এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর উপযোগিতা নিঃশেষ হয়নি। রাজনীতির দিক দিয়ে, এমন কি, সাংস্কৃতিক অনেক দিক দিয়েও বাঙালি এখন দু ভাগে বিভক্ত। কিন্তু বাংলার আকাশে এখনও একই রবি। নতুন বছর বরণ করতে, গ্ৰীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত–সব ঋতুকে স্বাগত জানাতে, জন্মদিনে, মৃত্যুবার্ষিকীতে, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় অনুষ্ঠানে— বস্তুত সব কিছুতেই তাঁর গান চাই, চাই তাঁর কবিতা। তার চেয়েও যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো: উৎসবে, আনন্দে, শোকে, সাত্ত্বনায়, প্রেমে, বিরহে–তাঁর গান, তাঁর কবিতা আমাদের সঙ্গী হয়। তাঁর ভাষা দিয়েই বলতে পারি: অনমনা পথ চলতে গিয়ে আমরা যেমন পথের দু ধারের ফুলদের ভুলে যাই, আকাশের তারাদের ভুলে যাই, অথচ আমাদের প্রাণের নিশ্বাসবায়ু তারা সমধুর করে, তেমনি রবীন্দ্রনাথের কথা সজ্ঞানে মনে না-করলেও তিনি প্রতি নিয়ত আমাদের চেতনায় মিশে আছেন এবং আমাদের অস্তিত্বকে সমৃদ্ধ করছেন।
আমাদের ওপর তার সবচেয়ে বড়ো প্রভাব তার ভাষার। আমাদের ভাষাকে তিনি ঐশ্বৰ্যমণ্ডিত করেছেন। আমরা অজান্তেই তাঁর ভাষা ধার করে কথা বলি, তার ভাষায় চিন্তা করি। তার হাতের লেখা মক্স করি। তার আগে পর্যন্ত যে-বাংলা ভাষা ছিলো, তা ছিলো অনেকাংশে কৃত্রিম, তার প্রকাশ-ক্ষমতা ছিলো সীমিত এবং তা ছিলো আমাদের মুখের ভাষা থেকে অনেকটা দূরে অবস্থিত। সেই ভাষাকে সহজ সরল করে তিনি নিয়ে আসেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কাছাকাছি। কেবল তাই নয়, সে ভাষাকে তিনি সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন; প্রকাশ-ক্ষমতা দান করে নানা ভাবের বাহন করে তোলেন। কবিতা, গল্প এবং প্রবন্ধ–সব রীতির ভাষাকেই তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন। ভাষাতত্ত্ব, বিজ্ঞান, দর্শন, শিক্ষা–সব ধরনের পরিভাষাকেও এগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বস্তুত, তাঁর ভাষার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বিশ শতকের বাংলা গদ্য। কিন্তু ঘরে-ঘরে শিক্ষা ছড়িয়ে পড়লেও, শিক্ষার মান এখন নিচে নেমে যাওয়ায় আমাদের ভাষা তার সৌন্দর্য এবং প্রকাশ-ক্ষমতা উভয়ই যথেষ্ট পরিমাণে হারিয়ে ফেলেছে। এই অবক্ষয়ের পরিবেশে তাঁর রচনা বারবার আমাদের হীনতা থেকে মুক্তি দিয়ে ওপরে তুলে আনতে পারে। তিনি যে-ঐশ্বৰ্য দিয়েছিলেন, তা বিসর্জন দিলে সেটা হবে আত্মহননের মতো।
কেবল তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ আর বিদগ্ধ রুচি গত এক শো বছরে সমার্থক হয়ে গেছে। তাঁর আগে পর্যন্ত ভাষা-সাহিত্যে এক ধরনের স্থূলতা ছিলো। কিন্তু তিনি তাতে এমন একটা পরিশীলন এবং বৈদগ্ধ্য নিয়ে আসেন, যা আগেকার বাংলায় লক্ষ্য করা যায়নি। হয়তো প্ৰথম যৌবনে তিনি এই রুচির দেখা পেয়েছিলেন ইউরোপে। তার কৌতূকবোধ, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, তার চলাফেরা, আচার-আচরণ, তাঁর বাকভঙ্গিসবকিছুতেই এই রুচির দেখা মেলে। তার ভাষার বক্রপ্রয়োগের মাধ্যমে রসিকতা সৃষ্টির একটি প্রমাণ দিতে পারি প্রসঙ্গত। যার কণ্ঠ বেশ কর্কশ তার সম্পর্কে তিনি হয়তো লিখতে পারেন যে, অমুকের কণ্ঠ খুব মধুর তা বলা যায় না। এ জাতীয় প্রয়োগ বাংলা ভাষায় তাঁর আগে পর্যন্ত ছিলো না। বস্তুত, আমাদের কথায়, আমাদের আচার-আচারণে, মধ্যবিত্তের বসার ঘরের শিল্পকর্মে, গানের চর্চায়, নাচের যৎকিঞ্চিৎ আয়ােজনে, এমন কি, সংস্কৃতিবান বলে পরিচিত হওয়ার যে-প্ৰয়াস প্রকাশ পায় তাদের জীবনে–তার সবকিছুতেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব।
বাঙালির রুচি গঠনে তার প্রভাব যে কতো গভীর তার আর-একটা প্ৰমাণ মেলে তাদের রোম্যান্টিক প্রেমের চেতনা থেকে। তার আগে বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে ইউরোপ থেকে এই চেতনা বাঙালির জীবনে আসতে আরম্ভ করলেও ভালোবাসার ভাষা এবং প্রকাশভঙ্গি, অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনের সূক্ষ্ম মাধুর্য এবং রোম্যান্টিকতা আমরা রবীন্দ্রনাথেই বিশেষ করে লক্ষ্য করি। প্রেমিক অথবা প্রেমিকার কানে কানে শোনানোর কবিতা অথবা গান বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের জন্যে রেখে যাননি। অপর পক্ষে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং গান ছাড়া কপোত-কপোতীর প্রেমের কুজন কল্পনা করা যায় না। নাটকে, সিনেমায় তাঁর গান ছাড়া প্রেমের দৃশ্য অপূৰ্ণ থেকে যায়। এমন কি, যারা আধুনিক প্রেমের গান লেখেন, তারা অকাতরে তাদের শব্দ এবং এক্সপ্রেশন সংগ্রহ করেন। তাঁরই গীতবিতানের বিশাল ভাণ্ডার থেকে।
কেবল মানবিক প্রেম নয়, তার ঈশ্বরপ্রেমও বাঙালির, বিশেষ করে বিদগ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির অনুকরণের বস্তু। তিনি নিজে একেশ্বরে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর চেতনায় এই বিশ্বাস। এতো নিবিড়ভাবে মিশে ছিলো যে, তিনি প্ৰেম, প্রকৃতি, মানুষ–যে-বিষয় নিয়েই লিখে থাকুন না কেন, তার মধ্যে সেই বিশ্বাসের দুৰ্গতি বিছুরিত হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর গান সম্পর্কে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। অথচ রবীন্দ্রনাথের সেই সৌন্দর্যময় মঙ্গলময় ঈশ্বর কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মের অথবা সম্প্রদায়ের ঈশ্বর নন। তিনি প্রায় এক সেকুলার ঈশ্বর। সেই ঈশ্বর মানবতারই পরম প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ জীবন শুরু করেছিলেন ব্ৰাহ্ম পরিচয় দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যে-ধর্মকে স্বীকরণ করেছিলেন, তা মানুষের ধর্ম। তাতে কেবল উপনিষদ নয়, তাতে মিশে গিয়েছিলো গ্রাম-বাংলার দেবতা-বর্জিত আনুষ্ঠানিকা-বর্জিত বাউলের সহজ ভক্তি। কিন্তু বাউলের ভক্তিকেই তিনি নিয়েছিলেন, স্কুল দেহতত্ত্বকে নয়। মুক্ত-মনা বাঙালিদের তিনি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন সেই মানুষের ধর্ম, সেই সেকুলার ঈশ্বরকে নিজেদের হৃদয়ে স্থাপন করতে। আজ বিশ্বে যখন ধর্মকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা একটা বিশাল দৈত্যের মতো মাথা তুলে সমগ্র মানবতাকে গ্রাস করতে উদ্যত, তখন রবীন্দ্রনাথের সেই ধর্ম এবং ঈশ্বরকে বড়ো প্রয়োজন।
