতে তিনি পিছুপা হননি। তাকে অগ্রাহ্য করেই সত্য এবং মঙ্গলের বাণী শুনিয়েছিলেন জাপান, ইউরোপ এবং অ্যামেরিকায়। জনপ্রিয়তার প্রলোভনে একটুও সরে যাননি। তিনি নিজের কক্ষপথ থেকে। কারণ, প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে তিনি জাতীয়তাবাদের ধ্বংসাত্মক এবং মানবতা-বিরোধী ভূমিকা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেও তিনি জাপান এবং জার্মেনিতে দেখেছিলেন সেই জাতীয়তাবাদকে আরও প্রবল হয়ে উঠতে। এমন কি, খোদ ভারতবর্ষের সহিংস স্বাধীনতা আন্দোলনও তার বিশ্বাসে আঘাত দিয়েছিলো।
যে-জাতীয়তাবাদ একটি জাতিকে অন্য জাতির শক্রতে পরিণত করে, অন্য জাতির মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে প্রেরণা জোগায়, যে-জাতীয়তাবাদ মনুষত্ত্বের চেয়েও দেশপ্রেমকে বড়ো করে দেখে, তাকে তিনি অকুণ্ঠভাবে নিন্দা করেছিলেন। তিনি নিজে অসাধারণ দেশপ্রেমিক ছিলেন। কিন্তু ভূমি নয়, সেই ভূমিতে যারা বাস করে–সেই মানুষকেই তিনি বড়ো করে দেখেছিলেন। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক মানুষ। তিনি বলেছিলেন: দেশে দেশে তাঁর ঘর আছে। তিনি সেই ঘরেরই খোজ করেছেন। তার কাছে রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ–সবই মানুষের জন্যে। রাষ্ট্র, ধর্ম অথবা সমাজের জন্যে মানুষ নয়। আজ যখন সভ্যতার তীব্ৰ সংকট দেখা দিয়েছে, তখন তাঁর সেই আন্তর্জাতিকতার বাণী বন্ধুর পথে চলতে আমাদের সম্বল হতে পারে।
সত্যি বলতে কি, রবীন্দ্রনাথ যখন লিখেছিলেন হিংসায় উন্মত্ত পৃথী অথবা লিখেছিলেন সভ্যতার সংকট, আজকের অবস্থা তার চেয়ে অনেক শোচনীয়। তিনি যখন লিখেছিলেন, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাদে–তখনও অন্যায়ের প্রতিকার হতো। কিন্তু আজ সত্যি সত্যি মানবতা এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। এক ক্রান্তিকালে উপনীত। হিটলারের, মুসোলিনীর, স্তালিনের সূচনা দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ষাটের দশকের তৃতীয় বিশ্বের অসংখ্য ফৌজী শাসকদের দেখেননি, পল পটদের দেখেননি। সাদাম, বুশ এবং লাদেনদের দেখেননি। ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের নামে বিপন্ন রোয়াণ্ডা, বসনিয়া, গুজরাট, ইরাক, ফিলিস্তিন এবং আফগানিস্তানের মানুষকে দেখেননি। এই সংকটের নীরন্ধ অন্ধকারে তার গান, তাঁর কবিতা, তার চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক, আজও তা আমাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে; একলা পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।
(যুগান্তর, রবীন্দ্রজয়ন্তী সংখ্যা, ২০০৬)
২০. রবীন্দ্ৰনাথ কি বেঁচে আছেন?
রবীন্দ্রনাথ মারা যান পয়ষট্টি বছর আগে–পাঠ্যবই-এর কল্যাণে সে তো শিশুরাও জানে! কাজেই আমার প্রশ্ন সেটা নয়, আমার জানতে ইচ্ছে হয়: মরেছেন, কিন্তু মরে তিনি ভূত অর্থাৎ পুরোপুরি বিগত হয়েছেন। কিনা। সমকালীন সমাজে এবং, তার থেকেও জরুরী, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেঁচে আছেন। কিনা। সত্য বটে, বেশির ভাগ লোক মরেই হারিয়ে যান, কিন্তু তিনি তো বেশির ভাগ লোকের মতোন ছিলেন না! রবির আলো কি এখনো আমাদের মননকে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা দিককে আলোকিত করে?
মেধাবর্জিত অতি সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলাম বলে, রবীন্দ্রনাথ কতো বড়ো ছিলেন–সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে উপরের দিকে না-ওঠা পর্যন্ত আদৌ উপলব্ধি করতে পারিনি। তারও কয়েক বছর পরে রবিরশ্মিতে যখন মনপ্ৰাণনয়ন ধাঁধিয়ে গেলো, তখন মনে হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথ অমর। বিশেষ করে তখনকার পূর্ব বাংলায় যে-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলছিলো এবং তাতে তিনি যেঅন্তহীন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়েছিলো আমরা তাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। পাঠ্যপুস্তকের শুকনো পাতা থেকে তাকে উঠিয়ে এনে নতুন করে তাঁর মধ্যে প্ৰাণ প্রতিষ্ঠা করেছি। তিনি শুধু ছবি নয়, অন্তরের মাঝখানে ঠাই নিয়েছেন তিনি। আমাদের চলার পথের নিত্যসঙ্গী তিনি।
